বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হওয়ায় অনেক নেতাকে বহিষ্কার করেছিল বিএনপি। তাদের মধ্যে সাতজন সংসদ-সদস্যও নির্বাচিত হয়েছেন। এখন বহিষ্কৃতদের বেশির ভাগই বিএনপিতে ফিরতে মরিয়া। অন্য রাজনৈতিক দলের লোভনীয় প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে তারা দলের হাইকমান্ডের কাছে বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন জানিয়েছেন। কেউ আবার কেন্দ্রীয় নেতাদের মাধ্যমে জোর লবিং-তদবির চালাচ্ছেন। কেন্দ্রের ‘সবুজ সংকেত’ না পেলেও স্থানীয় পর্যায়ে দলীয় কর্মসূচিতে নিয়মিত অংশ নিচ্ছেন তারা। তবে এ নেতাদের ফেরানোর বিষয়ে দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাননি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য যুগান্তরকে বলেন, দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে শাস্তির মুখোমুখি হওয়া এসব নেতার বিষয়ে হাইকমান্ড এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি। দীর্ঘদিন ধরে সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম ‘জাতীয় স্থায়ী কমিটির’ বৈঠকও হচ্ছে না। তবে তারা স্বীকার করেন, বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে এই বহিষ্কৃত নেতাদের ত্যাগ ও অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করার উপায় নেই। সাংগঠনিক কারণে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও দিনশেষে তারা বিএনপিরই অংশ।

বিএনপির দায়িত্বশীল সূত্র থেকে জানা যায়, গত দেড় বছরে শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডের অভিযোগে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের প্রায় ৩ হাজার নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এর মধ্যে নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় অন্তত ৯০ জনকে বহিষ্কার করা হয়। সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে আরও দেড় হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে। অবশ্য গত কয়েক মাসে কেন্দ্রীয় নীতি কিছুটা শিথিল হওয়ায় ধাপে ধাপে যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদলসহ বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের সহস্রাধিক নেতাকর্মীর বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে হেভিওয়েট নেতাদের বিষয়ে বিএনপি এখনো কঠোর অবস্থান বজায় রেখেছে।

দলের নীতিনির্ধারকদের একাংশের মতে, চেইন অব কমান্ড বা সাংগঠনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে শাস্তিমূলক অবস্থান ধরে রাখা উচিত। অন্য একটি পক্ষ মনে করছে, মাঠের জনপ্রিয় নেতাদের বাইরে রাখা কৌশলগত ভুল হতে পারে। কারণ, বহিষ্কারের খড়্গ নামার আগে দীর্ঘ ১৭ বছর স্থানীয় রাজনীতি এই নেতাদের হাতের মুঠোয় ছিল। মামলা, হামলা আর গ্রেফতারের মুখোমুখি হয়ে রাজপথে আন্দোলন চাঙা রেখেছিলেন তারাই। তাই অপরাধের মাত্রা বিবেচনা করে ‘সাধারণ ক্ষমার’ মাধ্যমে তাদের ঘরে ফেরানো উচিত।

কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে দলের চূড়ান্ত মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে জয়লাভ করেন শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। নির্বাচনে অংশ নেওয়ার কারণে তিনিসহ তার অনেক নেতাকর্মীকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমার যেসব নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করা হয়েছিল, তাদের দলে ফিরিয়ে নিতে কেন্দ্রে চিঠি দিয়েছি।

নাটোর-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ায় বহিষ্কৃত হয়েছিলেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-দপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু। দলে ফেরার প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বিএনপির প্রায় সৃষ্টিলগ্ন থেকেই এই পরিবারের সঙ্গে আছি। দলের প্রতিটি ক্রান্তিলগ্নে জীবন বাজি রেখে রাজপথে কাজ করে গেছি। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হারিয়েছি এই দল করতে গিয়ে। দল যদি মনে করে আমাকে আবারও সাংগঠনিক কাজে লাগাবে, আমি যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।

একই ধরনের রাজনৈতিক ট্র্যাজেডির শিকার ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১২ আসনে দলের প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়ে মাঠ চষে বেড়ালেও শেষ মুহূর্তে আসনটি মিত্র দলকে ছেড়ে দেয় বিএনপি। দলের এমন সিদ্ধান্তে ক্ষুব্ধ নীরব স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে লড়েন এবং বহিষ্কৃত হন। নির্বাচনে পরাজিত হলেও তিনি মাঠ ছাড়েননি; তার বিশাল অনুসারী নিয়ে বিএনপির প্রতিটি কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি শহীদ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার আদর্শ বুকে ধারণ করে তারেক রহমানের রাজনীতি করি। শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত আমি বিএনপির রাজনীতিই করে যাব। দলের চেয়ারম্যানের কাছে আমার আকুল আবেদন-জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যেন আমাকে এ প্রিয় দলের পতাকাতলে রাজনীতি করার সুযোগ দেওয়া হয়।

আরেক বহিষ্কৃত নেতা সাইফুল ইসলাম ফিরোজ বলেন, আমার রাজনৈতিক জন্মই এই দল থেকে। দীর্ঘদিন আমি দলের হয়েই কাজ করে আসছি। আমি সব সময় দলের সঙ্গেই কাজ করতে চাই। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার না হলেও আমি দলের বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছি এবং ভবিষ্যতেও দলের হয়েই কাজ করতে চাই।

অন্তত ১৯ জন বহিষ্কৃত নেতা যুগান্তরকে জানান, বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত এই নেতাদের একাংশের বড় ধরনের নিজস্ব ভোটব্যাংক এবং স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী বলয় রয়েছে। যার কারণে অন্য কিছু রাজনৈতিক দল ও জোটের পক্ষ থেকে তাদের দলে ভেড়ানোর জন্য নানা ধরনের আকর্ষণীয় প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে। প্রলোভন দেখানো হচ্ছে বড় পদ-পদবির। ইতোমধ্যে একজন এনসিপিতে যোগ দিয়েছেন। তবে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, বহিষ্কৃত এই নেতারা অন্য রাজনৈতিক দলের দেওয়া লোভনীয় পদের ফাঁদে পা দিচ্ছেন না।