বরিশাল জেলার আগৈলঝাড়া উপজেলার প্রত্যন্ত গৈলা গ্রামে ২০০৫ সালে জন্ম নেওয়া ‘ইরান সরদার’ এখন একজন দেশের আলোচিত তরুণ উদ্ভাবক। বর্তমানে তিনি লেখাপড়া করছেন ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ‘কম্পিউটিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেম’ ডিপার্টমেন্টে। তিনি এখন পর্যন্ত চারটা জনপ্রিয় রোবটা বা ডিভাইস বানিয়ে সাড়া জাগিয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি রোবটিক্স ও বিজ্ঞান সম্পর্কে অনলাইন মাধ্যম ব্যবহার করে গভীরভাবে জানার চেষ্টা করেন। এ গভীরতা থেকেই অন্তরে জন্ম নেয় রোবটিক্সের প্রতি ভালোলাগা, আর ভালোলাগা থেকেই পরবর্তীতে বিভিন্ন আয়োজিত বিজ্ঞানমেলা, বিজ্ঞান কুইজে অংশ নেন। অংশগ্রহণ করেন বিভিন্ন ধরনের রোবট তৈরির প্রজেক্টে। এ যাত্রাই তাকে আরও বহুদূর নিয়ে যায়। এরপর শুরু হয় করোনাকাল। করোনার বিপর্যয়কর পরিস্থিতিতেও নিজের কাজ অব্যাহত রাখে ইরান। পুরো দেশ লকডাউনে ঘরবন্দি হয়ে পড়ে মানুষ, এ ঘরবন্দিতেই ইরান সরদার প্রথম আবিষ্কার করেন, ‘করোনা সেবক’ নামক রোবট।

এরপরই সবাইকে অবাক করে তৈরি করেন হিউম্যান রোবট ‘রিবা’, যা বেশ সাড়া ফেলে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় সম্পূর্ণ রোবট ‘রিবা’, মানুষের মতো চোখের পলক ফেলা, মানুষের মতো কথা বলার ও অঙ্গভঙ্গি করার সক্ষমতা রাখে। এমনকি এটি মানুষের মতো বাংলা ও ইংরেজিসহ বিভিন্ন ভাষায় কথা বলা এবং যে কোনো প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারে। মোটকথা, রোবট ‘রিবা’ একজন চিকিৎসক, শিক্ষক ও অভিভাবকের মতো নির্দেশক হিসাবে কাজ করার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত সহকারীর মতো বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পারে। এটি শিশুদের বিনোদন দিতেও কার্পণ্য করে না। রোবট ‘রিবা’ সূর্যের আলো থেকে সোলার এর মাধ্যমে ব্যাটারি চার্জ করে নিতে পারে। দেশে অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রায়ই বেশ ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে, মানুষ আহত হচ্ছে, মারাও যাচ্ছে। এ দুর্ঘটনার প্রবণতা কমাতে নিজ প্রচেষ্টায় তৈরি করলেন ‘অগ্নি’ নামক ডিভাইস। যা আগুন লাগার সেকেন্ডের মধ্যেই আশপাশের মানুষকে স্থানীয় ভাষায় সতর্ক করবে। নিকটবর্তী ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে কল করতে এবং লোকেশন শেয়ার করতে পারবে। এতে আগুন বিস্তৃত হওয়ার আগেই দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে এবং বড় দুর্ঘটনার প্রবণতাও কমে যাবে।

সাম্প্রতিক ফার্মগেটে মেট্রোরেল বিয়ারিং প্যাড খুলে এক পথচারী মারা যায়। এ দুর্ঘটনার অল্পদিনের মধ্যেই একটা সমাধান আনার চেষ্টা করেন ইরান। উদ্ভাবন করেন ‘মেট্রোরেল বিয়ারিং প্যাড সেফটি মনিটরিং সিস্টেম’ নামক ডিভাইস। তার মতে, ‘মেট্রোরেল বিয়ারিং প্যাডটা খুলে যাওয়ার মূল কারণ-মেট্রোরেল চলাচলের সময় অতিমাত্রায় কম্পন সৃষ্টি হয়। উচ্চমাত্রায় কম্পনের ফলে ব্যবহৃত বিয়ারিং প্যাডটি তার স্বাভাবিক অবস্থা ধরে রাখতে না পেরে ছিটকে পড়ে যায়।’ এ ডিভাইসটি সেন্সর দ্বারা মনিটরিং করছে। তাই বিয়ারিং প্যাড স্বাভাবিক অবস্থা থেকে সামান্য সরে গেলেও, ডিভাইসটি মেট্রোরেল কন্ট্রোল রুমে পিলার নাম্বারসহ আগাম সিগন্যাল পাঠাবে। যা কোনো দুর্ঘটনা হওয়ার আগেই মেরামত করা সম্ভব হবে। এটি নিয়ে মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও তারা কাজ করছেন ড্যাফোডিলের টিম হয়ে, যার কাজ ও গবেষণা এখনো চলমান। আর এ প্রজেক্টটি সরকারিভাবে পরিচালনা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তিনি। নিজেদের প্রজেক্ট দেশের ব্যস্ততম শহর ঢাকার সমস্যার সমাধান করতে যাচ্ছে, এটা তার নিজের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয় বলে জানান ইরান।

ইরান সরদার রোবটিক্স ও আইওটি গবেষণার বিস্তৃতির লক্ষ্যে সরকারকে সহযোগিতার আহ্বান করেন। তিনি বলেন, ‘দেশে যারা মেধাবী, যারা দেশের জন্যে কিছু করতে চায় বা যারা তরুণ উদ্ভাবক আছে তাদের যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচর্যা করা হয় এবং যথার্থ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে বিশ্ব দরবারে আমাদের দেশও প্রযুক্তি ও রোবটিক্স খাতে এগিয়ে থাকবে।’

লেখক : শিক্ষার্থী, ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ