ডেঙ্গুর মরণফাঁদে ফের বন্দি হচ্ছে বাংলাদেশ। প্রতিটি বর্ষা মৌসুমের আগে স্বাস্থ্য প্রশাসন ও স্থানীয় সরকার বিভাগের টনক নড়ে ঠিকই, কিন্তু মাঠপর্যায়ে সেই তৎপরতা কেবল ‘হাঁকডাকেই’ সীমাবদ্ধ থাকছে। মশক নিধনে হাজার কোটি টাকার বাজেট আর ডেঙ্গু সচেতনতার শত শত বিজ্ঞাপনের ভিড়ে প্রাণ হারানোর মিছিল কমছে না। বরং এডিস মশার কামড় এখন সারাদেশের মানুষের নিত্যসঙ্গী।
এত কর্মসূচি ও প্রস্তুতির মধ্যেও গত ছয় মাসে ক্রমাগত বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় হাজার ১০৪ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে এক হাজার ৮১ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন, মে মাসে ৭১৪ জন ও জুন মাসে দুই হাজার ৯০৭ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে জুন মাসেই মারা গেছে ১৩ জন।
তবে এই সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ১০ হাজার ২৯৬ জন, মৃত্যু হয়েছিল ৪২ জনের। এর মধ্যে জুন মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল পাঁচ হাজার ৯৫১ জন, মৃত্যু হয়েছিল ১৯ জনের।
গত ছয় মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু ও হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের চিত্র, ছবি: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
গত এক দশকে মশক নিধনের নামে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকার বিভাগ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করেছে। কিন্তু কীটতত্ত্ববিদদের মতে, মশক নিধন কার্যক্রম এখনো সেই মান্ধাতা আমলের ‘ফগিং’ বা ধোঁয়া ছিটানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি—যেমন লার্ভা প্রজননস্থল ধ্বংস বা লার্ভিসাইড প্রয়োগের সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের অভাব প্রকট। মাঠপর্যায়ে মশক নিধন কর্মীদের তদারকির অভাবে ওষুধ প্রয়োগে যে শুভঙ্করের ফাঁকি রয়েছে, তার দায়ভার এখন সাধারণ মানুষকেই চড়া মূল্যে চোকাতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ডেঙ্গু রোগীর জন্য হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো, বিশেষ চিকিৎসা প্রটোকল মেনটেইন করাসহ নানান উদ্যোগের কথা বললেও বাস্তবে যেই সেই অবস্থা থাকে। আশঙ্কাজনক ডেঙ্গু রোগীর জন্য হাসপাতালে মেলে না নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সিট।
আরও পড়ুন
শত শত কোটি টাকা খরচ করেও কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না ডেঙ্গু?
মশার উপদ্রবে নাজেহাল নগরবাসী
সমন্বয়হীনতায় ‘মাঠহীন’ মশক নিধন
২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরবর্তীসময়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাপনায় সৃষ্ট অস্থিরতা মশক নিধন কার্যক্রমে বড় ধাক্কা দিয়েছে। বর্তমানে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার এলেও স্থানীয় সরকার বিভাগের প্রতিষ্ঠান সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই।
ওয়ার্ডে কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতি বা স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের সমন্বয়হীনতা কাজের গতি প্রায় স্থবির করে ফেলেছে। কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গু কেবল ঢাকা শহরেই সীমাবদ্ধ নেই; বরগুনার মতো জেলা শহরগুলোতেও এটি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অথচ কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় যে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, তা জেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদেরও কার্যত হাত-পা বেঁধে রেখেছে।
ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম জোরদার করতে উচ্চপর্যায়ের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করেছে সরকার। জাতীয় কমিটির সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় এবং কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে এই টাস্কফোর্স। গত ২৩ জুন সচিবালয়ে ‘ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত অন্যান্য রোগ প্রতিরোধবিষয়ক জাতীয় কমিটি’র প্রথম সভায় টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রাজধানীর মনিপুরীপাড়ায় লার্ভিসাইডিং ও ফগিং কার্যক্রম। ছবি: ডিএনসিসি
কয়েকদিন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী টাস্কফোর্স সংক্রান্ত কর্মসূচিতে যোগ দিয়েছেন। কিন্তু সবকিছুই চলছে যথারীতি। বিশেষ কোনো পদক্ষেপ নেই উল্লেখ করার মতো।
অবশ্য সিটি করপোরেশন মনে করে শুধু তাদের কার্যক্রমে মশক নিধন হবে না, জনগণেরও সহযোগিতা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, ডেঙ্গুবিরোধী নিবিড় কার্যক্রম কেবল ঢাকার উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনেই বেশি সীমাবদ্ধ থাকে, যা সারা দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও পৌরসভায় সমভাবে হচ্ছে না। ফলে ঢাকায় ডেঙ্গু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও ঢাকার বাইরে সারা দেশে এর প্রকোপ বাড়ছে। তাছাড়া সিটি করপোরেশন রাস্তাঘাট বা বাড়ির আশপাশে ওষুধ ছিটাতে পারলেও ঘরের ভেতরে গিয়ে কাজ করতে পারে না; অথচ এডিস মশার লার্ভা সবচেয়ে বেশি জন্মায় ঘরের ভেতরেই। বিশেষজ্ঞদের দ্বারা পরীক্ষিত মশার ওষুধ শতভাগ কার্যকর হলেও তা কেবল বাইরের মশা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু ছড়ানোর এডিস মশা চিনবেন কীভাবে?
ডেঙ্গুজ্বরের কারণ ও প্রতিকার
‘তাই ডেঙ্গু পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে শুধু সরকারের ওপর ভরসা না করে জনসচেতনতা সবচেয়ে বেশি জরুরি। সিটি করপোরেশনের পাশাপাশি দেশের প্রতিটি নাগরিককে নিজ উদ্যোগে সচেতন হতে হবে। নিজ ঘরে বা আশপাশে কোথাও তিন দিনের বেশি পানি জমতে দেওয়া যাবে না। পানি পরিষ্কার রাখলে মশার ডিম থেকে লার্ভা হতে পারবে না, ফলে মশার বংশবৃদ্ধি ঠেকানো সম্ভব হবে। মূলত সারা দেশে একইভাবে ডেঙ্গুবিরোধী কাজ পরিচালনা করা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার মাধ্যমেই কেবল ডেঙ্গুমুক্ত সমাজ গঠন করা সম্ভব।’ বলছিলেন ডা. নিশাত পারভীন।
হাসপাতালের সক্ষমতা: আশ্বাসের বিপরীতে বাস্তবতা
আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাস ডেঙ্গু সংক্রমণের ‘পিক আওয়ার’ হিসেবে চিহ্নিত। অথচ হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি নিয়ে সংশয় কাটছে না। সরকারি হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু শয্যা বাড়ানো হয়েছে বললেও ডেঙ্গু হেমোরেজিক ফিভার বা শক সিনড্রোমের মতো জটিল রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় আইসিইউ সুবিধা জেলা পর্যায়ে এখনো বিরল। বেসরকারি হাসপাতালে শয্যা খালি রাখা বা পরীক্ষার ফি নির্ধারণের সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হলেও নিয়মিত নজরদারির অভাবে তা বাস্তবায়নের হার শূন্যের কোটায়।
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীরা, ফাইল ছবি
দেশের অন্যতম ডেঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিতি পাওয়া ‘ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড ১৯ হাসপাতাল’ এখন আর ডেঙ্গু রোগী ভর্তি নেয় না। হাম আক্রান্ত রোগী সামাল দিতেই তাদের বেগ পেতে হচ্ছে। এর বাইরে উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে হাসপাতালগুলো হাতে গোনা কিছু রোগী চিকিৎসা দিলেও বেশিরভাগ ঢাকায় রেফার করে। যার কারণে রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, শিশু হাসপাতালে চাপ হচ্ছে বেশি। তাতে চরম মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে, সংকটাপন্ন রোগী নিয়ে বেকায়দায় পড়েন স্বজনরা।
এ নিয়ে ডিএনসিসি ডেডিকেটেড কোভিড ১৯ হাসপাতালের পরিচালক কর্নেল লুৎফা রহমান জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমার এখানে ৪৫০ জনের মতো হামের রোগী আছে। প্রতিদিন এক থেকে দেড়শ নতুন রোগী ভর্তি করতে হচ্ছে। রোগীদের সুরক্ষার স্বার্থে ডেঙ্গু বা কোভিডের রোগী আপাতত ভর্তি নিচ্ছি না। কারণ হাম, ডেঙ্গু ও কোভিড সব রোগী একসঙ্গে করে ফেললে রোগীদের সুস্থতার চেয়ে অসুস্থতার ঝুঁকি তৈরি হওয়ার শঙ্কা বেশি।’
আরও পড়ুন
মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধ বিষয়ক জাতীয় কমিটি পুনর্গঠন
ডেঙ্গু মোকাবিলায় সবাইকে সম্পৃক্ত হতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি ও নাগরিক সচেতনতা
বিশেষজ্ঞরা বারবার বলছেন, ডেঙ্গু কেবল মশা মারার বিষয় নয়, এটি একটি সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য সংকট। কিন্তু সিটি করপোরেশন কেবল রাস্তা পরিষ্কারেই ব্যস্ত, ঘরের কোণে বা টবের জমে থাকা পানির দায়িত্ব নিতে নারাজ। একই সঙ্গে নির্মাণাধীন ভবনে এডিসের লার্ভা নিধনে কঠোর আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে যে আইনি সীমাবদ্ধতা ও ঢিলেঢালা ভাব রয়েছে, তা মশা প্রজনন ক্ষেত্রকে নিরাপদ স্বর্গরাজ্যে পরিণত করেছে।
অবশ্য, ডিএসসিসির প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহানে ফেরদৌস বিনতে রহমান জাগো নিউজের কাছে দাবি করেন, ‘আমরা দেখেছি, নির্মাণাধীন বাড়ি, গাড়ির গ্যারেজসহ আবাসিক ভবনের বিভিন্ন স্থানে স্বচ্ছ পানিতে এডিসের লার্ভা জন্মাতে। ড্রেন-নালায় মশার ওষুধ ছিটানোর পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নির্মাণাধীনসহ আবাসিক ভবনে অভিযান পরিচালনা করে জরিমানা করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে।’
তবে, ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে অভিযান চালানো হয় খুবই কম। হাতে গোনা কয়েকজন এই কাজে নিয়োজিত। যার কারণে কাজের দৃশ্যমান গতি হয় না।
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গত ১ জুলাই রাজধানীর পশ্চিম শেওড়াপাড়ায় ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শন করেন। এ সময় বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান উপস্থিত ছিলেন, ছবি: পিআইডি
উত্তরণের পথ: সমন্বিত ব্যবস্থাপনা
ডেঙ্গু এখন কেবল চিকিৎসা খাতের বিষয় নয়, এটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু’। সমাধান হিসেবে বিশেষজ্ঞরা ইন্টিগ্রেটেড ভেক্টর ম্যানেজমেন্টের (আইভিএম) ওপর জোর দিচ্ছেন। ওয়ার্ডভিত্তিক লার্ভা শনাক্তকরণ, ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে স্থানীয় ফ্ল্যাট মালিক সমিতি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে এই কর্মসূচিতে সম্পৃক্ত করা না গেলে, আগামী মাসের ডেঙ্গু ঢেউ সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়বে।
কেবল প্রেস ব্রিফিং বা সতর্কবার্তায় ডেঙ্গু থামবে না। প্রশাসনের প্রয়োজন কঠোর জবাবদিহিতা আর নাগরিকদের প্রয়োজন সচেতনতার প্রতিফলন। নতুবা, প্রতি বছর আমরা একই লাশের মিছিলের সাক্ষী হয়ে থাকব।
এ বিষয়ে বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ডেঙ্গু পরিস্থিতির ভয়াবহতা থেকে বাঁচতে এবং রোগটি নিয়ন্ত্রণে মশা নিধনই একমাত্র সমাধান। যেহেতু ডেঙ্গুর জন্য সাধারণ মানুষের মধ্যে গণহারে দেওয়ার মতো কোনো কার্যকর টিকা এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত হয়নি, সেহেতু প্রতিরোধই একমাত্র পথ। তবে এই সংকট দূর করা একা সরকার বা সিটি করপোরেশনের পক্ষে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রশাসন ও দেশের সাধারণ জনগণকে যৌথভাবে মাঠে নামতে হবে। উভয়ের সম্মিলিত ও সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে মুক্তি পাওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
আরও পড়ুন
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ‘উলবাকিয়া’ পদ্ধতি ব্যবহার করতে চায় সরকার
ডেঙ্গুর চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধে গুরুত্ব দিতে হবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
এজন্য এডিস মশার বংশবৃদ্ধি রোধে ঘরের ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে কঠোর নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ। বাড়ির আশপাশে ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, প্লাস্টিকের পাত্র বা ফুলের টবে জমে থাকা বৃষ্টির পরিষ্কার পানি যেমন নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে, তেমনি ঘরের বাথরুম, বারান্দা, এসি বা ফ্রিজের নিচে জমে থাকা পানিও কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর পাশাপাশি ব্যক্তিগত সচেতনতার অংশ হিসেবে দিনের বেলা ঘুমানোর সময়ও মশারি ব্যবহার করা এবং শিশুদের সুরক্ষায় ফুল প্যান্ট ও ফুল হাতা জামা-কাপড় পরানোসহ মশা তাড়ানোর লোশন বা স্প্রে ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন বলেন, ডেঙ্গু এখন আর কোনো একক সংস্থার একক দায়িত্বের বিষয় নয়, বরং এটি একটি বহুমাত্রিক সংকটে রূপ নিয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে ডেঙ্গুর প্রকোপ কমার বদলে জটিল হওয়ার পেছনে জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি আমাদের সনাতন মশা নিধন পদ্ধতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার ঘাটতিই প্রধানত দায়ী।
ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন জানান, আগে ডেঙ্গুকে শুধু বর্ষাকালের রোগ মনে করা হলেও, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন সারা বছরই এর সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘায়িত বর্ষা, ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা এডিস মশার প্রজননের জন্য আদর্শ পরিবেশ তৈরি করছে। সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এডিস মশা এখন তার আচরণ বদলেছে। আগে এটি শুধু পরিষ্কার পানিতে জন্মাত, কিন্তু এখন ময়লা ও অপরিষ্কার পানিতেও এর বংশবিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অথচ ডেঙ্গু ভাইরাসের স্ট্রেন বা জেনোমিক গঠনে কোনো পরিবর্তন এসেছে কি না, তা নিয়ে আমাদের দেশে বড় ধরনের গবেষণার ঘাটতি রয়েছে। নিয়মিত ‘টাইম সিরিজ অ্যানালিসিস’ এবং প্রজাতির মূল্যায়ন না হওয়ায় সেই অনুযায়ী কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইন্টারভেনশন তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না।
মশা নিধনে ওষুধ ছিটাচ্ছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর্মীরা, ছবি: ডিএসসিসি
‘এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আমাদের ত্রুটিপূর্ণ ও সনাতন ভেক্টর কন্ট্রোল বা মশা নিধন পদ্ধতি। মশা নিধনে যে ওষুধ ব্যবহার করা হচ্ছে, তার সঠিক নিয়ম বা প্রসিডিউর মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন রয়েছে। মশার সুনির্দিষ্ট জোন বা হটস্পটগুলো চিহ্নিত না করে বর্তমানে গণহারে যে কোনো এক জায়গায় স্প্রে করার যে সংস্কৃতি চালু রয়েছে, তা কোনো কাজে আসছে না। ফলে মূল মশার জোনগুলো ওষুধের বাইরেই থেকে যাচ্ছে। পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে তৈরি হওয়া ঘিঞ্জি পরিবেশ এবং একটু বৃষ্টিতেই শহরের দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা এই সংকট আরও ঘনীভূত করছে।’
সবশেষে নাগরিকদের আচরণগত সমস্যা ও উদাসীনতা অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন রোগতত্ত্ববিদ ডা. তারেকুল ইসলাম লিমন। তিনি মনে করেন, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকার বা সিটি করপোরেশনের ওপর দায় চাপালে চলবে না। সাধারণ মানুষের নিজেদের ঘরবাড়ি ও আশপাশ নিয়মিত পরিষ্কার না রাখার মানসিকতা এবং যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে কৃত্রিম প্রজননক্ষেত্র তৈরি করার অভ্যাস মশার বংশবৃদ্ধি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। তাই প্রাতিষ্ঠানিক ও বৈজ্ঞানিক পদক্ষেপের পাশাপাশি নাগরিক সচেতনতার আমূল পরিবর্তন ছাড়া এই বহুমাত্রিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ডেঙ্গুর সম্ভাব্য প্রকোপ থেকে জাতিকে রক্ষা করতে দেশজুড়ে চিরুনি অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং চিকিৎসার বিশেষ প্রটোকলসহ ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছি আমরা । সারা দেশে মোবাইল টিম কাজ শুরু করেছে। কোনো বাসা-বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেলে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা ও জরিমানা করা হবে। এবার পরিত্যক্ত ওয়াশরুম, ছাদ ও গ্যারেজে জমে থাকা পানিতে মশার লার্ভা ধ্বংসে বিশেষ রাসায়নিক ব্যবহার করা হবে।
এসইউজে/এমএমএআর/ এমএফএ








