বর্ষাকাল এলেই বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। জ্বর, শরীরব্যথা বা মাথাব্যথার মতো সাধারণ উপসর্গ দিয়ে শুরু হওয়া এই রোগ কখন যে গুরুতর রূপ নেয়, তা অনেক সময় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্রথম ২৪ ঘণ্টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে জটিলতার ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। আবার অবহেলা করলে রোগীর অবস্থা দ্রুত খারাপ হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গুর কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ নেই। তাই রোগটি মোকাবিলার মূল কৌশল হলো দ্রুত শনাক্ত করা, শরীরে পর্যাপ্ত তরল বজায় রাখা, নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনে সময়মতো হাসপাতালে নেওয়া।

আরও পড়ুন

প্রতিদিন ১০ মিনিটের অভ্যাসেই কমতে পারে ডেঙ্গুর ঝুঁকি

তাহলে ডেঙ্গুর লক্ষণ দেখা দিলে প্রথম ২৪ ঘণ্টায় কী করবেন?

প্রথমেই লক্ষণগুলো চিনে নিন

ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ অনেক সময় সাধারণ ভাইরাসজনিত জ্বরের মতোই মনে হতে পারে। তবে এই উপসর্গগুলো দেখা দিলে সতর্ক হওয়া জরুরি- হঠাৎ ১০১ থেকে ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, শরীর, পেশি ও জয়েন্টে তীব্র ব্যথা, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমিভাব বা বমি, ক্ষুধামন্দা ও ত্বকে লালচে র‍্যাশ। এসব লক্ষণ দেখা দিলে নিজে থেকে অনুমান না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করুন

অনেকেই জ্বর হলেই ধরে নেন এটি ডেঙ্গু, আবার কেউ ভাবেন সাধারণ ভাইরাল জ্বর। দুই ক্ষেত্রেই ভুল সিদ্ধান্ত ক্ষতির কারণ হতে পারে। জ্বর শুরু হওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব একজন নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। তিনি রোগীর উপসর্গ, শারীরিক অবস্থা এবং প্রয়োজনে পরীক্ষার পরামর্শ দেবেন। নিজে থেকে ওষুধ খাওয়া বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরামর্শ অনুসরণ করা উচিত নয়।

পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ শুরু করুন

ডেঙ্গুতে শরীর থেকে তরল বেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই শুরু থেকেই পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। খেতে পারেন বিশুদ্ধ পানি, ওরস্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত, স্যুপ, পাতলা ভাতের মাড় ও ফলের রস (অতিরিক্ত চিনি ছাড়া)। অল্প অল্প করে বারবার তরল পান করলে শরীরে পানিশূন্যতার ঝুঁকি কমে।

আরও পড়ুন

বাংলাদেশে ডেঙ্গু: ২৭ বছরের এক ‘অবহেলিত’ জনস্বাস্থ্য সংকট

বিশ্রামই সবচেয়ে বড় ওষুধ

ডেঙ্গু হলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তাই এই সময় অযথা কাজের চাপ নেওয়া বা বাইরে ঘোরাঘুরি না করাই ভালো। পর্যাপ্ত ঘুম ও বিশ্রাম রোগীকে দ্রুত সুস্থ হতে সাহায্য করে।

জ্বর কমাতে কী করবেন?

ডেঙ্গুতে জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সাধারণত প্যারাসিটামল সেবন করা হয়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আইবুপ্রোফেন, ডাইক্লোফেনাক, ন্যাপ্রোক্সেন বা অ্যাসপিরিনজাতীয় ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া উচিত নয়। এসব ওষুধ রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। জ্বর বেশি হলে ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দেওয়াও কিছুটা আরাম দিতে পারে।

কখন পরীক্ষা করাবেন?

অনেকেই জ্বরের প্রথম দিনেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করিয়ে ফেলেন। কিন্তু সব সময় প্রথম দিন পরীক্ষায় সঠিক ফল নাও আসতে পারে। চিকিৎসক রোগের সময়কাল ও উপসর্গ বিবেচনা করে সাধারণত এনএস১ অ্যান্টিজেন, সিবিসি বা অন্যান্য পরীক্ষার পরামর্শ দেন। তাই নিজের সিদ্ধান্তে পরীক্ষা না করে চিকিৎসকের নির্দেশনা অনুসরণ করাই ভালো।

বিপজ্জনক লক্ষণগুলো নজরে রাখুন

ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে শুধু জ্বর নয়, রোগীর সামগ্রিক অবস্থার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনো একটি দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে। যথা- তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, নাক, মাড়ি বা অন্য কোথাও রক্তক্ষরণ, কালো বা রক্তমিশ্রিত পায়খানা, শ্বাসকষ্ট, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা অচেতন হওয়ার প্রবণতা, প্রস্রাব কমে যাওয়া।-এসব লক্ষণ শরীরের গুরুতর জটিলতার ইঙ্গিত হতে পারে।

আরও পড়ুন

শ্রীলঙ্কায় ডেঙ্গু মোকাবিলায় সেনাবাহিনী, বাড়িতে মশা জন্মালেই শাস্তি

প্লাটিলেট নিয়ে অযথা ভয় পাবেন না

ডেঙ্গু হলেই অনেকের প্রথম প্রশ্ন থাকে ‘প্লাটিলেট কত?’ বাস্তবে চিকিৎসকেরা শুধু প্লাটিলেটের সংখ্যা দেখে সিদ্ধান্ত নেন না। রোগীর রক্তচাপ, নাড়ির গতি, রক্তক্ষরণের লক্ষণ, প্রস্রাবের পরিমাণ এবং অন্যান্য ক্লিনিক্যাল বিষয়ও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তাই প্লাটিলেট কিছুটা কমেছে দেখেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই।

পুষ্টিকর খাবার খান

জ্বরের সময় ক্ষুধা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবু চেষ্টা করুন সহজপাচ্য ও পুষ্টিকর খাবার খেতে। যেমন-খিচুড়ি, নরম ভাত, ডাল, স্যুপ, দই, মৌসুমি ফল ও সিদ্ধ সবজি। শরীরে পর্যাপ্ত শক্তি বজায় রাখতে নিয়মিত অল্প অল্প করে খাবার গ্রহণ করা জরুরি।

কী করবেন না

  • নিজে থেকে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করবেন না।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ব্যথানাশক ওষুধ খাবেন না।
  • পেঁপে পাতার রস বা ভেষজ চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে মূল চিকিৎসা বিলম্ব করবেন না।
  • অতিরিক্ত শারীরিক পরিশ্রম করবেন না।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া প্লাটিলেট দেওয়ার কথা ভাববেন না।
  • পরিবারের সদস্যদেরও সতর্ক থাকতে হবে

ডেঙ্গু রোগীকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করা জরুরি। কারণ আক্রান্ত ব্যক্তিকে এডিস মশা কামড়ালে সেই মশা অন্য সুস্থ মানুষকেও সংক্রমিত করতে পারে। তাই- রোগীকে সম্ভব হলে মশারির মধ্যে রাখুন। ঘরে মশা প্রতিরোধের ব্যবস্থা করুন। আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকলে দ্রুত পরিষ্কার করুন।

আরও পড়ুন

বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গু, সতর্ক থাকার আহ্বান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার

কেন প্রথম ২৪ ঘণ্টা এত গুরুত্বপূর্ণ?

ডেঙ্গুর শুরুতে রোগীকে সঠিকভাবে পর্যবেক্ষণ করলে অনেক জটিলতা আগেই শনাক্ত করা যায়। সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ, পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, বিশ্রাম এবং সতর্কতামূলক লক্ষণ সম্পর্কে সচেতন থাকলে অধিকাংশ রোগী নিরাপদেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। অন্যদিকে অবহেলা, গুজবে বিশ্বাস বা দেরিতে হাসপাতালে যাওয়া রোগকে জটিল করে তুলতে পারে।

ডেঙ্গু নিয়ে আতঙ্ক নয়, দরকার সচেতনতা। জ্বর শুরু হওয়ার পর প্রথম ২৪ ঘণ্টা হলো রোগ ব্যবস্থাপনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, পর্যাপ্ত তরল পান করা, বিশ্রামে থাকা এবং বিপজ্জনক লক্ষণগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাই সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ।

তথ্যসূত্র: ইউনিসেফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা

জেএস/