আগামী এক দশকে ডলারভিত্তিক রিজার্ভ কমানোর পরিকল্পনা করছে বিশ্বের অনেক কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেখা যাচ্ছে, ডলার রিজার্ভ বাড়ানোর চেয়ে কমানোর বিষয়ে আগ্রহী বেশির ভাগ কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তারা এখন সোনাসহ অন্যান্য মুদ্রায় রিজার্ভ বাড়াতে চায়।

এমন প্রবণতা এই প্রথম দেখা গেল বলে জানিয়েছে লন্ডনভিত্তিক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান অফিশিয়াল মনিটারি অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশনস ফোরাম (ওএমএফআইএফ)।

এমন সময় এই জরিপের ফল প্রকাশিত হলো, যখন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন করে শুল্ক আরোপের নানা পথ খুঁজছেন। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছেই। খবর সিএনএন।

গতকাল মঙ্গলবার প্রকাশিত এই জরিপ চলতি বছরের মার্চ থেকে মে মাসের মধ্যে পরিচালিত হয়। এতে বিশ্বের ৭৪টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক অংশ নেয়। ২০২৩ সালে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ পরিকল্পনা নিয়ে তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর এবারই প্রথম ডলার রিজার্ভ কমানোর প্রবণতা বাড়ানোর প্রবণতা ছাড়িয়ে গেল।

বৈশ্বিক অর্থনীতিতে ‘ডি-ডলারাইজেশন’ বা ডলারের ওপর নির্ভরশীলতা কমানোর যে প্রবণতা শুরু হয়েছে, এটি তার আরেকটি বড় ইঙ্গিত। এর অর্থ হলো আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনে ডলারের ব্যবহার কমে যাওয়া। ফলে মুদ্রাটির চাহিদা ও মূল্য—উভয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।

মার্কিন বিনিয়োগ ব্যাংক জেপি মরগান চেজের তথ্যানুসারে, গত বছর কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ডলারের হিস্যা দুই দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

ওএমএফআইএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ বছর ডলারে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশের চেয়ে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিই বেশি প্রভাব ফেলেছে। বিশ্বব্যবস্থা ঝুঁকির মুখে ফেলতে যুক্তরাষ্ট্রের যে ভূমিকা, তা–ও বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভ পোর্টফোলিওতে এখনো ডলারের আধিপত্য আছে, নিকট ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে। গত ৫ বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট বরাদ্দের প্রায় ৫৮ শতাংশই ডলারে রয়েছে।

তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো ধীরে ধীরে ডলারনির্ভরতা কমিয়ে ইউরো ও চীনের রেনমিনবির দিকে ঝুঁকছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় সব কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করে, রেনমিনবি রিজার্ভে বৈচিত্র্য আনতে সহায়ক।

অন্যদিকে দুই-তৃতীয়াংশ ব্যাংক বলেছে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ইউরোর ব্যবহার আগের চেয়ে আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। গত বছর যেখানে এই হার ছিল ৪৩ শতাংশ, এবার তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬৭ শতাংশ। দীর্ঘমেয়াদে ইউরো রিজার্ভ বাড়াতে চায় ২৯ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক, গত বছর যা ছিল ২২ শতাংশ।

ডয়েচে বুন্দেস ব্যাংকের বাজারবিষয়ক মহাপরিচালক কারস্টেন স্ট্রোবর্ন প্রতিবেদনে বলেছেন, ২০২৫ সালে ইউরোভিত্তিক আন্তর্জাতিক ঋণের পরিমাণ রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এ ছাড়া গ্রিন বন্ডের (এমন একধরনের ঋণপত্র, যার মাধ্যমে তোলা অর্থ পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ করা হয়।) প্রধান মুদ্রা এখন ইউরো।

এ ছাড়া বিকল্প মুদ্রা হিসেবে সিঙ্গাপুরি ডলার, দক্ষিণ কোরিয়ার ওন ও দক্ষিণ আফ্রিকার রান্ডের প্রতিও আগ্রহ বাড়ছে।

সোনার চাহিদা বাড়ছে

ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় সোনার চাহিদা বেড়েছে। রেকর্ডসংখ্যক কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, তারা সোনায় বিনিয়োগ বাড়াতে চায়, যদিও গত ১ বছরে সোনার দাম ২০ শতাংশের বেশি বেড়েছে।

বাস্তবতা হলো বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর রিজার্ভে এখন সোনার হিস্যা সবচেয়ে বেশি। টানা কয়েক বছর ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণে সোনা কেনা এবং গত দুই বছরে দাম প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার ফলে রিজার্ভ সম্পদ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি বন্ডকে (ট্রেজারি) ছাড়িয়ে গেছে সোনা।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) এক প্রতিবেদনে সম্প্রতি বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের শেষে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর মোট রিজার্ভ সম্পদের ২৭ শতাংশ ছিল সোনা, ১ বছর আগে ছিল যা ছিল ২০ শতাংশ। এই সময়ে রিজার্ভ হিসেবে মার্কিন ট্রেজারির হিস্যা ২৫ থেকে কমে ২২ শতাংশে নেমে এসেছে। অন্যদিকে রিজার্ভ হিসেবে ইউরোর হিস্যা ১৫ শতাংশে স্থির আছে।

ওএমএফআইএফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি থেকে সুরক্ষা ও আন্তর্জাতিক মুদ্রাব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নিয়ে সংশয় বেড়ে যাওয়ায় এই পরিবর্তন ঘটছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সম্পদ ব্যবস্থাপনার কৌশলের মূল ভূমিকায় এখন সোনা।

জরিপে ৫১ শতাংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংক সোনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর কারণ হিসেবে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টি উল্লেখ করেছে, ২০২৪ সালের তুলনায় যা ১১ শতাংশ বেশি।