ফুটবলের ইতিহাসে তাদের অবদান শুধু গোল দিয়ে মাপা যায় না। দৌড়, ড্রিবল কিংবা নিখুঁত পাস ম্যাচের গতিপথ বদলে দেয়। উসমান দেম্বেলে সেই প্রতিভা। বল পায়ে তার গতি বিদ্যুতের ঝলকানি, ড্র্রিবলিং শিল্পীর তুলির আঁচড়। প্রতিপক্ষের রক্ষণ এলোমেলো করে দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতার জন্যই তিনি বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা উইঙ্গার।
১৯৯৭ সালের ১৫ মে ফ্রান্সের ভার্ননে জন্ম মাসুর উসমান দেম্বেলের। আফ্রিকান বংশোদ্ভূত সাধারণ পরিবারে বেড়ে ওঠা দেম্বেলের বাবা উসমান সিনিয়র এবং মা ফাতিমাতা দেম্বেলে। পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিল না। শৈশবে অনেক সময় পুরোনো বুট পরে খেলতে হয়েছে তাকে। দারিদ্র্য তার স্বপ্ন আটকে রাখতে পারেনি। মা ছেলেকে বলতেন, কঠোর পরিশ্রম একদিন সব কষ্টের জবাব দেবে। সেকথাই আজ সত্যি হয়েছে।
ছোটবেলা থেকে ফুটবল তার একমাত্র ভালোবাসা। মাঠে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনুশীলন করতেন। তার প্রতিভা নজরে আসে ফরাসি ক্লাব রেনের। সেখানেই শুরু হয় ক্যারিয়ার। এক মৌসুম খেলেই তিনি জার্মানির বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে যোগ দেন। সেখানে ইউরোপের অন্যতম বিস্ফোরক তরুণ ফুটবলার হিসাবে নিজের পরিচয় তৈরি করেন। ২০১৭ সালে বার্সেলোনা তাকে রেকর্ড ট্রান্সফার ফি দিয়ে দলে ভেড়ায়। সেই অধ্যায়টি ছিল সুখ-দুঃখের। চোট তাকে দীর্ঘদিন মাঠের বাইরে রেখেছিল। অনেকেই ভেবেছিলেন, দেম্বেলের ক্যারিয়ার হয়তো শেষ হয়ে যাচ্ছে। সমালোচনা, হতাশা আর ব্যর্থতার মাঝেও তিনি হার মানেননি। কঠোর অনুশীলন আর আত্মবিশ্বাসের জোরে আবার ফিরে আসেন নিজের সেরা রূপে। ২০২৩ সালে পিএসজিতে যোগ দিয়ে তিনি উড়াল দেন।
ক্লাব ফুটবলে দেম্বেলের অর্জন ঈর্ষণীয়। বার্সেলোনার হয়ে একাধিক লা লিগা ও অন্যান্য শিরোপা জিতেছেন। বর্তমানে পিএসজির আক্রমণভাগের প্রধান ভরসা তিনি। গোল করার পাশাপাশি সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর ক্ষেত্রেও তার অবদান অসাধারণ। দুই পায়ে সমান দক্ষতায় ড্রিবলিং, গতি এবং নিখুঁত অ্যাসিস্ট তাকে বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর আক্রমণভাগের খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
ফ্রান্স জাতীয় দলের জার্সিতেও তার অবদান অনন্য। ২০১৬তে জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকে তিনি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে মাত্র ২১ বছর বয়সে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হন। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে ফ্রান্সকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। যদিও শেষ পর্যন্ত শিরোপা অধরা থেকে যায়, তবু তার গতি ও আক্রমণভাগে অবদান ছিল প্রশংসিত। এই বিশ্বকাপে দেম্বেলে আরও পরিণত। তার দৌড়, প্রেসিং, ড্রিবলিং এবং সুযোগ তৈরির ক্ষমতা ফ্রান্সের আক্রমণকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। রাউন্ড অব ৩২-এ সুইডেনের বিপক্ষে এবং রাউন্ড অব ১৬-এ প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তিনি ছিলেন ফরাসি আক্রমণের অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগকে ব্যস্ত রেখে সতীর্থদের জন্য জায়গা তৈরি করেছেন, সৃষ্টি করেছেন একের পর এক আক্রমণ।
দেম্বেলে বলেন, ‘আমি সব সময় দলের জন্য খেলতে চাই। গোল করাটা আনন্দের, গোল করাতে পারলেও আমি একইরকম খুশি হই।’ ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপ্পে দেম্বেলেকে নিয়ে বলেন, ‘উসমান যখন নিজের সেরাটা খেলতে পারে, তখন তাকে থামানো পৃথিবীর যে কোনো ডিফেন্ডারের জন্য কঠিন।’ সাবেক বার্সেলোনা কোচ জাভি হার্নান্দেজ তাকে ‘বিশ্বের অন্যতম সেরা ওয়ান-অন-ওয়ান ফুটবলার’-এর আখ্যা দিয়েছেন।







