দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেটের বৈধতা নিশ্চিত করা এবং অবৈধ হ্যান্ডসেটের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সরঞ্জাম পরিচিতি নিবন্ধন (ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার বা এনইআইআর) কার্যক্রম চালুর ছয় মাস পেরিয়ে গেছে। এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা যায়নি। নিয়ম অনুযায়ী, নিবন্ধনহীন মোবাইল হ্যান্ডসেট নির্দিষ্ট সময় পর বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। সেই কাজ এখনো করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে বিটিআরসি।

বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘প্রায় ১৮ কোটি সিমের একটি দেশে এনইআইআর হুট করে পুরোপুরি কার্যকর করে ফেলা সম্ভব নয়। এটা পর্যায়ক্রমে করা হবে। বর্তমানে বাজার মনিটর করা হচ্ছে এবং নতুন যেসব মোবাইল সেট নেটওয়ার্কে যুক্ত হচ্ছে, সেগুলোর আইএমইআই নম্বর সংশ্লিষ্ট সিমের সঙ্গে ট্যাগ করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের এনইআইআর সিস্টেমে ৭৭ কোটি ৬ কোটি আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি) নম্বরের তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে। এগুলোর মধ্যে অন্তত ৪১ কোটি ১৮ লাখ আইএমইআই গ্রে লিস্টে অর্থাৎ অনুমোদনহীন তালিকায় রয়েছে।

বিটিআরসি জানিয়েছে, আইএমইআইয়ের এই সংখ্যা মোবাইল হ্যান্ডসেটের প্রকৃত সংখ্যা নয়। কারণ, আইএমইআই ক্লোন বা নকল করে বাজারে মোবাইল হ্যান্ডসেট ছাড়া হয়। ফলে আইএমইআইয়ের সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত হ্যান্ডসেটের সংখ্যা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

অবৈধ ও অনুমোদনহীন মুঠোফোন নিয়ন্ত্রণে ২০১২ সালে উদ্যোগ নেয় সরকার। এরপর অবৈধ মোবাইল বন্ধ ও নিবন্ধনের জন্য ২০১৮-১৯ সাল নাগাদ নীতিগতভাবে কাজ শুরু করে বিটিআরসি। তবে কারিগরি প্রস্তুতির অভাব ও মোবাইল ব্যবসায়ীদের একাংশের বিরোধিতার কারণে সেই কার্যক্রম থমকে যায়। এরপর গত ২৯ অক্টোবর রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বিটিআরসি ভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার ডাক টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব এনইআইআর চালুর ঘোষণা দেন। তিনি জানান, অবৈধ মুঠোফোন ব্যবহার বন্ধে ২০২৫ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে দেশে এনইআইআর চালু হবে। পরে মোবাইল ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে এনইআইআর চালুর সময়সীমা পিছিয়ে ১ জানুয়ারি করা হয়। বিটিআরসির দাবি, সেদিন থেকে এই ব্যবস্থা চালু হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো মুঠোফোন বন্ধ হয়নি।

এনইআইআর চালুর আগে বিটিআরসি জানিয়েছিল, ১ জানুয়ারির আগে থেকে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত সব হ্যান্ডসেট স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হবে। ফলে সে সময় পর্যন্ত ব্যবহৃত কোনো হ্যান্ডসেটের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হবে না। এরপর বিদেশ থেকে আনা বা নতুন কোনো অনিবন্ধিত হ্যান্ডসেট মোবাইল নেটওয়ার্কে যুক্ত করার আগে সেটির বৈধতা যাচাই করে নিবন্ধন করতে হবে। অন্যথায় নির্দিষ্ট সময় পর কোনো নকল, অবৈধভাবে আমদানি করা বা ক্লোন হ্যান্ডসেটে সিম কাজ করবে না।

এনইআইআর চালুর পর গত ফেব্রুয়ারিতে বিটিআরসি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়েছিল, এনইআইআর সিস্টেমটি পূর্ণাঙ্গরূপে চালু রয়েছে। নেটওয়ার্কে সচল সব মোবাইল ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হয়েছে। নিজের নামে নিবন্ধিত মোবাইল ফোনের সিম কার্ড পরিবর্তনের ক্ষেত্রে অথবা অন্য কারও ব্যবহারের জন্য হস্তান্তরের বা বিক্রির আগে অবশ্যই ডি-রেজিস্ট্রেশন অর্থাৎ ছাপবাতিল বা অবমুক্ত করতে হবে। কিন্তু এই প্রক্রিয়া এখনো কার্যকর হয়নি।

বাংলাদেশ মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, এনইআইআরের মূল উদ্দেশ্য ছিল অনুমোদনহীন মোবাইল সেটের ব্যবহার বন্ধ করা। সেই উদ্দেশ্য থেকে বিটিআরসি সরে এসেছে। বাজারে সব ধরনের মোবাইল ফোন সেটই চলছে।

এ বিষয়ে বিটিআরসির চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী বলেন, একটি নির্দিষ্ট তারিখ নির্ধারণ করা হবে, এর পর থেকে নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া নতুন ডিভাইসগুলো নিবন্ধন ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। এরপর দ্বিতীয় ধাপে আগে থেকে ব্যবহৃত পুরোনো ডিভাইসগুলোকে কীভাবে সংশ্লিষ্ট সিমের সঙ্গে যুক্ত করে নিবন্ধনের আওতায় আনা যায়, সে বিষয়ে একটি পৃথক মডেল তৈরি করা হচ্ছে।

চেয়ারম্যান আরও জানান, একবারে পুরো ব্যবস্থা চালু করলে দুটি চ্যালেঞ্জ একসঙ্গে সামাল দিতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি আইএমইআই নম্বর কার্যকরভাবে ট্র্যাক করা এবং দ্বিতীয়ত, বিপুলসংখ্যক গ্রাহকের যেন কোনো ধরনের ভোগান্তি না হয়, সেটি নিশ্চিত করা। এই দুই বিষয়ের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই কমিশন ধাপে ধাপে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার পথ অনুসরণ করছে।

এনইআইআর কবে পুরোপুরি কার্যকর হবে—এই প্রশ্নের জবাবে চেয়ারম্যান বলেন, নির্দিষ্ট সময়সীমা এখনই বলা সম্ভব নয়। কারণ, বর্তমানে নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত প্রায় ১৮ কোটি সিমের সঙ্গে যুক্ত ডিভাইসগুলোর তথ্য যাচাই ও সমন্বয়ের কাজ রাতারাতি শেষ করা সম্ভব নয়। তবে এনইআইআর চালু রয়েছে এবং ধাপে ধাপে এর কার্যকারিতা বাড়ানো হবে। পুরোপুরি কার্যকর হতে কত সময় লাগবে, সেটি এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না।