ভারতে পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী জুলাই গণহত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনার নিজে নিজে দেশে আসার কোনো সুযোগ নেই। তাকে আইনগত প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই দেশে ফেরানো হবে। শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে যে বক্তব্য দিয়েছেন সে বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম শুক্রবার রাতে যুগান্তরকে এসব কথা বলেন।

অন্যদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক যুগান্তরকে বলেছেন, শেখ হাসিনার দেশে ফিরে এসে আত্মসমর্পণের ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার কী করবে না করবে, তা অনুমান করা কঠিন। দেশে ফিরে তার আত্মসমর্পণ করতে আইনগত কোনো বাধা নেই। যেহেতু তিনি (শেখ হাসিনা) দোষী সাব্যস্ত হওয়া আসামি। তাকে তো জেলে পাঠানো হবে। জেলে থেকে রায়ের বিরুদ্ধে তিনি নরমাল প্রসিডিউর অনুযায়ী আপিল করবেন। আপিলের সময় পেরিয়ে গেছে। ওনি বিলম্বের যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে বিলম্ব আপিল করতে পারেন বা কী কারণে সময়মতো আপিল করতে পারেননি তার জন্য আলাদা দরখাস্ত দিতে পারেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর এডভোকেট আমিনুল ইসলাম আরও বলেন, জুলাই গণহত্যা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা প্যান্ডিং আছে। বন্দিবিনিময় চুক্তির আওতায় তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রসেস ইস্যু করা আছে। তাকে দেশে ফিরিয়ে আনতে এরই মধ্যে বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারকে চিঠি দিয়েছে। এমতাবস্থায় ওনি (শেখ হাসিনা) স্ট্যান্ডবাজি করলেন যে ওনি ডিসেম্বরে আসবেন। ডিসেম্বরে কী করে আসবেন। তাকে আসলে পুলিশ হেফাজতে আসতে হবে। তিনি যদি অবৈধ পথে আসেনও আসার সঙ্গে সঙ্গে গ্রেফতার হবেন এবং সাজা পরোয়ানা নিয়ে জেলে যাবেন।

চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমরা যদি আইনগত প্রক্রিয়ায় তাকে আনতে পারি সেটা একটা বিষয়। আর তিনি যদি নিজে নিজে নিজে আসতে চান ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় নাও তো পেতে পারেন। সাজা পরোয়ানামূলে এর আগেও তো সরকার তাকে নিয়ে আসতে পারে। ওনি দণ্ডপ্রাপ্ত। আসার সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেফতার হবেন। জেলে যাবেন। তার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড পরোয়ানা আছে। আদালতের প্রসেস অনুযায়ী সেভাবে তার বিষয়ে পরবর্তী আদেশ কার্যকর হবে।

দ্বিতীয়ত হলো-তিনি আপিল করবেন কী করবেন না সেটা তার ব্যাপার। তবে তার আপিলের সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। তারপরও যদি তিনি আপিল ফাইল করেন সেটা আদালতের ব্যাপার। তবে আপাতত, তার এ ধরনের ঘোষণার সঙ্গে সরকার বা ট্রাইব্যুনালের কোনো সম্পর্ক নেই। ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিয়েছেন। তার বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা ইস্যু করেছেন। সেই সাজা পরোয়ানা কার্যকর করার জন্য ইতোমধ্যে রেড নোটিশ জারি করা হয়েছে। ইন্টারপোলের মাধ্যমে এরই মধ্যে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভারত সরকারের সঙ্গে আমাদের বন্দিবিনিময় চুক্তি আছে। সে চুক্তি অনুযায়ী সরকার আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে সরকার কাজ করছে। এখন তার ডিসেম্বরে আসা না আসার প্রশ্ন নেই। এর আগেও তো সাজা পরোয়ানা বলে তাকে ফিরিয়ে আনা হতে পারে।

বিজয়ের মাস ডিসেম্বর মাসের কথা বলে তিনি স্ট্যানবাজি করছেন। তিনি আসলে এখন আসেন না কেন। তিনি তো তার দলের লোকজনকে অসহায় অবস্থায় রেখে ভারতে আরাম আয়েশে দিন কাটাচ্ছেন। মাঝে মধ্যে চমকপদ কথা বলছেন। তার নিজে নিজে আসার কোনো সুযোগ নেই।

প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানকে মৃত্যুদণ্ড দেন ট্রাইব্যুনাল। পাশাপাশি তাদের সম্পত্তি রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্তের আদেশও দেওয়া হয়। সাজাপ্রাপ্ত এই দুই আসামি পলাতক। এ মামলার অপর আসামি পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনকে (অ্যাপ্রুভার বা রাজসাক্ষী) পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। রায় ঘোষণার ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করলে শেখ হাসিনার আপিলের সুযোগ থাকবে না বলে জানায় প্রসিকিউশন। তাদের মতে, যদি তারা (দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনা ও আসাদুজ্জামান খান) ৩০ দিনের মধ্যে আপিল না করেন, তাহলে তারা গ্রেফতার হলে রায় কার্যকর হবে।

আপিলের সুযোগ আছে কিনা : ট্রাইব্যুনাল আইনের ২১ নম্বর ধারায় দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের আপিলের অধিকার দেওয়া হয়েছে। এই ধারার ৩ উপধারায় বলা হয়েছে, দণ্ড ও সাজা প্রদান অথবা খালাস অথবা কোনো সাজা দেওয়ার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হবে। এই সময়সীমা (রায় দেওয়ার ৩০ দিন পর) অতিক্রান্ত হওয়ার পর কোনো আপিল গ্রহণযোগ্য হবে না। আর ২১ নম্বর ধারার ৪ উপধারায় বলা হয়েছে, আপিল করার তারিখ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তি করতে হবে।