বাংলাদেশে প্রতি বছর বর্ষা মৌসুম এলেই বেড়ে যায় ডেঙ্গুর প্রকোপ। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। চলতি বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন প্রায় ছয় হাজার মানুষ, মারা গেছেন অন্তত ১৮ জন (২৯ জুন পর্যন্ত)।

সাধারণত ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশার কামড়ে একজন মানুষ ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হন। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বলছে, প্রতি চারজনে একজন ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তি ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা থাকে। মারাত্মকভাবে আক্রান্ত ব্যক্তির জীবন দ্রুতই হুমকির মুখে পড়তে পারে বলে হাসপাতালে ভর্তির প্রয়োজন হতে পারে।

সংস্থাটির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, সাধারণত জ্বরই এ রোগের লক্ষণ। সঙ্গে বমি, র‍্যাশ ওঠা, চুলকানি বা ব্যথার উপসর্গ থাকতে পারে। তবে লক্ষণগুলো সাধারণত দুই থেকে সাতদিন পর্যন্ত থাকে এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই বেশিরভাগ রোগী সুস্থতার দিকে চলে আসেন।

তবে চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলেন, জ্বর কমলে বা রোগী ভালো হয়ে যাওয়ার পর রোগীর রক্তের প্লাটিলেট কাউন্ট কমে যেতে পারে এবং তখনই রক্তক্ষরণসহ নানা জটিলতা দেখা দিতে পারে। এ কারণে জ্বর চলে যাওয়ার পর রোগীকে সতর্ক থেকে নিয়ম অনুযায়ী চলতে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেন তারা।

সিডিসি বলছে, ডেঙ্গু রোগের সুনির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। বরং এর লক্ষণগুলো দেখে চিকিৎসকরা চিকিৎসা দেন। (যেমন জ্বর হলে জ্বরের ওষুধ)।

ঢাকায় বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসক সাজ্জাদ হোসেন জানান, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ব্যক্তির জন্য সাধারণত ডেঙ্গু এনএস১ এন্টিজেন, অ্যান্টিবডি পরীক্ষা, সিবিসি (প্লাটিলেট কাউন্টসহ) পরীক্ষা করাই যথেষ্ট হয়ে থাকে।

তবে রোগীর অবস্থা জটিল হলে বা রক্তক্ষরণের মতো সমস্যা দেখা দেলে তখন আরও কিছু টেস্ট করানো দরকার হয়।

মশা
এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু ভাইরাস ছড়ায়/ ছবি: পেক্সেলস

কোন টেস্ট করাতে হবে

সিডিসি বলছে, ডেঙ্গু হয়েছে কি না সেটি বোঝার একমাত্র উপায় হলো রক্ত পরীক্ষা। তবে চিকিৎসকরা বলছেন, রক্তের বেশকিছু পরীক্ষা আছে যেগুলোর এক বা একাধিক অনেক সময় করাতে হয় রোগীর অবস্থা বুঝে।

সাধারণত যেসব পরীক্ষা করাতে হয় তার কয়েকটি সম্পর্কে কিছু তথ্য নিচে দেওয়া হলো:

ডেঙ্গু এনএস ১

যুক্তরাষ্ট্রের সিডিসি বলছে, এই টেস্টের মাধ্যমে কেউ ডেঙ্গু পজিটিভ কি না সেটি দেখা যায়। ডেঙ্গু ভাইরাসে সংক্রমিত হওয়ার শুরুর দিকেই এ পরীক্ষার মাধ্যমে রোগটি শনাক্ত করা যায়।

ঢাকায় চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জ্বরের প্রথমদিন থেকেই ডেঙ্গু এনএস১ টেস্টের ফল পজিটিভ হওয়ার কথা। চতুর্থ বা পঞ্চম দিনে হলে এটি নেগেটিভ হয়ে যায়। কিন্তু এর বেশিদিন হলে তখন আর এই পরীক্ষা করে খুব একটা লাভ হয় না।

আবার শুরুতেই পরীক্ষা করে নেগেটিভ হলেই যে ডেঙ্গু জ্বর হয়নি এমনটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। সাধারণত চিকিৎসকরা টেস্টের ফলাফলের সঙ্গে অন্য উপসর্গ ও লক্ষণ মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নেন। কারণ অনেক সময় এনএস১ একদিন পজিটিভ হলে পরদিনই আবার নেগেটিভ হতে পারে।

সাজ্জাদ হোসেন জানান, সাধারণত জ্বর আসার প্রথমদিনই এই টেস্ট করাতে পারলে ফলাফল ঠিকঠাক মেলার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

ডেঙ্গু আইজিএম

সিডিসি বলছে, এই টেস্টের মাধ্যমে আক্রান্ত ব্যক্তির শরীরে ডেঙ্গু ভাইরাস আরও ভালোভাবে শনাক্ত করা যায়।

সাধারণত জ্বর হওয়ার চার-পাঁচদিন অতিবাহিত হলে এবং এর মধ্যে কোনো পরীক্ষা না হলে এই পরীক্ষার মাধ্যমে পজিটিভ কি না সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। তাই সাধারণভাবে জ্বর আসার পাঁচদিন পর এই টেস্ট করতে বলেন চিকিৎসকরা।

কিন্তু যদি জ্বর আসার পর ৯-১০ দিন পার হয়ে যায়, তখন আবার এই পরীক্ষাও শুধু নেগেটিভ দেখাতে পারে। কারও জ্বর হওয়ার পাঁচদিন পর অর্থাৎ ষষ্ঠ দিনের মাথায় এই পরীক্ষাটি করানো, যা ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত করা যায়। রক্তে আইজিএম পজিটিভ থাকলে বুঝতে হবে বর্তমানে রোগীর সংক্রমণ রয়েছে।

উপজেলা পর্যায়ে একটি সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসক মো. রায়হান বলেন, এনএস১ এর সময়সীমা পার হলে অ্যান্টিবডি পরীক্ষার মাধ্যমেই ডেঙ্গু পজিটিভ কি না তা দেখা যায়। এজন্য প্রথমে আইজিএম ও এরপর আইজিজি টেস্ট করে দেখার দরকার হতে পারে।

dengue
দেশে বাড়ছে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা/ ফাইল ছবি

আইজিজি

ডা. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, শরীরের ইমিউন সিস্টেম বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কতটা আছে সেটি বোঝার জন্য চিকিৎসকরা এ পরীক্ষাটি দেন।

‘এই রোগ প্রতিরোধী সক্ষমতাই শরীরের ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসসহ বিভিন্ন সংক্রমণ থেকে শরীরকে রক্ষার জন্য অ্যান্টিবডি তৈরি করে। অ্যান্টিবডিগুলো হলো প্রোটিন যা ইমিউন সিস্টেম তৈরি করে জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য।’

আইজিজি সূচক স্বাভাবিকের চেয়ে কম মানে হলো শরীর যথেষ্ট অ্যান্টিবডি তৈরি করতে অক্ষম এবং সেক্ষেত্রে সংক্রমণে অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

রক্তে আইজিজি পজিটিভ থাকলে বুঝতে হবে আগে রোগীর সংক্রমণ ছিল এবং বর্তমানে সে দ্বিতীয়বারের মতো ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে।

আর দ্বিতীয়বার ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়া মানে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং তখন বিশেষ সতর্কতা নিতে হবে।

কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট বা সিবিসি

ডা. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, শরীর সম্পর্কে একটি বেসিক ধারণার জন্য এ পরীক্ষাটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি মূলত একটি সামগ্রিক রক্ত পরীক্ষা।

সিবিসি টেস্ট হিসেবে পরিচিত হলেও এটি আসলে একটি টেস্ট প্রোফাইল। এর মধ্যে রক্তের প্লাটিলেট কাউন্টসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যায়।

এ টেস্টের মাধ্যমে রক্তের প্রয়োজনীয় কোষীয় উপাদানের ঘনত্বের পরিমাপের পাশাপাশি শরীরে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে কি না তা পর্যালোচনা করা হয়।

অর্থাৎ রোগী কোনো সংক্রমণের শিকার হয়েছে কি না, রক্তকণিকা স্বাভাবিক কি না বা হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কেমন, এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝার জন্য চিকিৎসকরা এ টেস্ট দেন।

যেমন- ফুসফুস থেকে দেহের অন্য অংশে অক্সিজেন নেওয়ার কাজটি করে লোহিত রক্তকণিকা কিংবা জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে শরীরকে সংক্রমণ থেকে রক্ষার চেষ্টা করে শ্বেত রক্তকণিকা কিংবা রক্তপাত বন্ধ করতে ও রক্ত জমাট বাঁধতে ভূমিকা রাখে প্লাটিলেট। এগুলোর জন্য সিবিসি টেস্টই করতে হয়।

আবার, ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত রোগীর জন্য হেমাটোক্রিট দেখাটাও গুরুত্বপূর্ণ। রক্তের কতটা অংশজুড়ে লোহিত কণিকা সে সম্পর্কে জানা যায় হেমাটোক্রিট দেখে।

হেমাটোক্রিট, হিমোগ্লোবিন ও লোহিত কণিকার মাত্রা কম থাকলে রক্ত স্বল্পতায় আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থাকে। পাশাপাশি, দেখা দিতে পারে শরীরে অতিরিক্ত পানি, অস্থিমজ্জার সমস্যা কিংবা লিউকোমিয়ার মতো রোগও।

প্রথ্রোমোবিন টাইম বা পিটি

প্রথ্রোমোবিন টাইম বা পিটি হলো এমন একটি পরীক্ষা যার মাধ্যমে রক্তের তরল অংশের প্লাজমা জমাট বাঁধতে কতটা সময় নেয় তা পরিমাপ করে। ক্লটিং বা জমাট বাঁধার সিস্টেমের একটি অংশের কার্যকারিতা এ পরীক্ষায় পরিমাপ করা যায়।

সাধারণত অস্বাভাবিক রক্তপাতের কারণ নির্ধারণে কিংবা লিভার কতটা ভালো কাজ করছে সেটি জানার জন্য চিকিৎসক অনেক সময় এ টেস্টের পরামর্শ দেন।

ইন্টারন্যাশনাল নর্মালাইজড রেশিও বা আইএনআর

ইন্টারন্যাশনাল নর্মালাইজড রেশিও বা আইএনআর এমন একটি রক্ত পরীক্ষা, যার মাধ্যমে জানা যায় যে রক্ত জমাট হতে কতটা সময় লাগে।

মূলত পিটি পরীক্ষার মাধ্যমে কত দ্রুত রক্ত জমাট বাঁধছে জানার পর সেই ফলগুলোকেই আইএনআর হিসেবে প্রকাশ করা যায়। তখন জানা যায় যে, ঠিক কতটা সময় লাগছে রক্ত জমাট বাঁধতে।

ব্লিডিং টাইম ক্লটিং টাইম বা বিটিসিটি

ব্লিডিং টাইম ক্লটিং টাইম বা বিটিসিটি পরীক্ষার মাধ্যমে রক্তের ১৩টি ফ্যাক্টর নির্ণয় করা যায়। সাধারণত অস্ত্রোপচারের আগে এই পরীক্ষা করা হয়।

ফলে এর মাধ্যমে চিকিৎসক একটি ধারণা পান যে, অস্ত্রোপচারের পর রোগীর রক্ত জমাট বাঁধতে কতক্ষণের মধ্যে।

ডেঙ্গু রোগীর ক্ষেত্রে এ টেস্ট খুব একটা দরকার হয় না। তবে চিকিৎসক যদি মনে করেন বিশেষ জটিলতায় আক্রান্ত, তখন এ টেস্ট করার পরামর্শ দিতে পারেন।

চিকিৎসক সাজ্জাদ হোসেন জানান, মূলত ব্লিডিং ডিজঅর্ডার সম্পর্কে বোঝার জন্যই এসব পরীক্ষা করতে হয়।

এছাড়াও নানান ধরনের পরীক্ষা আছে যেগুলো রোগীর অবস্থা বুঝে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকরা করানোর পরামর্শ দিতে পারেন।

সূত্র: বিবিসি বাংলা
কেএএ/ এমএফএ