দেশের প্রথম নদীতল টানেল হিসাবে কর্ণফুলী টানেল যখন চালু হয়েছিল, তখন এটিকে চট্টগ্রামের যোগাযোগব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচনের এক মাইলফলক হিসাবে প্রচার করা হয়েছিল। কিন্তু প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়িত এই মেগা প্রকল্প এখন এক বিশাল শ্বেতহস্তীতে পরিণত হয়েছে। সরকারের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) ২০২৬ সালের প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদনের সূত্র ধরে মঙ্গলবার যুগান্তরে প্রকাশিত খবরে টানেলটিকে ঘিরে যে ভয়াবহ অপচয়, অদূরদর্শিতা ও হরিলুটের চিত্র উঠে এসেছে, তা কেবল হতাশাজনকই নয়, উদ্বেগজনকও বটে। একটি মেগা প্রকল্প কীভাবে অপরিকল্পিত ব্যয়ের মরণফাঁদে পরিণত হতে পারে, কর্ণফুলী টানেল তার এক উদাহরণ। সমীক্ষায় টানেলটিতে যানবাহন চলাচল এবং এ থেকে আয়ের যে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, বাস্তবে সে লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ১৪ থেকে ২৩ শতাংশ পূরণ হচ্ছে। ফলে লাভ তো দূরে থাক, প্রতিদিন ১০ লাখ টাকা এবং বছরে ৩৬ কোটি টাকারও বেশি লোকসান গুনে এই প্রকল্প টিকিয়ে রাখতে হচ্ছে, যা জনগণের করের টাকার অপচয়। সাবেক পরিকল্পনা সচিবের মন্তব্য অনুযায়ী, এটি যে একটি সম্পূর্ণ অদূরদর্শী প্রকল্প এবং সময়ের অনেক আগেই রাজনৈতিক সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য নেওয়া হয়েছিল, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট।
তবে টানেলের অর্থনৈতিক কার্যকারিতার চেয়েও বেশি উদ্বেগজনক হলো, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের আড়ালে জেঁকে বসা সীমাহীন দুর্নীতি ও লুটপাট। আইএমইডির প্রতিবেদনে উঠে আসা ৪৪টি গুরুতর অডিট আপত্তিই প্রমাণ করে, এখানে আর্থিক শৃঙ্খলা বলতে কিছুই ছিল না। অর্থ লুটপাটের জন্য নথিপত্রে অস্তিত্ব না থাকা নানা কার্যক্রম, মেগা প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ও উপযোগিতার সঙ্গে সামঞ্জস্য না রেখে দুডজনের বেশি বিলাসবহুল বাংলো নির্মাণ, পরামর্শকের আপ্যায়ন, ভুয়া বিল-ভাউচার, প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও সরকারি গাড়ি ফেরত না দেওয়ার মতো অনিয়মগুলো প্রমাণ করে, পুরো প্রকল্পে জবাবদিহিতার কোনো বালাই ছিল না।
এ প্রেক্ষাপটে এখন দুটি সমান্তরাল উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করি আমরা। প্রথমত, আইএমইডি ও অডিট প্রতিবেদনে যেসব গুরুতর আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির খতিয়ান উঠে এসেছে, সেগুলোর ভিত্তিতে দায়ীদের চিহ্নিত করতে একটি উচ্চপর্যায়ের স্বাধীন বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করা। সেতু বিভাগ, পিডি কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের যে স্তরের কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই অভিযোগ প্রমাণিত হোক না কেন, তাদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া এবং আত্মসাতের অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে ফেরত আনার ব্যবস্থা করা। দ্বিতীয়ত, টানেলটিকে সচল ও লাভজনক করতে বর্তমান সেতু বিভাগের উদ্যোগকে আরও সমন্বিত ও বেগবান করা। পাশাপাশি টানেলের ওপারে পরিকল্পিত শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর করা এবং সংযোগ সড়কগুলোর দ্রুত আধুনিকায়ন করা, যাতে যানবাহনের চাপ বাড়ে। অব্যবহৃত বাংলোগুলোকেও অবিলম্বে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি খাতে বা পর্যটন শিল্পের জন্য ইজারা দেওয়া যেতে পারে, যাতে রাজস্ব আয়ের বিকল্প পথ তৈরি হয়। ভবিষ্যতে মেগা প্রকল্পের নামে এমন অদূরদর্শী পরিকল্পনা ও লুণ্ঠনের সংস্কৃতি বন্ধ হবে, এটাই প্রত্যাশা।








