দলীয় নীতিআদর্শ অনুসরণ করে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য দলীয় সংসদ-সদস্যদের সতর্ক করে চিঠি ইস্যু করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরে এই চিঠি দেওয়া হয়েছে সব এমপিকে। জামায়াতের নৈতিক অবস্থান, স্বচ্ছতা ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় করতে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি নড়াইল-২ (সদরের একাংশ ও লোহাগড়া) আসনের জামায়াতের সংসদ-সদস্য আতাউর রহমান (বাচ্চু) তার মেয়ের নামে ঐচ্ছিক অনুদানের বরাদ্দ দেওয়ার পর তিনি তার পিএসকে বরখাস্তের আদেশ দেন। তিনি বিষয়টি জানতেন না বলে জানান। আতাউর রহমানকেও দলের আমিরের সতর্কবার্তা জানিয়ে সেক্রেটারি জেনারেলের স্বাক্ষরে চিঠি দেওয়া হয়। এমপির প্যাডে তার অগ্রিম স্বাক্ষর করে রাখায় পিএস এমপিকে না জানিয়েই তালিকা প্রস্তুত করেন যাতে তার ময়ের নাম যুক্ত ছিল। এই ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে এটি ছাড়াও আরও বেশকিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যুগান্তরের অনুসন্ধানে পাওয়া চিঠিতে প্রত্যেক সংসদ-সদস্যকে ভাই-বোন সম্বোধন করে বলা হয়-‘আপনি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে একজন মাননীয় সংসদ-সদস্য হিসাবে দেশের মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার যে গৌরবময় দায়িত্ব লাভ করেছেন, তা নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার ওপর অর্পিত একটি গুরুত্বপূর্ণ আমানত। জনগণের অধিকার সংরক্ষণ, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুষ্ঠু ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবহারের মাধ্যমে এই আমানতের হক আদায় করা আমাদের সকলের নৈতিক, সাংগঠনিক ও ইমানি দায়িত্ব। একই সঙ্গে জনগণের আস্থা, সংগঠনের আদর্শিক মর্যাদা এবং স্বচ্ছতা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থে আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত ও কর্মকাণ্ডে সর্বোচ্চ সততা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা একান্ত অপরিহার্য।’
চিঠিতে গোলাম পরওয়ার আরও লেখেন, ‘এ প্রেক্ষিতে আপনাকে বিশেষভাবে অনুরোধ করা যাচ্ছে যে, সরকারি কোনো অনুদান, ঐচ্ছিক তহবিল, আর্থিক সহায়তা বা এ ধরনের যে কোনো সরকারি সুযোগ-সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে নিজের পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির পরিবারের সদস্য ও তাদের আত্মীয়স্বজন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ), ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) কিংবা তাদের আত্মীয়স্বজনের অনুকূলে কোনো ধরনের সরকারি অনুদান বা সহায়তা প্রদান থেকে বিরত থাকবেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি অনুদান পাওয়ার যোগ্য বা প্রকৃত অর্থে অভাবগ্রস্ত হলেও সংসদ-সদস্য হিসাবে আপনার সুপারিশ বা উদ্যোগে তাদের জন্য সরকারি অনুদান প্রদান না করার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করা হচ্ছে। তবে, যদি এমন কোনো ব্যক্তি প্রকৃত অর্থেই অসহায়, অভাবগ্রস্ত এবং সহযোগিতা পাওয়ার উপযুক্ত হন, তাহলে বিষয়টি সংগঠনের মাধ্যমে উপস্থাপন করতে পারবেন। সংগঠন প্রয়োজনে সাধ্যমতো যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, ইনশাআল্লাহ।’
জামায়াতের চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘আমরা বিশ্বাস করি এ নীতি অনুসরণ করলে ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে জনগণের সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং আমাদের প্রিয় কাফেলা বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নৈতিক অবস্থান, স্বচ্ছতা ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হবে। এ প্রসঙ্গে আরও উল্লেখ্য যে, আপনার কোনো প্যাড বা ডিও লেটার অন্যের দ্বারা লিখিত হলে, কোনো কিছু সম্পূর্ণ না পড়ে আপনি স্বাক্ষর করবেন না এবং সব সময় কোনো সাদা কাগজ বা প্যাডে অগ্রিম স্বাক্ষর দান থেকে বিরত থাকবেন। মহান আল্লাহতায়ালা আমাদের সকলকে আমানতের হক যথাযথভাবে আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।’ জানতে চাইলে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব যুবায়ের যুগান্তরকে এমপিদের প্রতি দলীয় নির্দেশনা প্রদানের চিঠি দেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তিনি বলেন, জনগণের কাছে আমাদের জবাবদিহি এবং সংগঠনের নৈতিক মান অক্ষুণ্ন রাখতেই এই চিঠি সবাইকে দেওয়া হয়েছে।
ঐচ্ছিক অনুদানের তালিকায় নিজের মেয়ের নাম থাকার ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর নিজের ব্যক্তিগত সহকারীকে (পিএস) বরখাস্ত করেন নড়াইল-২ (সদরের একাংশ ও লোহাগড়া) আসনের জামায়াতের সংসদ-সদস্য আতাউর রহমান (বাচ্চু)।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার জানিয়েছেন, ‘সম্প্রতি সংঘটিত একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় সংসদের নড়াইল-২ আসনের বিরোধী দলের সংসদ-সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে।’
২৬ এপ্রিল সংসদ-সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অনুদানের জন্য সচিবালয় থেকে অনুমোদিত একটি তালিকা ফেসবুকে ভাইরাল হয়। অভিযোগ ওঠে তালিকায় এমপির নিজ মেয়ের নাম রয়েছে দুই জায়গায়। এছাড়া তালিকায় অধিকাংশ তার নিজ ইউনিয়ন ও শ্বশুরবাড়ির ইউনিয়নের লোকের নাম রয়েছে। পরের দিন শনিবার দুপুরে তালিকাটি সঠিক বলে নিশ্চিত করেন এমপি নিজেই। তবে তিনি দাবি করেন, তিনি তখন নড়াইলে ছিলেন না। তার স্বাক্ষরিত প্যাড ঢাকায় তার পিএসের কাছে ছিল।








