চলতি অর্থবছরেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি গড় মূল্যস্ফীতি থাকবে। এমন পূর্বাভাস দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। এডিবি বলছে, এ বছর বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ।

এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক জুলাই সংস্করণে মূল্যস্ফীতির এই পূর্বাভাস দিয়েছে এডিবি। সেখানে দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের জন্য ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কাসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর গড় মূল্যস্ফীতির যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে, তাতে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হবে।

এডিবি বলছে, দেশে পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন, পরিষেবা ও অন্যান্য ভোক্তাপণ্যের দামে পড়তে থাকবে, যা মূল্যস্ফীতি কমার গতি ধীর করবে।

বাংলাদেশে টানা তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি আছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ হিসাবে, গত জুনে মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। গত মে মাসে ছিল ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারির পরে অর্থাৎ আগের ১৬ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি।

এমন পরিস্থিতিতে এডিবির পূর্বাভাস হলো চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।

ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এসব দেশ পরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলেও বাংলাদেশ সেভাবে পারেনি। টানা চার বছর ধরে বাংলাদেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে।

প্রতি মাসে মূল্যস্ফীতি হিসাব করা হয়। ১২ মাসের মূল্যস্ফীতি দিয়ে পুরো বছরের গড় চিত্র দেখানো হয়। এতে ওই বছরের মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতি কেমন ছিল, তা জানা যায়।

মূল্যস্ফীতি জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলে

মূল্যস্ফীতি বাড়লে সীমিত ও মধ্য আয়ের মানুষের কষ্ট বাড়ে। আয় না বাড়লে তাদের সংসার চালানের খরচ বেড়ে যায়। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। ফলে বাজারে শাকসবজি, মাছ ও মাংসের দাম বেড়েছে। তবে চালের দামও বাড়তি।

গত জুনে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১৬ ও জাতীয় গড় মজুরি হার ৮ দশমিক ১৮ শতাংশ। এর মানে হলো, যত মূল্যস্ফীতি হয়েছে, এর চেয়ে মজুরি কম বেড়েছে। ফলে বাজার থেকে পণ্য কিনতে ভোগান্তি বাড়ছে।

মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধি বা আয় বৃদ্ধি কম হলে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ে। প্রকৃত আয় কমে যায়। মূল্যস্ফীতির তুলনায় আয় না বাড়লে ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয় কিংবা খাবার, কাপড়চোপড়, যাতায়াতসহ বিভিন্ন খাতে কাটছাঁট করতে হয়।

অন্য দেশে মূল্যস্ফীতি কত

এডিবির পূর্বাভাস অনুসারে, ২০২৬–২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের পরে পাকিস্তানে সবচেয়ে বেশি মূল্যস্ফীতি হতে পারে। ওই দেশে মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ। আফগানিস্তানের মূল্যস্ফীতি হতে পারে সাড়ে ৫ শতাংশ। আর শ্রীলঙ্কার মূল্যস্ফীতি হতে পারে ৫ দশমিক ২ শতাংশ। ভারত, ভুটান ও মালদ্বীপের মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস হলো ৪ শতাংশ। আর নেপালের জন্য পূর্বাভাস হলো ৫ শতাংশ।

২০২৩ সালের দিকে শ্রীলঙ্কার ৭৩ শতাংশ ও পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতি ৫১ শতাংশ পর্যন্ত ওঠেছিল। তখন ওই দুটি দেশ নানা ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সফল হয়।

বাংলাদেশে কেন বেশি

বাংলাদেশে কেন গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হতে পারে, এর ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। এডিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্প্রতি দেশে পেট্রোলিয়াম, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম সমন্বয়ের প্রভাব পরিবহন, পরিষেবা ও অন্যান্য ভোক্তাপণ্যের দামে পড়তে থাকবে। কারণ, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির দ্বিতীয় দফার প্রভাব, বিনিময় হার সমন্বয়ের প্রভাব এবং খাদ্য ও সেবা খাতে অব্যাহত মূল্যস্ফীতি কমার গতি ধীর করবে।

এডিবি বলছে, উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে এবং ব্যক্তিগত ভোগব্যয় সীমিত করছে। দুর্বল রপ্তানি ও আমদানির মাঝারি প্রবৃদ্ধি বৈদেশিক চাহিদার দুর্বলতা ও বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সরবরাহের দিক থেকে রপ্তানিমুখী উৎপাদন খাত উচ্চ জ্বালানি মূল্য, বৈদেশিক বাজারে দুর্বল চাহিদা ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতার কারণে চাপে থাকবে। অন্যদিকে সারের ঘাটতির কারণে কৃষি খাত ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। তবে রেমিট্যান্সনির্ভর পারিবারিক আয়ের কারণে সেবা খাত প্রবৃদ্ধিতে কিছুটা সহায়তা করবে।