মোহাম্মদ আল মিরাজ। জুলাই যোদ্ধাদের সংগঠন ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’র সাধারণ সম্পাদক। ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগ সরকার হটানোর আন্দোলনের শুরুর দিনগুলোতে ছিলেন রাজপথে। এরপর পুলিশের রাবার বুলেটে তার দুই চোখ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে উত্তাল সেই দিনগুলো, আহত হওয়া ও পরবর্তী সময়ের সংগ্রামের কথা তুলে ধরেছেন এই জুলাই যোদ্ধা।

মিরাজ থাকেন রাজধানী ঢাকার খিলগাঁওয়ের তিলপাপাড়া এলাকার একটি মেসে। তার গ্রামের বাড়ি চুয়াডাঙ্গায়। গ্রামে তার বাবা, মা ও দাদি থাকেন। পরিবারের তিনি একমাত্র ছেলে সন্তান। তার একটি ছোট বোন রয়েছে, যে বর্তমানে ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে পড়াশোনা করছে।

২০২৪ সালের ১৯ জুলাই আন্দোলনে উত্তাল ছিল রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকা

জুলাই জীবনের গতিপথ বদলে দিয়েছে

আন্দোলনের স্মৃতি তুলে ধরে মিরাজ বলেন, ‘আইইউবিএটি (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস এগ্রিকালচার অ্যান্ড টেকনোলজি) থেকে বিবিএ শেষ করে আইইএলটিএসের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাবো। কিন্তু জুলাই আন্দোলন আমার জীবনের পুরো গতিপথ বদলে দিয়েছে।’

তার মতে, আসলে শুধু কোটা ইস্যু নয়, মানুষের ভেতরে অনেক দিনের জমে থাকা ক্ষোভ তখন বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারতো না, কিন্তু মানুষের মনে ক্ষোভ ছিল প্রবল। কোটা আন্দোলন সেই ক্ষোভ প্রকাশের একটি উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। পরে যখন ‘রাজাকারের সন্তান ও নাতিপুতি’ প্রসঙ্গ সামনে এলো, তখন আন্দোলন আর শুধু কোটার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এটি সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে পরিণত হয়।

মিরাজ বলেন, ‘১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ওয়াসিমকে গুলি করে হত্যার পর পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে যায়। সেই দৃশ্যগুলো আমাদের ভেতরে গভীর আলোড়ন তৈরি করেছিল। তখন আর নিজের জীবন নিয়ে ভাবিনি। মনে হয়েছিল, এত মানুষ যখন রক্ত দিচ্ছে, তখন ঘরে বসে থাকা যায় না।’

শুধু কোটা ইস্যু নয়, মানুষের ভেতরে অনেক দিনের জমে থাকা ক্ষোভ তখন বিস্ফোরণের অপেক্ষায় ছিল। রাষ্ট্রযন্ত্রের নিয়ন্ত্রণের কারণে কেউ প্রকাশ্যে কিছু বলতে পারতো না, কিন্তু মানুষের মনে ক্ষোভ ছিল প্রবল। কোটা আন্দোলন সেই ক্ষোভ প্রকাশের একটি উপলক্ষ হয়ে দাঁড়ায়।- মোহাম্মদ আল মিরাজ

এর আগে ৮ জুলাই থেকেই তিনি আন্দোলনে যুক্ত হন জানিয়ে বলেন, ‘প্রথম দিকে পান্থপথ এলাকায় যেতাম। তখন লোকসংখ্যা খুব বেশি ছিল না। কিন্তু যখন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলো, তখন সাধারণ মানুষও তাদের নিরাপত্তার জন্য রাস্তায় নেমে এল। সেখান থেকেই আন্দোলন গণজোয়ারে রূপ নেয়।’

পুলিশ কাভার্ড ভ্যানে উঠে গুলি চালায়

আহত হওয়া দিনের বিষয়ে মিরাজ জানান, তিনি আহত হন ১৯ জুলাই (শুক্রবার) ফকিরাপুল মোড়ে। তার আগের দুদিন যেভাবে মানুষকে গুলি করে হত্যা করা হচ্ছিল, তাতে তার মনে হচ্ছিল মানুষ হয়তো ভয়ে আর রাস্তায় নামবে না। তাই সেদিন নামাজের পর তিনি ফকিরাপুলে যান। পুলিশ বারবার টিয়ারশেল ও গুলি ছুড়ে তাদের ছত্রভঙ্গ করছিল। তবু তারা আবারও একত্র হয়ে সামনে এগোচ্ছিলেন।

আরও পড়ুন

ফিরে দেখা জুলাই / ত্যাগেই সীমাবদ্ধ জবি, প্রাপ্তির খাতা আজও শূন্য

ফিরে দেখা জুলাই / ‘নুরের নির্দেশ ছিল, গ্রেফতার হলেও আন্দোলন থামবে না’

তিনি বলেন, ‘আমি নিজের চোখে দেখেছি, এডিসি গোলাম রুহানী ঘটনাস্থল ছেড়ে চলে যান। এরপর পুলিশ কাভার্ড ভ্যানে উঠে আমাদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। ঠিক সেই মুহূর্তেই দুটি রাবার বুলেট এসে আমার দুই চোখে আঘাত করে। দুই চোখে রাবার বুলেটের আঘাতের সঙ্গে সঙ্গেই পৃথিবী অন্ধকার হয়ে যায়। আমি শুধু বলছিলাম, ‘ভাই, আমি কিছু দেখতে পাচ্ছি না। দুই চোখেই গুলি লাগছে’।”

মিরাজ জানান, ঘটনার পর যুবদল নেতা রবিউল ইসলাম নয়নসহ কয়েকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে ইসলামী ব্যাংক হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু জানানো হয়, এই চিকিৎসা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। পরে মিরাজকে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সারারাত প্রাথমিক চিকিৎসার পর পরদিন তার অস্ত্রোপচার করা হয়। কিন্তু তখন কোনো রাবার বুলেটই বের করা সম্ভব হয়নি।

সুচিকিৎসার দাবিতে মোহাম্মদ আল মিরাজসহ অন্য আহত রোগীদের রাস্তায় অবস্থান। ২০২৪ সালের ১৩ নভেম্বর/ফাইল ফটো

সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা ও বিশেষ চশমা ব্যবহার

নিজের চিকিৎসার বিষয়ে এ জুলাই যোদ্ধা বলেন, ‘এরপর দীর্ঘদিন দেশে চিকিৎসা নিয়েছি। চক্ষু হাসপাতাল ও সিএমএইচ (সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল) মিলিয়ে প্রায় ছয় মাস চিকিৎসাধীন ছিলাম। পরে উন্নত চিকিৎসার দাবিতে আমরা আন্দোলন করি। এরপর সরকারের উদ্যোগে গত বছরের ১১ জানুয়ারি আমাকে সিঙ্গাপুরে পাঠানো হয়।’

‘সিঙ্গাপুরে দুই মাস চিকিৎসা নিই। সেখানে চিকিৎসকরা আমার বাম চোখের ভেতরে ঢুকে থাকা রাবার বুলেটটি নাকের ভেতর দিয়ে বের করেন। চিকিৎসকরা জানান, বুলেটটি অপটিক নার্ভের একেবারে পাশে ছিল। সামান্য নড়াচড়া হলেই পুরো চোখ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যেতে পারতো। ডান চোখের বুলেটটি ঝুঁকির কারণে বের করা হয়নি। সেটি এখনো শরীরের ভেতরেই রয়েছে,’ যোগ করেন তিনি।

আরও পড়ুন

দুই বছরেও অধরা মূল অস্ত্রধারীরা, বিচারের আশায় শহীদের স্বজনরা

ফিরে দেখা জুলাই / ‌‘ছাত্রদের রক্ত দেখে শিক্ষক ঘরে থাকতে পারেন না’

দেশে ফেরার পর আবারও কিছু সময়ের জন্য সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন জানিয়ে মিরাজ বলেন, ‘পরে আবার হাসপাতালে ভর্তি হয়ে সাতটি ইনজেকশন নেওয়ার পর ডান চোখে সামান্য দৃষ্টি ফিরে আসে। এখন বাম চোখে কিছুই দেখি না। ডান চোখে পাঁচ হাত দূর পর্যন্ত মানুষের মুখ চিনতে পারি। এর বাইরে সবকিছু ঝাপসা।’

তিনি জানান, ছোট অক্ষর পড়ার জন্য সিঙ্গাপুর থেকে বিশেষ একটি চশমা বানাতে হয়েছে। এর দাম পড়েছে দুই লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এই চশমা ছাড়া ছোট লেখা পড়তে পারেন না। যদি এটি নষ্ট হয়ে যায়, আবার বিদেশ থেকে বানাতে হবে। না হলে তিনি বিপদে পড়ে যাবেন।

সরকারকে আমরা বলেছি, পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে সবাইকে একইভাবে দেখা যাবে না। কেউ চাকরি করতে পারবেন, কেউ ব্যবসা করতে পারবেন, আবার কেউ সম্পূর্ণ অন্ধ বা পঙ্গু। তাই সবার জন্য আলাদা পরিকল্পনা দরকার।- মোহাম্মদ আল মিরাজ

আহতদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা দাবি

মিরাজ ‘এ’ ক্যাটাগরির জুলাই যোদ্ধা জানিয়ে বলেন, ‘সরকারের এককালীন অনুদান ও মাসিক ভাতা পাচ্ছি। তবে আমার কষ্ট লাগে, কারণ দুই চোখ হারানো অনেক যোদ্ধাই জুলাই ফাউন্ডেশন থেকে ঘোষিত পুরো সহায়তা পাননি। যাদের চার লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল, তাদের কেউ কেউ মাত্র এক লাখ টাকা পেয়েছেন। এই বৈষম্য দূর হওয়া দরকার।’

তিনি জানান, বর্তমানে তিনি ‘আমরা জুলাই যোদ্ধা’ সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের সংগঠনের লক্ষ্য শুধু আহতদের ভাতা নিশ্চিত করা নয়, তাদের মর্যাদার সঙ্গে বাঁচার ব্যবস্থা করা।

আরও পড়ুন

জুলাই আন্দোলনে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের অবদান নিয়ে ব্যাপক গবেষণার আহ্বান

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে পিপিদের নির্দেশ

সরকারের কাছে গুরুতর আহতদের পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও দীর্ঘমেয়াদি সহায়তার দাবি জানিয়ে মিরাজ বলেন, ‘সরকারকে আমরা বলেছি, পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে সবাইকে একইভাবে দেখা যাবে না। কেউ চাকরি করতে পারবেন, কেউ ব্যবসা করতে পারবেন, আবার কেউ সম্পূর্ণ অন্ধ বা পঙ্গু। তাই সবার জন্য আলাদা পরিকল্পনা দরকার। টিসিবির ডিলারশিপ, বিভিন্ন সরকারি সুবিধা কিংবা উপযুক্ত কর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের স্বাবলম্বী করা সম্ভব।’

যারা দুই চোখ হারিয়েছেন বা স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন, তাদের মূল্যায়ন শহীদ পরিবারের মতোই হওয়া উচিত জানিয়ে আমরা জুলাই যোদ্ধার সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘কারণ তারাও জীবনের সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকার করেছেন। আমি নিজেও একজন আহত জুলাই যোদ্ধা। তাই তাদের কষ্ট আমি অনুভব করতে পারি। যতদিন পারি, আহত জুলাই যোদ্ধাদের অধিকার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য কাজ করে যেতে চাই। এটাই এখন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’

আরএমএম/একিউএফ/এমএফএ