একসময় চীনের ফলের বাজার ছিল মূলত দেশীয় উৎপাদননির্ভর। কিন্তু গত এক দশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশটি বৈশ্বিক ফল বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ডুরিয়ান, চিলির চেরি, নিউজিল্যান্ডের কিউই, পেরুর ব্লুবেরি কিংবা ফিলিপাইনের কলা—এসব ফল এখন চীনের শহর ও গ্রামাঞ্চলের বাজারে সহজলভ্য।

চীনের ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং উন্নতমানের খাদ্যপণ্যের প্রতি আগ্রহ দেশটির ফল আমদানিকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কৃষি খাতও এখন অনেকাংশে চীনা বাজারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠছে।

আমদানিতে নতুন রেকর্ড

চীনের খাদ্যপণ্য, কৃষিপণ্য ও প্রাণিজ পণ্য আমদানি-রপ্তানি চেম্বারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশটির মোট ফল আমদানি ও রপ্তানি বাণিজ্যের মূল্য দাঁড়িয়েছে ২৫.২ বিলিয়ন ডলারে।

এর মধ্যে ফল আমদানির মূল্য ছিল প্রায় ১৮.৯৪ বিলিয়ন ডলার এবং আমদানির পরিমাণ ৯০ লাখ ৩২ হাজার টন। আগের বছরের তুলনায় আমদানির মূল্য ৬.৭ শতাংশ এবং পরিমাণ ১৭.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বর্তমানে ৬৪টি দেশ ও অঞ্চল থেকে ৬০টিরও বেশি ধরনের তাজা ফল চীনে প্রবেশের অনুমোদন পেয়েছে। ফলে দেশটির বাজারে প্রবেশের জন্য বিশ্বের ফল উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।

আরও পড়ুন>
বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মালয়েশিয়ার ডুরিয়ান ফলের চাহিদা
চীনে ১৬ হাজার টন তাজা লিচু রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম

ডুরিয়ান: চীনা ভোক্তাদের নতুন প্রিয় ফল

চীনের ফল আমদানির তালিকায় সবচেয়ে বড় অবস্থান এখন ডুরিয়ানের।

২০২৫ সালে দেশটি ৭.৪৯ বিলিয়ন ডলারের তাজা ডুরিয়ান আমদানি করেছে, যার পরিমাণ ছিল প্রায় ১৮ লাখ ৬৮ হাজার টন। পাশাপাশি প্রায় ১.১ বিলিয়ন ডলারের হিমায়িত ডুরিয়ানও আমদানি করা হয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে থাইল্যান্ড ডুরিয়ান সরবরাহে শীর্ষে থাকলেও ভিয়েতনাম দ্রুত এগিয়ে আসছে। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো ডুরিয়ান রপ্তানির পরিমাণে ভিয়েতনাম থাইল্যান্ডকে ছাড়িয়ে যায়। ওই বছর ভিয়েতনাম থেকে চীনে ৯ লাখ ৪০ হাজার টন ডুরিয়ান রপ্তানি হয়।

চীনা বাজারে ডুরিয়ানের জনপ্রিয়তা আরও বেড়েছে ২০২৬ সালে। বছরের প্রথম চার মাসেই দেশটি প্রায় ৩ লাখ ৫৬ হাজার টন ডুরিয়ান আমদানি করেছে, যার মূল্য ১.৭ বিলিয়ন ডলার।

চেরির বাজারে চিলির একচ্ছত্র আধিপত্য

ডুরিয়ানের পর দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানিকৃত ফল হলো চেরি।

২০২৫ সালে চীন ৩.৪৩ বিলিয়ন ডলারের চেরি আমদানি করেছে। এর প্রায় ৯৯ শতাংশই এসেছে চিলি থেকে।

চীনা নববর্ষকে কেন্দ্র করে চেরির চাহিদা প্রতি বছর ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। লাল রঙকে সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করায় উৎসব মৌসুমে চেরি এখন জনপ্রিয় উপহারে পরিণত হয়েছে।

কিউই, ব্লুবেরি ও উচ্চমূল্যের ফলের উত্থান

চীনের বাজারে উচ্চ পুষ্টিগুণসম্পন্ন ফলের চাহিদাও দ্রুত বাড়ছে।

নিউজিল্যান্ড ২০২৫ সালে চীনে ৬১০ মিলিয়ন ডলারের কিউই রপ্তানি করেছে এবং এই বাজারে প্রায় একচেটিয়া অবস্থান ধরে রেখেছে।

একই সময়ে পেরু থেকে ব্লুবেরি আমদানির মূল্য প্রায় ৪০০ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্যসচেতন তরুণ ভোক্তাদের মধ্যে এসব ফলের জনপ্রিয়তা সবচেয়ে বেশি বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা।

ভিয়েতনামের উত্থান

চীনের ফল আমদানি বাজারে ভিয়েতনাম এখন অন্যতম বড় শক্তি।

২০২৫ সালে ৩.৭৬ বিলিয়ন ডলারের ফল রপ্তানি করে দেশটি চীনের দ্বিতীয় বৃহত্তম ফল সরবরাহকারী দেশে পরিণত হয়েছে।

২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে চীনের মোট ফল ও সবজি আমদানির ১৪.৫৪ শতাংশ এসেছে ভিয়েতনাম থেকে, যা এক বছর আগে ছিল ১১.৭১ শতাংশ।

চীনের বাজারে ভিয়েতনামের ডুরিয়ান, কাঁঠাল, নারকেল ও অন্যান্য গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফলের চাহিদা বাড়ছে। তবে একই সঙ্গে চীনের কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ নীতির কারণে দেশটির রপ্তানিকারকদের নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

কঠোর হচ্ছে চীনের আমদানি বিধি

চীনের জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অব কাস্টমস ২০২৬ সালের ১ জুন থেকে ‘অর্ডার ২৮০’ কার্যকর করেছে।

নতুন বিধির আওতায় ২০টি কৃষিপণ্য শ্রেণির ২,৫৮৯টি পণ্যের জন্য অতিরিক্ত নথিপত্র, নিবন্ধন ও মাননিয়ন্ত্রণের শর্ত আরোপ করা হয়েছে।

এখন আমদানিকৃত পণ্যের নিবন্ধন নম্বর, সনদপত্র এবং কাস্টমস ঘোষণাপত্রের তথ্যের মধ্যে সামান্য অসঙ্গতিও থাকলে পণ্য খালাসে জটিলতা তৈরি হতে পারে।

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে মালয়েশিয়ার ডুরিয়ান ফলের চাহিদা
চীনে ১৬ হাজার টন তাজা লিচু রপ্তানি করেছে ভিয়েতনাম

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীন এখন পরিমাণভিত্তিক তদারকির পরিবর্তে ঝুঁকিভিত্তিক মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। ফলে উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো আগের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।

শুধু আমদানিকারক নয়, বড় রপ্তানিকারকও

ফল আমদানিতে বিশ্বে অন্যতম শীর্ষ অবস্থানে থাকলেও রপ্তানিতেও শক্তিশালী অবস্থান ধরে রেখেছে চীন।

২০২৫ সালে দেশটির ফল রপ্তানির মূল্য ছিল ৬.২৮ বিলিয়ন ডলার এবং রপ্তানির পরিমাণ ছিল প্রায় ৫৪ লাখ ৮৩ হাজার টন।

আপেল, সাইট্রাসজাতীয় ফল, টেবিল আঙুর এবং নাশপাতি চীনের প্রধান রপ্তানি পণ্য। নিবন্ধিত বাগান, কঠোর মাননিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক সরবরাহব্যবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা ফলের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ছে।

চীনের সবচেয়ে বড় ফল রপ্তানি বাজার ভিয়েতনাম। প্রতিবছর দেশটিতে ১.২ থেকে ১.৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যের চীনা ফল রপ্তানি হয়। এছাড়া থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, রাশিয়া, মালয়েশিয়া, কিরগিজস্তান এবং যুক্তরাষ্ট্রও গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য।

বৈশ্বিক ফল বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ফল আমদানির বাজার এখনও পূর্ণতা পায়নি। দেশটির বিপুল জনসংখ্যার মধ্যে উচ্চ আয়ের শ্রেণি দ্রুত বাড়ছে এবং তারা উন্নতমানের বিদেশি ফলের জন্য বেশি ব্যয় করতে প্রস্তুত।

ফলে ডুরিয়ান, চেরি, কিউই, ব্লুবেরি ও অন্যান্য প্রিমিয়াম ফলের চাহিদা আগামী বছরগুলোতেও বাড়তে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

একসময় বিশ্বের কারখানা হিসেবে পরিচিত চীন এখন বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফল বাজারগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। আজ দেশটি শুধু ফলের বৃহৎ ক্রেতাই নয়, বরং বৈশ্বিক ফল বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। চীনা ভোক্তাদের রুচি, চাহিদা এবং নীতিগত পরিবর্তন এখন বিশ্বের ফল উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশের জন্য কী সুযোগ তৈরি হচ্ছে?

বিশ্লেষকদের মতে, চীনের ক্রমবর্ধমান ফল আমদানি বাজার বাংলাদেশের জন্যও একটি বড় সুযোগ তৈরি করছে। বিশেষ করে আম, কাঁঠাল, আনারস, পেয়ারা, লিচু ও ড্রাগন ফলের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফল চীনা ভোক্তাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে চীনের বাজারে সীমিত পরিসরে আম ও কিছু কৃষিপণ্য রপ্তানি শুরু করেছে। তবে চীনের বিশাল বাজারে উল্লেখযোগ্য অংশীদার হতে হলে আন্তর্জাতিক মানের উৎপাদন, প্যাকেজিং, কোল্ড চেইন ব্যবস্থা এবং খাদ্য নিরাপত্তা মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে। চীনের কঠোর আমদানি বিধি ও মাননিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন ও রপ্তানি প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের ফল খাত নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের বাজারে থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা সহজ হবে না। তবে ভৌগোলিক নৈকট্য, তুলনামূলক কম পরিবহন ব্যয় এবং বৈচিত্র্যময় গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ফলের কারণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে একটি সম্ভাবনাময় সরবরাহকারী দেশে পরিণত হতে পারে। সঠিক নীতি সহায়তা, রপ্তানি অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়ানো গেলে চীনের ফল বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সূত্র: ভিয়েতনাম এক্সপ্রেস, গ্লোবাল টাইমস, প্রডিউস রিপোর্ট, দ্য স্ট্রেট টাইমস

এমএসএম