দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বেড়েই চলছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চলতি বছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত এডিস মশাবাহিত এ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন ৫১ হাজার ৮৩৭ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৩২ হাজার ২০৫ জন। যা মোট আক্রান্তের ৬২ দশমিক ৪ শতাংশ। নারী আক্রান্ত হয়েছেন ১৯ হাজার ৩৯১ জন, যা মোট আক্রান্তের ৩৭ দশমিক ৬ শতাংশ।

তবে, মৃত্যুর হিসাবে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। এখন পর্যন্ত মশাবাহিত এই রোগে মারা গেছেন ১৪৯ জন। তাদের মধ্যে পুরুষ ৭২ জন এবং নারী ৭৬ জন। একজনের লিঙ্গ পরিচয় অজ্ঞাত। আক্রান্তের সংখ্যায় পুরুষ নারীর তুলনায় প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি হলেও মৃত্যুর ক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, ‍“পুরুষদের ডেঙ্গু আক্রান্তের হার বেশি হওয়ার পেছনে তাদের বাইরে চলাফেরা একটি কারণ হতে পারে। কর্মজীবী পুরুষদের অনেকে দিনের বড় একটি সময় বাসার বাইরে থাকেন। কর্মস্থল ও যাতায়াতের পথে এডিস মশার কামড়ে তাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।”

তিনি বলেন, “দিনের বেলায় এডিস মশা বেশি কামড়ায় বলে বাইরে অবস্থানের সময়ও মশার কামড় থেকে সুরক্ষার ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। ঘর ও কর্মস্থলের আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে যাতে এডিস মশা বংশবৃদ্ধি না করতে পারে।”

আক্রান্তের সংখ্যা কম হলেও নারীদের মৃত্যু বেশি হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার বলে মনে করেন এই জনস্বাস্থ্যবিদ। তিনি বলেন, “ডেঙ্গুতে নারী-পুরুষ উভয়েরই জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই শুধু আক্রান্তের সংখ্যা দেখে ঝুঁকি নির্ধারণ না করে রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর নজর দিতে হবে।”

ডেঙ্গু আক্রান্ত হলে পর্যাপ্ত তরল গ্রহণ, বিশ্রাম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দেন তিনি। বিশেষ করে জ্বর কমে যাওয়ার পর রোগী ভালো হয়ে গেছেন এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অতিরিক্ত দুর্বলতা, অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা শ্বাসকষ্টের মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া প্রয়োজন।

অধ্যাপক ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, “অনেক নারী অসুস্থ হলেও পরিবারের কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এতে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম ও চিকিৎসা নিতে দেরি হতে পারে। তাই ডেঙ্গু আক্রান্ত নারীর শারীরিক অবস্থার দিকে পরিবারের সদস্যদেরও বাড়তি নজর রাখা দরকার।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নারী ও পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই ডেঙ্গু আক্রান্তদের বড় একটি অংশ কর্মক্ষম বয়সী মানুষ। মোট আক্রান্তের প্রায় ৪০ শতাংশের বয়স ২১ থেকে ৪৫ বছরের মধ্যে। এই বয়সী মানুষেরা কাজ, শিক্ষা ও দৈনন্দিন প্রয়োজনে নিয়মিত বাইরে বের হন। ফলে তাদের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে এই বয়সীদের মধ্যে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও ঊর্ধ্বমুখী।

মাসভিত্তিক হিসাবেও ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জানুয়ারিতে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ১ হাজার ৮১ জন। ফেব্রুয়ারিতে ৪০৯ জন, মার্চে ৩৫৩ জন, এপ্রিলে ৬৪০ জন এবং মে মাসে ৭১৪ জন আক্রান্ত হন। জুনে আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাইয়ে আক্রান্ত হন ২ হাজার ৯০৬ জন। এরপর আগস্টে পরিস্থিতির বড় ধরনের অবনতি হয়। ওই মাসে ডেঙ্গু আক্রান্ত হন ২০ হাজার ৫৩৬ জন।

চলতি সেপ্টেম্বরেও আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। মাসের প্রথম ১৩ দিনেই ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১৫ হাজার ৯৯১ জন। ফলে বছরের শুরু থেকে এ পর্যন্ত মোট আক্রান্তের বড় একটি অংশই হয়েছে আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে।

মৃত্যুর দিক থেকেও সাম্প্রতিক তিন মাসে পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এ সময়ে মোট মৃত্যুর প্রায় ৯০ শতাংশই হয়েছে। জুলাই মাসে ডেঙ্গুতে ৩৬ জনের মৃত্যু হয়। আগস্টে মৃত্যু হয়েছে ৪৩ জনের। আর সেপ্টেম্বর মাসে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৫২ জন।

জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক ডা. মোজাম্মেল হক বলেন, “ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে হবে না। একই সঙ্গে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস এবং মশার কামড় থেকে ব্যক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জ্বর হলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার পরিবর্তন পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।”