সবশেষ ২০২৫ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ২২ লাখ ৪৯ হাজার টন খাদ্যশস্য মজুত করে ইতিহাসের সর্বোচ্চ মজুতের রেকর্ড গড়েছিল। তার আগে ২০২২ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের রেকর্ড ছিল ১৯ লাখ ৮৫ হাজার মেট্রিক টনের।

কিন্তু বর্তমানে খাদ্য মজুতে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে গেছে। তথ্য বলছে, এখন সরকারি গুদামে চাল ও গমের (খাদ্যশস্য) মজুত রয়েছে ২২ লাখ ৬২ হাজার ২৪৮ টন। অর্থাৎ, খাদ্যে নতুন সবোর্চ্চ মজুতের রেকর্ড গড়েছে বর্তমান সরকার।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, সরকারি গুদামে এখন ১৮ লাখ ৫ হাজার ১৮৯ টন চাল, ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৬১ টন ধান ও ৩ লাখ ৩০ হাজার ২০৫ টন গম রয়েছে। দেশে কখনো এতো বেশি চালের মজুত ছিল না।

এদিকে, সরকারি খাদ্য সংগ্রহ কাজে নিয়োজিত সংস্থা খাদ্য অধিদপ্তর বলছে, দেশের এ সর্বোচ্চ মজুতের কারণে এখন সরকারি গুদামে শস্য রাখার জায়গা নেই। সমস্যা হচ্ছে সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় বস্তারও। এরই মধ্যে বোরো মৌসুমে ধান চাল সংগ্রহ অভিযান চলছে, যা ৩১ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। গত বছরগুলোর তুলনায় এবার ধান সংগ্রহের গতিও আশাব্যঞ্জক।

সরকারি গুদামে এখন ১৮ লাখ ৫ হাজার ১৮৯ টন চাল, ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৬১ টন ধান ও ৩ লাখ ৩০ হাজার ২০৫ টন গম রয়েছে। দেশে কখনো এতো বেশি চালের মজুত ছিল না।—খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য

অধিদপ্তর মনে করছে, সংগ্রহ অভিযান শেষে সরকারি মজুত আরও শক্তিশালী রেকর্ড গড়বে, যা খাদ্য সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

অধিদপ্তরের সংগ্রহ বিভাগের পরিচালক মনিরুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, আমরা অতীতের মজুতের সব রেকর্ড ভেঙেছি। বোরো সংগ্রহ শেষে এ মজুত আরও বাড়বে।

jagonews24এবছর চাল সংগ্রহ আশাব্যঞ্জক/ফাইল ছবি

তিনি বলেন, এ মজুতের কারণে এখন বাজারদর স্থিতিশীল রয়েছে, ভবিষ্যতেও সরবরাহব্যবস্থা ভালো থাকবে। এছাড়াও বৈদেশিক আমদানিনির্ভরতা নেই, কোনো চাল আমদানি হচ্ছে না। ভবিষ্যতেও খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে কোনো সংকট নেই।

আরও পড়ুন

বোরো উৎপাদন সন্তোষজনক, লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সরকারের একগুচ্ছ উদ্যোগ

বোরো সংগ্রহের তথ্য বলছে, এ পর্যন্ত বোরো মৌসুমের ৮ লাখ ১৮ হাজার ৫৯৩ টন সিদ্ধ চাল, ৫৮ হাজার ৭৪২ টন আতপ চাল ও ৩ লাখ ৪ হাজার ৩০০ টন ধান সংগ্রহ হয়েছে। আগস্ট পর্যন্ত ১২ লাখ টন সিদ্ধ চাল, ১ লাখ টন আতপ চাল ও ৫ লাখ টন ধান সংগ্রহ করবে সরকার।

দেশে সরকারি পর্যায়ে খাদ্যশস্য সংগ্রহ ও বিতরণ কার্যক্রম একই সঙ্গে চলে। অর্থাৎ, উৎপাদন মৌসুমে কৃষকদের কাছে ধান-চাল কেনার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়। অন্যদিকে, সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকার খাদ্য অধিদপ্তরের মাধ্যমে সারাবছর বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা ও বিপণন কর্মসূচির আওতায় খাদ্যশস্য বিতরণ করে। ফলে এ মজুতের পরিমাণ সবসময় কম-বেশি হয়।

jagonews24মাঠপর্যায় থেকে ধান সংগ্রহ চলছে/ফাইল ছবি

সরকারের মজুত সন্তোষজনক হলে বাজারে সরবরাহব্যবস্থার চাপ কমে। ভোক্তারা কম দামে চাল কিনতে পারে। সরকারও নানান সামাজিক সুরক্ষা ও বিপণন কর্মসূচির আওতা বাড়িয়ে দেয়, যার সুফল পায় সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষেরা।

সবসময় একটা দেশের সরকারকে আপদকালীন মজুত হিসেবে ১৫ দিনের খাবার রাখতে হয়, যা আমাদের হিসাবে সাড়ে ১৩ লাখ টন। আগে অনেক বছর এতটুকু মজুতও থাকতো না। বর্তমানে মজুত সাড়ে ২২ লাখ টন।—ড. জাহাঙ্গীর আলম খান

গবেষক ও অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান জাগো নিউজকে বলেন, সবসময় একটা দেশের সরকারকে আপদকালীন মজুত হিসেবে ১৫ দিনের খাবার রাখতে হয়, যা আমাদের হিসাবে সাড়ে ১৩ লাখ টন। আগে অনেক বছর এতটুকু মজুতও থাকতো না। বর্তমানে মজুত সাড়ে ২২ লাখ টন, যা খুব প্রশংসনীয়।

‘এ অবস্থায় সরকারের বিতরণ কার্যক্রম গতি পাবে। আমদানির প্রয়োজন হবে না এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিয়েও কোনো দুশ্চিন্তা থাকছে না।’

আরও পড়ুন

একদিকে ধান সংগ্রহের অভিযান, অন্যদিকে পানিতে ভাসছে কৃষকের স্বপ্ন

সবসময় একটা দেশের সরকারকে আপদকালীন মজুত হিসেবে ১৫ দিনের খাবার রাখতে হয়, যা আমাদের হিসেবে সাড়ে ১৩ লাখ টন। আগে অনেক বছর এতটুকু মজুদও থাকতো না। বর্তমানে মজুত সাড়ে ২২ লাখ টন, যা খুব প্রশংসনীয়।—ড. জাহাঙ্গীর আলম খান

তিনি বলেন, ‘দেশে বোরো উৎপাদন ভালো হয়েছে। কৃষকের ঘরে ঘরে খাবার আছে। যে কারণে বাজারে কোনো সংকট বা হাহাকার নেই। এ অবস্থা থাকলে আগামী আমন মৌসুম পর্যন্ত বাজার স্থিতিশীল থাকবে।’

jagonews24এবছর বৃষ্টি ও ঢলের বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে/ছবি: জাগো নিউজ

দেশে সদ্য সমাপ্ত অর্থবছরে (২০২৫-২৬) খাদ্যশস্যের উৎপাদনের তথ্য এখনো সুনির্দিষ্ট হয়নি। তবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছিল ৪ কোটি ৬০ লাখ টন। একই সময়ে গম উৎপাদন হয় ১০ লাখ ৪১ হাজার টন।

দেশে চালের চাহিদা ৪ কোটি ১১ লাখ টন এবং গমের চাহিদা ৭৪ লাখ টন। এ হিসাবে দেশে চাল উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও গমের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে।—এফএও

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও-র ‘ফুড আউটলুক, নভেম্বর ২০২৫’ অনুযায়ী, দেশে চালের চাহিদা ৪ কোটি ১১ লাখ টন এবং গমের চাহিদা ৭৪ লাখ টন। এ হিসাবে দেশে চাল উৎপাদন চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও গমের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে।

আরও পড়ুন

পানির নিচে অর্ধলক্ষ হেক্টর জমির ধান, উৎপাদন নিয়ে শঙ্কা

যে কারণে খাদ্যশস্যের দাম স্থিতিশীল রাখা এবং সরবরাহব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সরকারি এবং বেসরকারি খাত থেকে চাল ও গম আমদানির সুযোগ রয়েছে।

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকারি পর্যায়ে ৭ লাখ টন চাল ও ৮ লাখ টন গম আমদানির সংস্থান রাখা হয়েছিল। এর মধ্যে ২১ জুন পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে ৫ লাখ ৩৪ হাজার টন চাল এবং ৭ লাখ ৩৮ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে ৭ লাখ ৩৫ হাজার টন চাল এবং ৬৫ লাখ ৮২ হাজার টন গম আমদানি হয়েছে।

এনএইচ/এমকেআর/ এমএফএ