জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) শহিদদের স্মরণে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণে এখনো দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও তা বাস্তবায়নে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তারা সামনের সারিতে ছিলেন। ১১ জুলাই আন্দোলনের সময় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই প্রথম হামলার শিকার হন। ওই ঘটনায় ২১-২৩ জন শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক আহত হন। পরবর্তীতে আন্দোলন দমনে পুলিশের গুলিতে শহিদ হন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের শিক্ষার্থী আবদুল কাইয়ুম।

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ও আত্মত্যাগের স্মৃতি সংরক্ষণে এখনো কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। তাদের মতে, একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ভূমিকা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং শহিদদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা নিবেদন করা সম্ভব হবে।

২০২৫ সালের ১১ জুলাই কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার প্রথম প্রতিরোধ দিবস ১১ জুলাই’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় এবং যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ১১ জুলাইকে ‘প্রথম প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেন। একই অনুষ্ঠানে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘জুলাই মিনার’-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সরকারি উদ্যোগে একটি ‘প্রতিরোধ মিনার’ নির্মাণের কথাও জানান।

তবে ঘোষণার এক বছর পার হলেও বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ওই স্থানে কোনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পরও প্রকল্পটি বাস্তবায়নের বিষয়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ চোখে না পড়ায় শহিদদের স্মৃতি সংরক্ষণের উদ্যোগটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে আছে।

এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা স্বৈরাচারের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত স্থাপনাগুলো অপসারণ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহিদদের স্মরণে একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনো স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি এ ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের শিক্ষার্থী নাঈম ভূঈঁয়া বলেন, “জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে আমরা গত বছর থেকে কাজ করছি।  বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এটা নিয়ে কোনো উদ্যোগ নেননি। আমরা  কয়েকটা ডিজাইনও  জমা দিই। এছাড়াও, যখন আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া আসে তখন ওনার মন্ত্রণালয় থেকে ওনি একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্মৃতিস্তম্ভ আরেকটা কোটবাড়ি বিশ্বরোডের স্মৃতিস্তম্ভ করার কথা বলেছেন। কিন্তু আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন কাজ না করার কারণে এটা বাস্তবায়ন হয় নাই।”

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী আরাফ ভূঁইয়া বলেন, “জুলাইয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান ছিলো অনস্বীকার্য। সারাদেশের মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পুলিশি আক্রমণ হয় এবং সেখান থেকেই প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় দেখিয়েছিলো ক্ষমতার থেকে জনতাই সবচেয়ে শক্তিশালী।  ক্ষমতাসীন ছাত্রসংগঠনের নিপীড়নের বিরোধিতা এবং ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়িত করা থেকে শুরু করে পরবর্তীতে তৎকালীন ফ্যাসিস্ট হাসিনার নামে তৈরী হওয়া হলের নাম পরিবর্তন, সবকিছুই ছিলো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে। আমরা চেয়েছিলাম সে স্মৃতিচিহ্ন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাখতে।”

ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষার্থী খান মাহমুদ নাইম বলেন, “জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও কুবিতে জুলাই শহিদদের স্মরণে একটি স্থায়ী স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। জুলাই বাংলাদেশের মানুষের বীরত্ব গাঁথা ইতিহাস। আর সেই ইতিহাস ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বিভিন্ন নিদর্শনের মাধ্যমে সংরক্ষণ করা জরুরি। আমরা আশাবাদী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দ্রুত সময়ের মধ্যে জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণের বিষয়ে দৃশ্যমান উদ্যোগ গ্রহণ করবে।”

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এম এম শরীফুল করীম বলেন, “জুলাই স্মৃতিস্তম্ভ নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যাপ্ত বাজেট পেলেই কাজ শুরু হয়ে যাবে।”