দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দেশের একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে এ প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ও কার্যকারিতা অনস্বীকার্য। তবে প্রতিষ্ঠার পর গত দুই দশক ধরে দুদকের শীর্ষ নেতৃত্বের দিকে তাকালে একটি হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে, যা গতকাল যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। দুদক আইনে কমিশনের চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে নিয়োগের জন্য পাঁচটি পেশাগত শ্রেণির ব্যক্তিদের যোগ্য হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে।

বিগত বিশ বছরে দুদকের নেতৃত্ব মূলত বিচার বিভাগ, প্রশাসন ও শৃঙ্খলা বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তাদের মধ্যেই আবর্তিত হয়েছে। একচেটিয়া এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার ফলে আমলাতান্ত্রিক মনস্তত্ত্বের বাইরে গিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করার ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানটি বারবার প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও আজ পর্যন্ত আইন পেশা কিংবা শিক্ষা খাত থেকে একজন ব্যক্তিকেও দুদকের শীর্ষ নেতৃত্বে আনা হয়নি।

দুর্নীতি প্রতিরোধের বিষয়টি কেবল আইনি বা প্রশাসনিক নয়, এটি বহুমাত্রিক। বর্তমান সময়ে অর্থনীতিসংক্রান্ত অপরাধ ও আর্থিক অনিয়মগুলো অত্যন্ত জটিল ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর। অথচ দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট কিংবা সাংবাদিকদের মতো পেশাজীবীদের দুদকের নেতৃত্বে আসার কোনো আইনি সুযোগ রাখা হয়নি। ফলে কমিশন বহুমাত্রিক দুর্নীতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের অভাব অনুভব করছে।

একটি কার্যকর ও নিরপেক্ষ দুদক পেতে হলে এর নেতৃত্বে বৈচিত্র্য আনা প্রয়োজন। শুধু কয়েকটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে পদগুলো কুক্ষিগত করে রাখলে তা জনগণের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হবে। তাই দুদকের বিদ্যমান আইন সংশোধন করে সেখানে বিভিন্ন খাতের যোগ্য পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্তির পথ উন্মুক্ত করা দরকার। একইসঙ্গে বর্তমান আইনে যে পাঁচ শ্রেণির কথা বলা হয়েছে, সেখান থেকেও যেন সমতা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে দুদককে আমলাতান্ত্রিক বৃত্ত থেকে বের করে একটি সত্যিকারের স্বাধীন ও সর্বজনীন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে। আমরা আশা করব, সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহল এক্ষেত্রে বাধাগুলো দূর করে দুদকের শীর্ষ নেতৃত্বে যোগ্য, সৎ ও বিভিন্ন পেশার দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা ও গ্রহণযোগ্যতা বৃদ্ধি করবে।