ঢাকা: সোমবার সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দেশে তিনি ডা. বি. চৌধুরী নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। চিকিৎসক, শিক্ষক, টেলিভিশন উপস্থাপক ও রাজনীতিক—এক জীবনে তিনি একাধিক ভূমিকায় থেকেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিকল্পধারা বাংলাদেশ এ উপলক্ষে কয়েকটি কর্মসূচি পালন করবে বলে দলটি জানিয়েছে।
দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, কোরআনখানি ও কবর জিয়ারত করা হবে। কবরের পাশের মসজিদে জোহরের নামাজের পর তাঁর আত্মার মাগফিরাত কামনা করে দোয়া অনুষ্ঠিত হবে। মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং অতিথিদের জন্য দুপুরের খাবারের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
শৈশব ও পড়াশোনা
১৯৩০ সালের ১১ অক্টোবর কুমিল্লায় নানাবাড়িতে তাঁর জন্ম। পৈতৃক বাড়ি মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগরের মজিদপুর দয়াহাটা। বাবা আইনজীবী কফিলউদ্দিন চৌধুরী তৎকালীন যুক্তফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব পালন করেন। মায়ের নাম সুফিয়া খাতুন।
ডা. বি. চৌধুরী ১৯৪৭ সালে ঢাকার সেন্ট গ্রেগরীজ স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৪৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। দুই পরীক্ষাতেই তিনি প্রথম বিভাগ পান। ১৯৫৪–৫৫ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস ডিগ্রি নেন। পরীক্ষায় তিনি ধারাবাহিকভাবে মেধাতালিকায় থাকতেন।
পরে তিনি যুক্তরাজ্যের লন্ডন, এডিনবরা ও গ্লাসগো—তিন রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ানসের ফেলো (এফআরসিপি) হন। বাংলাদেশ কলেজ অব ফিজিশিয়ানস অ্যান্ড সার্জনস তাঁকে সম্মানসূচক এফসিপিএস দেয়।
চিকিৎসায় তাঁর বড় কাজ
কর্মজীবন শুরু হয় চিকিৎসা দিয়ে। ১৯৬৪ সালে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে মেডিসিনের সহযোগী অধ্যাপক ছিলেন। ১৯৬৪ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে একই পদে থাকেন। ১৯৭০ সালে সিলেট মেডিকেল কলেজে মেডিসিনের অধ্যাপক হন। দেশের অভ্যন্তরীণ রোগের অন্যতম বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে তাঁর চিকিৎসা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।
যক্ষ্মা প্রতিরোধেও তিনি দীর্ঘদিন কাজ করেছেন। ন্যাশনাল অ্যান্টি-টিউবারকিউলোসিস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ন্যাটাব) সভাপতি তিনি একাধিক মেয়াদে ছিলেন। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অ্যাগেইনস্ট টিউবারকিউলোসিস অ্যান্ড লাং ডিজিজের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে তিনি হেলথ অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট গড়ে তোলেন এবং এর চেয়ারম্যান ছিলেন। এই ট্রাস্টের মাধ্যমে উত্তরায় দেশের প্রথম নারী মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। সেখানে তিনি মেডিসিনের সম্মানসূচক অধ্যাপক হিসেবে পড়াতেন। রাজনীতিতে আসার পরও চেম্বারে রোগী দেখা তিনি ছাড়েননি।
পর্দা, কলম ও রাষ্ট্রীয় সম্মান
ষাটের দশকের শেষদিকে বাংলাদেশ টেলিভিশনের স্বাস্থ্যবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘আপনার ডাক্তার’-এর উপস্থাপক হিসেবে তিনি ঘরে ঘরে পরিচিত হন। সাধারণ মানুষের রোগ ও চিকিৎসা নিয়ে সরাসরি কথা বলতেন। এই কাজের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৭৬ সালে তিনি জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার পান।
চিকিৎসার পাশাপাশি তিনি প্রবন্ধ, নাটক ও বই লিখেছেন। ভালো বক্তা হিসেবেও তাঁর সুনাম ছিল। প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, তিনি জাতিসংঘের অধিবেশনে তিনবার ভাষণ দেন। চিকিৎসাশাস্ত্রে অবদানের জন্য ১৯৯৩ সালে দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান স্বাধীনতা পদক পান।
রাজনীতিতে উঠে আসা
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আহ্বানে ১৯৭৮ সালে তিনি রাজনীতিতে আসেন। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব হন। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে মুন্সীগঞ্জ থেকে বিএনপির প্রার্থী হয়ে সংসদ সদস্য হন। ওই বছর ১৫ এপ্রিল থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেখতেন। এরপর ১৯৮২ সাল পর্যন্ত মন্ত্রিসভায় ছিলেন।
নিজ আসন মুন্সীগঞ্জ-১ থেকে তিনি পাঁচবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালে আবার সংসদে এসে শিক্ষা ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান; বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিও তাঁর দেখার মধ্যে ছিল। পরে ওই সংসদে সরকারি দলের উপনেতা হন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত তিনি বিরোধী দলের উপনেতাও ছিলেন।
বিদেশমন্ত্রী, তারপর রাষ্ট্রপতি
২০০১ সালে বিএনপি সরকার গঠন করলে ১০ অক্টোবর তাঁকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করা হয়। এর কিছুদিন পর, ১৪ নভেম্বর, জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে তিনি বাংলাদেশের পঞ্চদশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। শপথের আগে বিএনপির দলীয় পদ থেকে তিনি সরে আসেন। তাঁর আগে রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ।
রাষ্ট্রপতির দায়িত্বে তিনি ছিলেন প্রায় সাত মাস। ২০০২ সালের ২১ জুন পদত্যাগ করেন। পদত্যাগের আগে জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে মাজারে না যাওয়াকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন দলে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল বলে সেসময় বলা হয়। দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, সংসদ সদস্যদের আস্থা তাঁর ওপর নেই। তিনি পদ ছাড়েন। পরে দায়িত্ব নেন মোহাম্মদ জমিরউদ্দিন সরকার।
বিকল্পধারা
২০০৪ সালে তিনি বিকল্পধারা বাংলাদেশ গঠন করেন। দুই বড় দলের বাইরে আরেকটি ধারা দাঁড় করানোর কথা তিনি বলেছিলেন। দল গঠনের সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন ছেলে মাহী বি. চৌধুরী ও মেজর (অব.) আবদুল মান্নান। কিছুদিন তিনি লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টিতেও যুক্ত ছিলেন, পরে আবার বিকল্পধারায় মনোযোগ দেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রায় পুরো সময় তিনি এই দলের সভাপতি ছিলেন।
২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে দল কোনো আসন না পাওয়ায় তিনি সভাপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান। ২০০৯ সালের এপ্রিলে আবার দলের প্রধান হন।
পরিবার ও প্রয়াণ
তাঁর স্ত্রী হাসিনা ওয়ার্দা চৌধুরী। এক ছেলে ও দুই মেয়ে—মাহী বি. চৌধুরী রাজনীতিক ও সাবেক সংসদ সদস্য, বড় মেয়ে মুনা চৌধুরী আইনজীবী, ছোট মেয়ে শায়লা চৌধুরী চিকিৎসক।
২০২৪ সালের ৫ অক্টোবর ভোরে ঢাকায় ফুসফুসে সংক্রমণ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। কয়েক দিন পর, ১১ অক্টোবর, তাঁর ৯৪তম জন্মদিন ছিল। মৃত্যু হয় উত্তরা মহিলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে—যে প্রতিষ্ঠান তাঁরই ট্রাস্টের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল।
সোমবারের মৃত্যুবার্ষিকীতে বিকল্পধারার কর্মসূচিতে তাই কোরআনখানি, কবর জিয়ারত ও জোহরের পর দোয়া রাখা হয়েছে। চিকিৎসা, শিক্ষা ও রাজনীতি—তিন ক্ষেত্রেই যাঁর নাম থেকে যায়, সেই ডা. বি. চৌধুরীকেই এদিন স্মরণ করা হবে।








