‘সবাই পারলে আমি কেন পারব না?’—মনের ভেতর পুষে রাখা এই জেদই আজ সব অপমান আর প্রতিকূলতাকে হার মানিয়েছে। দৃষ্টির বাধা পেরিয়ে হাফেজ মো. মারুফ উল্যাহ এখন আলিম পরীক্ষার টেবিলে। কুড়িগ্রামের রাজারহাট ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে বসে মনের চোখ দিয়ে তিনি লিখে চলেছেন আগামীর স্বপ্ন। শ্রুতিলেখক হিসেবে তাকে সহযোগিতা করছেন ভাতিজি ছুম্মা আক্তার।মারুফের এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। পদে পদে ছিল বঞ্চনা আর লাঞ্ছনার ইতিহাস। রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বুজরুক নূরপুর গ্রামের সন্তান মারুফ। পরিবারে দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি ছোট। ২০১৯ সালে বাবা গোলজার হোসেন মারা যান। মা শাহজাদি বেগম দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছেলেকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতে শুরু থেকেই উৎসাহ দিয়েছেন।স্মৃতি হাতড়ে মারুফ বলেন, ‘চোখে দেখি না বলে বাড়ির পাশের স্কুল থেকে আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষকেরা মুখের ওপর বলেছিলেন একে দিয়ে পড়াশোনা হবে না, চোখে না দেখলে গ্রামার শিখে লাভ কী! সহপাঠীদের কাছেও অনেক ট্রলের শিকার হয়েছি। এক একটি দিন আমার কাছে এক একটি বছরের মতো মনে হতো।’প্রাথমিক শিক্ষা শেষে হিফজ সম্পন্ন করে তিনি ফের সাধারণ শিক্ষায় ফেরেন। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনার সময় আবারও শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের তিক্ত আচরণের শিকার হতে হয় তাকে। মারুফ জানান, এক শিক্ষকের কাছে প্রাইভেট না পড়ায় তাকে পরীক্ষায় কম নম্বরও দেওয়া হয়েছিল। তবে ভাগ্য বদলায় ২০২২ সালে ফরিদপুরের আবদুল্লাহ দাখিল মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর। সেখানকার শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতাকে তিনি ‘গোল্ডেন টাইম’ হিসেবে অভিহিত করেন। পরে কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার পর তাকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি।মারুফ বলেন, ‘আমার কাছে পরীক্ষা বড় কথা নয়, বড় হলো জ্ঞান অর্জন করা। সমাজ যেন আমাদের বোঝা না ভাবে। পড়াশোনা করলে মানুষ অন্তত আত্মনির্ভরশীল হয়ে সম্মানের সঙ্গে বাঁচতে পারে।’ ভবিষ্যতে সুযোগ পেলে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীদের উপযুক্ত শিক্ষার জন্য বিশেষ কিছু করার স্বপ্ন দেখেন এই লড়াকু তরুণ।কুড়িগ্রাম আলিয়া কামিল মাদ্রাসার শিক্ষক মাজিদুর রহমান বলেন, ‘মারুফ আমাদের গর্ব। তার জানার আগ্রহ অপরিসীম। ক্লাসে তার পারফরম্যান্স দারুণ। সে যেন আরও উচ্চশিক্ষা নিয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে, আমরা সেই প্রার্থনা করি।’রাজারহাট ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা জানান, মারুফ নিয়ম অনুযায়ী শ্রুতিলেখকের মাধ্যমে সুষ্ঠুভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছেন। তার এই হার না মানা মানসিকতা সবার জন্যই এক বড় অনুপ্রেরণা।/