একসময় এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুজ্বর ছিল বর্ষা মৌসুমের রোগ। ডেঙ্গু মানেই ছিল রাজধানী ঢাকা। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। বর্তমানে এটি সারা দেশে বিস্তৃত একটি সংক্রামক রোগ। ক্রমে এটি পরিণত হয়েছে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকটে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, আইসিডিডিআর,বি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এডিস মশা জরিপ প্রতিবেদন এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের জুন মাসের শেষ সপ্তাহে রাজধানী ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালে ২৮ বছর বয়সী এক রোগীর শরীরে প্রথমবারের মতো ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার (ডিএইচএফ) শনাক্ত হয়।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবাইকে সম্পৃক্ত হতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

এরপর ২০০০ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২৭ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর বিস্তারকে পাঁচটি পর্যায়ে ভাগ করা যায়।

প্রথম পর্যায় (২০০০-২০০২): প্রথম বড় আঘাত

২০০০ থেকে ২০০২ সাল পর্যন্ত সময়কে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রথম বড় আঘাতের সময় বলা যায়। ২০০০ সালে দেশে প্রথম বড় আকারের ডেঙ্গু মহামারি দেখা দেয়। ওই বছর ডেঙ্গুতে মোট ৫ হাজার ৫৫১ জন আক্রান্ত হন এবং মারা যান ৯৩ জন। ২০০১ সালে আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও ২০০২ সালে আবার সংক্রমণ বেড়ে যায়। সে সময় ডেঙ্গু মূলত ঢাকাকেন্দ্রিক ছিল। একই সঙ্গে রোগটি সম্পর্কে জনসচেতনতা, চিকিৎসকদের অভিজ্ঞতা ও সরকারি প্রস্তুতি- সবই ছিল সীমিত।

দ্বিতীয় পর্যায় (২০০৩-২০১৭): দীর্ঘ স্থিতিশীলতা

২০০৩ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গু সংক্রমণের দ্বিতীয় পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা যায়। এ সময়ে অধিকাংশ বছর আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। বছরে আক্রান্তের সংখ্যা ১ হাজার থেকে ৬ হাজারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকায় ডেঙ্গু পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল বলে মনে করা হয়েছিল। ২০০৭, ২০০৮, ২০০৯, ২০১০ ও ২০১৪ সালে সরকারি হিসাবে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল শূন্য বা খুবই কম।

আক্রান্তের সংখ্যা কমে যাওয়ায় অনেকের ধারণা হয়েছিল, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চলে এসেছে। কিন্তু বাস্তবে ভাইরাসটি কখনো নির্মূল হয়নি; বরং নিম্নমাত্রায় মানুষের মধ্যে সংক্রমণ অব্যাহত ছিল।

ডেঙ্গু: মৌসুমি রোগ থেকে জাতীয় জনস্বাস্থ্য সংকট

তৃতীয় পর্যায় (২০১৮-২০১৯): জাতীয় বিস্তারের সূচনা

২০১৮ ও ২০১৯ সালকে ডেঙ্গুর বিস্ফোরণের সূচনা পর্যায় বলা হয়। ২০১৮ সালে আক্রান্তের সংখ্যা প্রথমবারের মতো ১০ হাজার ছাড়িয়ে যায়। এরপর ২০১৯ সালে বাংলাদেশ প্রথম জাতীয় পর্যায়ের বড় ডেঙ্গু মহামারির মুখোমুখি হয়। ওই বছর আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখের বেশি এবং মৃত্যু হয় ১৬৪ জনের।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত নগরায়ণ, নির্মাণাধীন ভবনে জমে থাকা পানি, এডিস মশার বিস্তার এবং মশক নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতার কারণে ডেঙ্গু শুধু ঢাকা নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায়ও ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।

চতুর্থ পর্যায় (২০২০-২০২২): স্থায়ী সংকটের সূচনা

২০২০ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গুর চতুর্থ পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২০ সালে কোভিড-১৯ মহামারির কারণে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা কমে যায়। তবে ২০২১ সালে আক্রান্ত আবার বেড়ে ২৮ হাজারের বেশি হয়। ২০২২ সালে আক্রান্তের সংখ্যা ৬১ হাজার ৮৯ জন এবং মৃত্যু হয় ২৬৯ জনের।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু টিকা কেন ব্যবহার করছে না বাংলাদেশ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই বছর থেকেই ডেঙ্গু আর মৌসুমি রোগে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিতে শুরু করে।

পঞ্চম পর্যায় (২০২৩-২০২৬): নতুন বাস্তবতা

২০২৩ সাল থেকে বর্তমান সময়, অর্থাৎ ২০২৬ সাল পর্যন্ত সময়কে ডেঙ্গু সংক্রমণের নতুন বাস্তবতার পর্যায় হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০২৩ সাল বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ ডেঙ্গু বছর। ওই বছর আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন এবং মৃত্যু হয় রেকর্ড ১ হাজার ৭০৫ জনের। ২০২৪ সালে আক্রান্তের সংখ্যা আবার এক লাখ ছাড়ায়। ২০২৫ সালেও উল্লেখযোগ্য সংক্রমণ অব্যাহত ছিল।

ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক সংস্থার একক দায়িত্বের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক (Multi-sectoral) সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার বদলে জটিল হওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি আমাদের সনাতন মশা নিধন পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার ঘাটতিই প্রধানত দায়ী।-জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন

২০২৬ সালের জুন মাস পর্যন্তই প্রায় ৬ হাজার মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বর্ষাকালে এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়তে পারে।

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস

ডেঙ্গুর ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ছয় দশকেরও বেশি আগে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ঢাকায় প্রথম ডেঙ্গুসদৃশ জ্বর শনাক্ত হয়, যা ‘ঢাকা ফিভার’ নামে পরিচিত ছিল। তখন রোগটি তুলনামূলক মৃদু ছিল এবং কোনো রোগীর মৃত্যু হয়নি।

পরবর্তীসময়ে ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত মাঝে-মধ্যে বিচ্ছিন্নভাবে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেলেও কোনো বড় মহামারি দেখা দেয়নি। ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভারেরও (ডিএইচএফ) কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তবে ১৯৯৭ থেকে ১৯৯৯ সালের মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ডেঙ্গুর উপস্থিতি বাড়তে থাকে। গবেষকদের মতে, এ সময় ভাইরাসটি নীরবে বিস্তার লাভ করে এবং ২০০০ সালের মহামারির ভিত্তি তৈরি হয়।

গবেষণায় বিস্তারের যে সব কারণ উঠে এসেছে

বিভিন্ন গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন ও দীর্ঘ সময় আর্দ্র আবহাওয়া বিরাজ করায় এডিস মশার প্রজননের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হচ্ছে। আগে ডেঙ্গু ছিল শহরকেন্দ্রিক। এখন গ্রামাঞ্চলেও দ্রুত সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে, যা রোগ নিয়ন্ত্রণকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘায়িত মশার প্রজনন মৌসুম মোকাবিলায় ঢাকাকে প্রচলিত মশক নিধন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কৌশল গ্রহণ করতে হবে।-পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান

সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যায়, গত দুই দশকে বাংলাদেশের গড় তাপমাত্রা বেড়েছে এবং বৃষ্টিপাতের ধরনেও পরিবর্তন এসেছে। ফলে এডিস মশার প্রজননের সময়কাল ও বিস্তৃতি- উভয়ই বেড়েছে। গবেষণায় তাপমাত্রা ও বৃষ্টিপাতের সঙ্গে ডেঙ্গু সংক্রমণের সরাসরি সম্পর্কও পাওয়া গেছে। এ কারণেই এখন শুধু ঢাকা নয়, বরিশাল, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, রংপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়ও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ডেঙ্গু।

এখনো রয়ে গেছে চ্যালেঞ্জ

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু মোকাবিলায় এখনো বেশ কয়েকটি বড় দুর্বলতা রয়ে গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সমন্বিত মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের অভাব, নির্মাণাধীন ভবন ও জলাবদ্ধ এলাকায় নিয়মিত নজরদারির ঘাটতি, জনসচেতনতার সীমাবদ্ধতা, জেলা পর্যায়ে দ্রুত রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিবেচনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব।

আরও পড়ুন

কোন কোন উপসর্গ দেখলেই ডেঙ্গু টেস্ট করা জরুরি?

তাদের মতে, ডেঙ্গু আর রাজধানীকেন্দ্রিক, বর্ষানির্ভর একটি মৌসুমি রোগ নয়, এটি এখন জাতীয় পর্যায়ের একটি স্থায়ী জনস্বাস্থ্য সংকট। তাই শুধু বর্ষাকালে মশা নিধন অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক সংস্থার একক দায়িত্বের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক (Multi-sectoral) সংকটে রূপ নিয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দীর্ঘ এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার বদলে জটিল হওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি আমাদের সনাতন মশা নিধন পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার ঘাটতিই প্রধানত দায়ী।’

পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, ‘তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘায়িত মশার প্রজনন মৌসুম মোকাবিলায় ঢাকাকে প্রচলিত মশক নিধন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি বছরব্যাপী বৈজ্ঞানিক ও টেকসই কৌশল গ্রহণ করতে হবে।’

এজন্য আবহাওয়া পূর্বাভাসের ডেটা বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় লার্ভার প্রকোপ বাড়তে পারে তা আগে থেকেই চিহ্নিত করা এবং জলজ মশার লার্ভা দমনে বিটিআইর (Bti) মতো পরিবেশবান্ধব জৈব কীটনাশক ও ওলবাকিয়া (Wolbachia) ব্যাকটেরিয়াযুক্ত বন্ধ্যা মশা অবমুক্ত করার মতো আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে বলে মত এই বিশেষজ্ঞের।

এমইউ/এএসএ/এমএফএ