লক্ষ্মীপুরে এবার বোরো ধানের ভালো ফলন হলেও কৃষকের মধ্যে স্বস্তি নেই। ধানের দাম কম হওয়ায় তাদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে। সময়মতো ফসল বিক্রি করতে না পাড়ায় আর্থিক সংকটে ভুগছেন তারা। ফলে আমন মৌসুমেও চাষাবাদ অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে।

এদিকে সরকার বাড়তি দামে ধান সংগ্রহ করলেও তা নিয়ন্ত্রণে খাদ্যগুদামে রয়েছে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। ইচ্ছে করলেই কৃষক খাদ্যগুদামে ধান সরবরাহ করতে পারেন না। পদে পদে হয়রানি হতে হয়।

তাই কৃষকের কষ্ট লাঘবে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা বৃদ্ধি, প্রান্তিক কৃষকদের কৃষিকার্ডের তালিকাভুক্তিকরণ, উৎপাদিত ধান বিক্রি ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে হাট-বাজারে ধানের মণ বিক্রি হচ্ছে ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা। অথচ এ ধান সরকার এ বছর খাদ্যগুদামে কিনছে ১ হাজার ৪৪০ টাকা দরে। প্রতি মণ ধান উৎপাদনে ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা খরচ হয়েছে। এ অবস্থায় খাদ্যগুদামে ধান দিয়ে সিন্ডিকেট পকেট ভারি করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বোরো মৌসুমে লক্ষ্মীপুরের পাঁচটি উপজেলায় ৩৮ হাজার ৭৬৫ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়। এতে দুই লাখ ৪২ হাজার ১৫৮ টন ধান উৎপাদন হয়েছে। সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার ৯৫৯ টন।

jagonews24

জেলা কৃষি বিভাগ সূত্র জানায়, জেলায় দুই লাখ ৯০ হাজার কৃষক রয়েছে। এরমধ্যে সদর উপজেলায় রয়েছে এক লাখ কৃষক। আর ধান বিক্রির উদ্দেশ্যে এ উপজেলা থেকে খাদ্যগুদামে প্রায় এক হাজার ৮০০ কৃষকের তালিকা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সদরে ধান কেনার লক্ষ্যমাত্রা মাত্র এক হাজার ৫৩০ টন। এতে ৫১০ জন কৃষক ধান দিলেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়ে যায়।

যদিও ৯ জুলাই বিকেল পর্যন্ত সদরে এক হাজার ৫০০ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সদর উপজেলা খাদ্যগুদাম পরিদর্শক (ওসিএলএসডি) শাহীন মিয়া। সিন্ডিকেটের কথা অস্বীকার করে তিনি বলেন, কৃষি বিভাগের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী একজন কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ তিন টন ধান সংগ্রহ করা যায়। তবে বাজারে দাম কম হওয়ায় এবার ধান দিতে এখানে রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন ব্যক্তি তদবির করছেন।

আরও পড়ুন

ধানের বাম্পার ফলনেও হাওরজুড়ে হতাশা, খরচের টাকা উঠছে না কৃষকের

জেলা সদরের ভবানীগঞ্জ, রায়পুরের চরবংশী ও কমলনগরের ফলকন গ্রামে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কৃষকের ঘরে ধান মজুত রয়েছে। তারা ধানের বস্তা স্তূপ করে রেখেছেন। স্থান সংকুলান না হওয়ায় অনেকে উঠানে ধান স্তূপ করেছেন। তবে বৃষ্টিতে ভিজে তা স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। আবার রোদে শুকাতে হবে। কিছু ধানে পচন ধরেছে। এদিকে স্তূপ করা বস্তা কেটে নিয়ে যাচ্ছে ইঁদুর।

চরকাচিয়া গ্রামের কৃষক নিজাম মোল্লা বলেন, দাম কম, ধান বিক্রি করতে পারছি না। বর্তমান দামে ধান বিক্রি করলে লোকসান হবে। সমিতির ঋণ, সার-কীটনাশক, মুদি দোকানের বাকি টাকা দিতে না পাড়ায় বিপদে আছি। কপালে কী আছে আল্লাহই ভালো জানে।

মধ্য টুমচরের কৃষক আবদুল লতিফ বলেন, সরকার ধানের ভালো দাম দিয়েছে। কিন্তু কৃষকের কোনো লাভই হচ্ছে না। খাদ্যগুদামে বছরের পর বছর সিন্ডিকেট আছে। তাদের দাপটের কারণে সাধারণ কৃষকরা সেখানে ঢুকতেই পারে না। কৃষক তালিকা, কৃষিকার্ড, ব্যাংক হিসাব, গুদামের কাজ সব একই চক্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রণ হয়। নিজেদের নামে-বেনামে ধান দিয়ে তারা পকেট ভারি করছে। আর কৃষকরা ধার-দেনা করে, অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে।

সদর উপজেলা ধান ক্রয় কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ক্যাথোয়াইপ্রু মারমা বলেন, ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহের সময় রয়েছে। নির্দিষ্ট কৃষকের তালিকা এবং কার্ডভুক্তদের কাছ থেকেই ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। ধান সংগ্রহে কৃষি কার্ড ও লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর জন্য চেষ্টা করা হবে।

লক্ষ্মীপুর জেলা প্রশাসক (ডিসি) এস এম মেহেদী হাসান বলেন, নিয়ম অনুযায়ী কৃষকরা যেন ধান সরবরাহ করতে পারে সেটি নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কোনো অনিয়ম হলে খতিয়ে দেখা হবে।

কাজল কায়েস/এসজেডএইচ