মাত্র আট দিনের ব্যবধানে আবারও বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে খুলনা মহানগরীর বিভিন্ন সড়ক, অলিগলি ও নিম্নাঞ্চল। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তারও বেশি পানি জমে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, পথচারী এবং রিকশা-ইজিবাইকচালকরা। বারবার একই পরিস্থিতি তৈরি হওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। একই সঙ্গে জলাবদ্ধতা নিরসনে ৮২৩ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত ড্রেনেজ উন্নয়ন প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
খুলনা আবহাওয়া অফিস জানায়, বুধবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ৭৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। আগেও ১ জুলাই মাত্র ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিতে নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। অথচ কয়েক বছর ধরে খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ ও সংস্কারে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও সামান্য বৃষ্টিতেই নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। নগরীর ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কবীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা আলমগীর শেখ বলেন, এখন প্রায় প্রতিটি বৃষ্টিতেই তাদের বাড়ির নিচতলা পানিতে ডুবে যায়। আগে একদিনের মধ্যে পানি নেমে গেলেও এখন একবার পানি জমলে সাত থেকে আট দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। তার অভিযোগ, প্রায় এক বছর আগে এলাকার সড়ক ও পাশের ড্রেন প্রায় তিন ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হলেও বাড়িঘর থেকে ড্রেনে পানি যাওয়ার কোনো সংযোগ রাখা হয়নি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) খুলনা বিভাগীয় সমন্বয়কারী মাহফুজুর রহমান মুকুল বলেন, পরিকল্পনাহীনভাবে প্রাকৃতিক খাল সংকুচিত করে কংক্রিটের ড্রেনে রূপান্তরের ফল এখন নগরবাসী ভোগ করছে। গত ১৫ বছরে তালতলা খালসহ অন্তত ১৩টি খালের প্রস্থ ৬০ থেকে ১০০ ফুট থেকে কমিয়ে ১২ থেকে ১৩ ফুটের ড্রেনে পরিণত করা হয়েছে। এতে খালের পানি ধারণক্ষমতা ও প্রবাহ দুটোই মারাত্মকভাবে কমে গেছে। খুলনার নাগরিক নেতা অ্যাডভোকেট শামীমা সুলতানা শিলু বলেন, খাল সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি নদী-খাল ভরাট, জলাধার দখল এবং জোয়ারের সময় রূপসা নদীর পানি শহরে প্রবেশ করায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। নগরবাসীর প্রশ্ন, শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে খাল খনন ও ড্রেন নির্মাণের পরও যদি মাঝারি বৃষ্টিতেই খুলনা শহর বারবার পানিতে তলিয়ে যায়, তাহলে উন্নয়ন প্রকল্পের প্রকৃত সুফল কোথায়? তাদের দাবি, দায়সারা অবকাঠামো নির্মাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত নগর পরিকল্পনার মাধ্যমেই জলাবদ্ধতার স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। কেসিসির প্রধান কনজারভেন্সি কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, ঢাকনাযুক্ত ড্রেন পরিষ্কারের জন্য প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতি সিটি করপোরেশনের নেই। ফলে ভারী স্ল্যাব খুলে শ্রমিকদের হাতে পরিষ্কার করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও শ্রমসাধ্য। বর্তমানে টানা বৃষ্টির কারণে ড্রেন পরিষ্কারের কাজও ব্যাহত হচ্ছে।
খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, নগরীর পানি স্বাভাবিকভাবে রূপসা নদীতে নামতে পারছে না। অতীতে অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, অসমাপ্ত উন্নয়ন কাজ, পাম্প হাউজ অকার্যকর থাকা এবং স্লুইস গেটের অক্ষমতার কারণে জলাবদ্ধতা বেড়েছে। অনেক এলাকায় ড্রেনের তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় সড়কের তুলনায় বাড়িঘর নিচু হয়ে পড়েছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই পানি বাড়িতে ঢুকে পড়ছে। তিনি বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর তিন মাস ধরে জলাবদ্ধতা নিরসনে দিনরাত কাজ চলছে। পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা দূর করা, ড্রেন পরিষ্কার এবং অকার্যকর অবকাঠামো সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।







