চলতি বছর বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ডেঙ্গুর প্রকোপ জনমনে গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টিপাত আর ভ্যাপসা গরমে এডিস মশার বংশবিস্তার বাড়ছে পাল্লা দিয়ে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, বেশি ঝুঁকিতে দেশের চার জেলা ও ঢাকা সিটির ২৭টি ওয়ার্ড।

এক সময় ডেঙ্গু মূলত ঢাকা শহরকেন্দ্রিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত হলেও বর্তমান চিত্র বলছে, তা এখন রাজধানী থেকে শুরু করে প্রান্তিক জেলা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারি হিসাবে চলতি বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় ছয় হাজার মানুষ এবং প্রাণ হারিয়েছেন ১৩ জন।

আরও পড়ুন

জ্বর হওয়ার কতদিনের মধ্যে কোন টেস্ট করলে ডেঙ্গু ধরা পড়ে?

গত বছর দেশে এক লাখ দুই হাজার ৮৬১ জন মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং মৃত্যু হয়েছিল ৪১৩ জনের। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি তার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ ৪ জেলা

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সবশেষ কীটতাত্ত্বিক জরিপ ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে ঝিনাইদহ, মাগুরা, পিরোজপুর ও পটুয়াখালী জেলার পৌরসভা এলাকা। ডেঙ্গুর বিস্তারের হার মাপার সূচক ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ অনুযায়ী, ২০-এর বেশি হলে ওই এলাকাকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

জরিপ অনুযায়ী ঝিনাইদহ পৌরসভায় এই সূচক ৬০ শতাংশ, মাগুরায় ৫৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ, পিরোজপুরে ২০ শতাংশ এবং পটুয়াখালীতে ১৯ দশমিক ২৬ শতাংশ।

গত বছরের নভেম্বরে আইইডিসিআরের জরিপেও উপকূলীয় এলাকার পানির পাত্রগুলোতে এডিস মশার লার্ভার ব্যাপক উপস্থিতি পাওয়া গিয়েছিল, যা এখন নতুন করে সংক্রমণের ঝুঁকি তৈরি করেছে। বিশেষ করে বরিশাল ও খুলনা বিভাগে আক্রান্তের হার অন্য অঞ্চলের তুলনায় বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

অধিক ঝুঁকিপূর্ণ রাজধানী ঢাকা

বিগত কয়েক বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর প্রায় অর্ধেকই ঘটছে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায়। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মৃত্যুর হার তুলনামূলক বেশি।

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু সংক্রমণের মূল কারণ জলবায়ু পরিবর্তন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অপারেশনাল প্ল্যান বন্ধ থাকায় এবার তাদের পক্ষ থেকে প্রাক-বর্ষা কোনো জরিপ পরিচালিত হয়নি। তবে প্রথমবারের মতো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) জরিপ পরিচালনা করে।

৭৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬৩টিতেই এডিস মশার ঘনত্ব নির্ধারিত মানের চেয়ে বেশি পাওয়া গেছে এবং এর মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গু সংক্রমণের জন্য ‘অধিক ঝুঁকিপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিপরীতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পুরোনো জরিপের তথ্যকে সামনে রেখে মশক নিধনের কাজ চালাচ্ছে।

দক্ষিণ সিটির অধিক ঝুঁকিপূর্ণ ২৭ ওয়ার্ড হলো- ২, ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১১, ১৩, ১৫, ১৭, ২০, ২১, ২৩, ২৪, ২৫, ২৬, ২৮, ৩২, ৩৬, ৩৮, ৫২, ৫৫, ৫৬, ৫৭, ৬২, ৬৮ ও ৭৩।

পরামর্শ ও করণীয়

কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার জাগো নিউজকে বলেন, ‘ডেঙ্গু এখন এপিডেমিক সাইকেল বা মহামারি চক্রে প্রবেশ করেছে। ঢাকায় এরই মধ্যে ৫০ শতাংশের বেশি মানুষ সংক্রমিত হওয়ায় এখানে সংক্রমণের হার কিছুটা কমতির দিকে থাকলেও জেলা শহরগুলোতে নতুন হটস্পট তৈরি হচ্ছে।’

আরও পড়ুন

ডেঙ্গু জ্বর নিয়ন্ত্রণের ঘরোয়া ৫ উপায় জেনে রাখুন

তিনি দ্রুত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ জেলাগুলোর হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসাসামগ্রী ও প্রশিক্ষিত জনবল প্রস্তুত রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও দ্রুত নগরায়ণের কারণে ডেঙ্গুর মৌসুমি ধারা বদলে যাচ্ছে।’

পরিস্থিতি উত্তরণে তিনি কমিউনিটি মোবিলাইজেশন বা জনগণকে সম্পৃক্ত করে প্রতিটি বাসায় গিয়ে লার্ভা পরীক্ষার ব্যবস্থা করার পরামর্শ দেন।

সচেতনতা ও সরকারি নির্দেশনা

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, কেবল বাড়ির বাইরের পরিবেশে ওষুধ ছিটিয়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। ডিএসসিসির উপ-প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. নিশাত পারভীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘মশার লার্ভা সবচেয়ে বেশি জন্মায় ঘরের ভেতরে। তাই শুধু সরকারি উদ্যোগ নয়, নাগরিকদের নিজ উদ্যোগে সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো পাত্রে যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, তা নিশ্চিত করতে হবে।’

আরও পড়ুন

জ্বরসহ আর কোন লক্ষণে বুঝবেন আপনি ডেঙ্গুতে আক্রান্ত

এদিকে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন ডেঙ্গু রোগীদের সেবায় বেসরকারি হাসপাতালে ১০ শতাংশ বেড ফাঁকা রাখা, টেস্ট ফি-তে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় ও চিকিৎসকদের পরামর্শ ফি মওকুফের নির্দেশনা দিয়েছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগস্টের সম্ভাব্য ঢেউ মোকাবিলায় এখনই মাঠপর্যায়ে কাজের ঘনিষ্ঠ তদারকি ও বছরব্যাপী সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনা করা প্রয়োজন।

এসইউজে/এএসএ