দেশের চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ি মানুষের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান ও জনপ্রিয় বাহন। প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ঘোড়ার গাড়িতে করে যাতায়াত করেন। শুধু যাত্রী পরিবহনই নয়, পণ্য আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও ঘোড়ার গাড়ির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে চরাঞ্চলেই নয়, আধুনিক যুগেও রাজধানী ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে যাত্রী পরিবহনের অন্যতম বাহন হিসেবে ঘোড়ার গাড়ি টিকে আছে। সদরঘাট এলাকায় কলেজিয়েট স্কুলের সামনে থেকে গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজার পর্যন্ত সড়কে এখনো চলছে ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি।
ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে যখন চারপাশে মানুষের কোলাহল ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে, তখনই শোনা যায় ঘোড়ার খুরের ছন্দময় টকাটক শব্দ। সেই শব্দ যেন অতীতের কোনো স্মৃতিকে জীবন্ত করে তোলে। একসময় ঢাকার রাস্তায় বহুল ব্যবহৃত এই বাহনটি ‘ঠিকা গাড়ি’ নামে পরিচিত ছিল। সময়ের পরিবর্তনে নাম বদলে এখন এটি স্থানীয়দের কাছে ‘টমটম’ নামে বেশি পরিচিত।
একসময়ে শুধু রাজা-বাদশাহ, অভিজাত শ্রেণির মানুষ ঘোড়ার গাড়ি ব্যবহার করলেও পরে সাধারণ মানুষও এর ব্যবহার শুরু করে। সেই সময়ে নগর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ঘোড়ার গাড়ি। মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত, বাজার-সদাই কিংবা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় কাজে এটি ছিল নির্ভরযোগ্য বাহন। কিন্তু আধুনিক যানবাহনের বিস্তার এবং নগরায়ণের প্রভাবে ধীরে ধীরে কমে এসেছে এ বাহনের ব্যবহার। একইসঙ্গে কমেছে যাত্রীসংখ্যাও। আজকের ব্যস্ত নগরজীবনে টমটমের উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক কম হলেও এর টকাটক শব্দ এখনো বহন করে ঢাকার ঐতিহ্য, ইতিহাস ও হারিয়ে যেতে বসা এক সময়ের গল্প।
ঢাকার লোকাল বাসে ব্যতিক্রমী এক ড্রাইভার-হেলপার জুটি
পুরান ঢাকার স্থানীয় বাসিন্দা এবং কোচয়ানদের সঙ্গে কথা জানা গেছে, প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এই ঘোড়ার গাড়ি। প্রতিটি গাড়ি দিনে সর্বোচ্চ ছয়বার সদরঘাট-গুলিস্তান রুটে যাতায়াত করে। প্রতিটা গাড়িতে সর্বোচ্চ ১৫ জন যাত্রী বসতে পারেন। জনপ্রতি ৩০ টাকা করে ভাড়া নেওয়া হয়। তবে বিশেষ দিনগুলোতে এই ভাড়া কিছু বাড়িয়ে নেওয়া হয়। প্রতিটি টমটমে একজন করে কোচয়ান ও হেলপার থাকে। কোচয়ানরা ঘোড়াকে নিয়ন্ত্রণ করেন। হেল্পাররা মালামালসহ যাত্রীদের গাড়িতে উঠতে সহায়তা করেন।
অন্যদিকে, আগের মতো ঘোড়ার গাড়িতে যাত্রীদের ভিড় আর দেখা যায় না। বর্তমানে অধিকাংশ মানুষ শখ, ঐতিহ্যের স্বাদ কিংবা আভিজাত্য উপভোগ করার জন্য এই বাহনে চড়েন। ঢাকার সদরঘাট এলাকায় ঘুরতে গেলে অনেকেই আগ্রহ নিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে ওঠেন। এ কারণে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বিভিন্ন বয়সী মানুষ সদরঘাটে ছুটে আসেন এই বিশেষ অভিজ্ঞতা নিতে।
দেশি পর্যটকদের পাশাপাশি বিদেশি দর্শনার্থীরাও ঢাকায় ভ্রমণে এসে ঘোড়ার গাড়িতে চড়ে নগরীর ঐতিহ্যের স্বাদ উপভোগ করেন। দৈনন্দিন যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে এর ব্যবহার কমে গেলেও বিয়ে, শোভাযাত্রা ও বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে এখনো টমটম ভাড়া নেওয়ার চাহিদা আছে।
একসময় রাস্তায় ৫০টির মতো ঘোড়ার গাড়ি চলাচল করতো। কিন্তু রিকশা ও মোটরযানের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় বর্তমানে এর সংখ্যা অনেক কমে গেছে। পাশাপাশি নগরীর তীব্র যানজটের কারণে ঘোড়ার গাড়ির দৈনিক ট্রিপের সংখ্যাও কমে এসেছে। তবে সাপ্তাহিক ছুটি বা বিশেষ দিনগুলোতে সড়কে যানবাহনের চাপ কম থাকায় তখন দিনে ৮ থেকে ৯ বার যাতায়াত করা সম্ভব হয়।
আরও পড়ুন
বাজারের ভিন্ন এক ব্যস্ততা, মাছ কেটেই চলে তাদের জীবিকা
আধুনিকতার দ্রুতগতির এই নগরজীবনে নানা প্রতিকূলতা ও সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করেও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী ঘোড়ার গাড়ি আজও টিকে আছে আপন মহিমায়। এই বাহন এখন শুধু যাতায়াতের মাধ্যম নয়; এটি ঢাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রতীক।
কেএসকে








