কয়েক মাসের স্থবিরতা ও ঋণাত্মক প্রবণতার পর জাতীয় সঞ্চয়পত্রের বিক্রি ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে। গত এপ্রিলে নিট বিক্রি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৬০ কোটি ৫৭ লাখ টাকা, যা সদ্য বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সঞ্চয়পত্রের ক্ষেত্রে নিট বিক্রি বলতে বোঝায়, নতুন বিক্রির অর্থ থেকে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ ও আসল পরিশোধের পর সরকারের হাতে যে অর্থ উদ্বৃত্ত থাকে। এই অর্থ সরকার উন্নয়নসহ বিভিন্ন ব্যয়ে ব্যবহার করে। অন্যদিকে সঞ্চয়পত্রধারীদের নিয়মিত মুনাফাও পরিশোধ করা হয়।

অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, ব্যাংকে আমানতের সুদহার কিছুটা বাড়লেও ব্যাংক খাতের প্রতি মানুষের আস্থা এখনো পুরোপুরি ফেরেনি। এর সঙ্গে শেয়ারবাজারের দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। সব মিলিয়ে ঋণাত্মক ধারায় চলে গিয়েছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাত এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল হয়ে ওঠেনি। ফলে আমানতকারীদের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আস্থার ঘাটতি রয়ে গেছে। এমন বাস্তবতায় মূল্যস্ফীতির চাপ সামলে যার যতটুকু সঞ্চয় থাকছে, তা নিরাপদ রাখতে অনেকে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করছেন। তাঁর ভাষায়, সঞ্চয়পত্রে মূলধন হারানোর ঝুঁকি নেই, প্রয়োজন হলে সহজে নগদায়ন করা যায়, আবার মুনাফার হারও তুলনামূলক ভালো। সব মিলিয়ে মানুষের আগ্রহ আবার বাড়তে শুরু করেছে।

জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা তিন মাস সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ঋণাত্মক ছিল। জানুয়ারিতে নিট বিক্রি ছিল ঋণাত্মক ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা, ফেব্রুয়ারিতে ঋণাত্মক ১ হাজার ১৬৫ কোটি টাকা এবং মার্চে ঋণাত্মক ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা। এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে নিট বিক্রি কিছুটা ইতিবাচক হয়ে দাঁড়িয়েছিল ৩৮৫ কোটি টাকা। তবে এর আগের মাস নভেম্বরে তা ছিল ঋণাত্মক ২৯৩ কোটি টাকা। তবে বিদায়ী অর্থবছরের প্রথম চার মাস—জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবরে নিট বিক্রি ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক ছিল।

প্রতিবছরই বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেয়। অভ্যন্তরীণ ঋণের অন্যতম উৎস ব্যাংক ব্যবস্থা ও সঞ্চয়পত্র। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও পরে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৫০০ কোটি টাকায় নামিয়ে আনা হয়। তবে জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ সময়ে সরকার নতুন করে যত ঋণ নিয়েছে, তার চেয়ে ৪২৯ কোটি টাকা বেশি পরিশোধ করতে হয়েছে। এ কারণেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে ৮ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

এদিকে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আশঙ্কা ছিল, সরকার হয়তো সঞ্চয়পত্রের সুদহার কমিয়ে দিতে পারে। তবে আগামী ছয় মাসের জন্য বিদ্যমান সুদহার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থমন্ত্রীর ভাষ্য, বহু মধ্যবিত্ত পরিবার সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর নির্ভর করে সংসার চালায়। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় আপাতত সুদের হার অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে নতুন অর্থবছরের বাজেটে সঞ্চয়পত্রে কর রেয়াতের সুবিধা সীমিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সঞ্চয়পত্রের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখা হয়। নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, এই কর আর চূড়ান্ত কর দায় হিসেবে গণ্য হবে না। বছর শেষে আয়কর রিটার্নের মাধ্যমে তা সমন্বয় করা হবে। কারও প্রাপ্য করের তুলনায় বেশি অর্থ কেটে রাখা হলে তিনি তা ফেরত পাবেন।

তবে নতুন ব্যবস্থায় বেশি ভোগান্তিতে পড়তে পারেন ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা। বর্তমানে ১০ লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন বাধ্যতামূলক হলেও অনেক ছোট বিনিয়োগকারীর করযোগ্য আয় না থাকায় তাঁদের টিআইএন নেই। নতুন নিয়ম কার্যকর হলে কেটে নেওয়া উৎসে কর ফেরত পেতে তাঁদের টিআইএন নিতে হবে, পাশাপাশি আয়কর রিটার্নও জমা দিতে হবে।

অন্যদিকে নিয়মিত করদাতারা রিটার্নে ব্যাংক হিসাব উল্লেখ করে অতিরিক্ত কাটা কর ফেরতের আবেদন করতে পারবেন। যাচাই-বাছাই শেষে ১২০ দিনের মধ্যে তাঁদের হিসাবে অর্থ ফেরত দেওয়ার কথা রয়েছে। ফলে এ শ্রেণির করদাতারা আগের তুলনায় কিছুটা সুবিধা পাবেন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সঞ্চয়পত্র শুধু নিরাপদ বিনিয়োগের মাধ্যমই নয়; অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি, চাকরিজীবী, শিক্ষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও গৃহিণীদের নিয়মিত আয়ের অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস। ফলে কর রেয়াতের সুযোগ কমে গেলে একদিকে সঞ্চয়ের প্রবণতা কমতে পারে, অন্যদিকে মধ্যবিত্তের আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। তাঁদের মতে, রাজস্ব বাড়ানো জরুরি হলেও কর ফাঁকি বেশি হয়—এমন খাতগুলোর দিকে বেশি নজর দেওয়া উচিত। এতে রাজস্ব যেমন বাড়বে, তেমনি সঞ্চয়প্রবণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপও পড়বে না।

কর রেয়াত কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে মুস্তফা কে মুজেরী বলেন, এটি সরকারের রাজস্বনীতির অংশ হলেও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্ত ও স্থায়ী আয়ের মানুষের ওপর। তাঁর মতে, রাজস্ব বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে, তবে সেই লক্ষ্য অর্জনে নিয়মিত করদাতা এবং সঞ্চয়প্রবণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি না করে কর প্রশাসনের দক্ষতা বাড়ানো, কর ফাঁকি রোধ এবং করের আওতা সম্প্রসারণে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।