প্রাকৃতিক দুর্যোগ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য যেন নিত্যসঙ্গী। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগে বারবার বিপর্যস্ত হয় বরিশালের উপকূল। অথচ দুর্যোগ মোকাবিলার অন্যতম ভরসা সাইক্লোন শেল্টার ও ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থাতেই রয়ে গেছে বড় ঘাটতি। অনেক আশ্রয়কেন্দ্র জরাজীর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী, আর নদীবেষ্টিত পাঁচ ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলার জন্য তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক মাত্র ৬০ জন। ফলে দুর্যোগের সময় নিরাপত্তা, উদ্ধার ও ত্রাণ সেবায় বাড়ছে অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠায় দিন কাটছে উপকূলের মানুষের।
এছাড়া দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা প্রচার এবং উদ্ধার কার্যক্রমে ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি (সিপিপি) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে দুর্যোগ ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং সিপিপির তথ্য অনুযায়ী, বরিশাল বিভাগে মোট ৩২ হাজার ৭০০ জন স্বেচ্ছাসেবক থাকলেও বরিশাল জেলায় রয়েছে চরম জনবল সংকট।
‘দুর্যোগকালীন ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। জরুরি ভাঙন প্রতিরোধের পাশাপাশি স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বড় প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।’

তথ্য অনুযায়ী, ভোলা জেলায় সিপিপির স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন ১৩ হাজার ৮৬০ জন, পটুয়াখালীতে ৮ হাজার ৭০০ জন, বরগুনায় ৮ হাজার ৪৪০ জন এবং পিরোজপুরে ১ হাজার ৭০০ জন। অথচ বরিশাল জেলার নদীবেষ্টিত ৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলার জন্য তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক আছেন মাত্র ৬০ জন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এই বৈষম্য দুর্যোগ মোকাবিলা ব্যবস্থাপনাকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
আরও পড়ুন
বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাসাইনমেন্ট খাতার শেষ ঠিকানা ভাঙারির দোকান
এদিকে মাথা গোঁজার শেষ ভরসা হিসেবে সাইক্লোন শেল্টার ব্যবহার করলেও অনেক আশ্রয়কেন্দ্রের ভবন জরাজীর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী। কোথাও নষ্ট পানির কল, অচল শৌচাগার, আবার কোথাও পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাবে দমবন্ধ পরিবেশ বিরাজ করছে। ফলে নারী, শিশু ও বয়স্কদের দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
বরিশাল সদর উপজেলার টুঙ্গিপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. বায়জিদ হোসেন বলেন, ‘ঝড়-বন্যা এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে দেহি পানির কল নষ্ট, বাথরুম ব্যবহারের উপায় নেই। আলো-বাতাস নেই, দম বন্ধ হয়া আহে। মোদের খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই।’
‘দুর্যোগকালীন সময়ে বিভিন্ন প্রোজেক্টের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় কাজ করে থাকি। এছাড়া আমার বিভিন্ন সময়ে শিশু ও নারীদের সাহায্য সহযোগিতা করে থাকি। পিছিয়ে পড়া এসব জনগোষ্ঠীর জন্য সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার পাশে দাঁড়ানো উচিত।’
চরবাড়িয়ার লামছরি গ্রামের বাসিন্দা শামীম মাতুব্বর বলেন, ‘বন্যার পানিতে ঘরের চুলা ডুবে যায়। সাইক্লোন শেল্টার ধারে কাছে নেই। বাধ্য হইয়া সন্তানদের নিয়ে গলাসমান পানিতেই দিন কাটাতে হয়।’
আরও পড়ুন
যশোর-বেনাপোল রেললাইন ডাবলকরণ: প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ পর্যায়ে
একই ধরনের অভিযোগ করেন শায়েস্তাবাদের বাসিন্দা মোসাম্মৎ মরিয়ম বেগম। তিনি বলেন, ত্রাণের কথা শুনছি কিন্তু আমরা চরের মানুষ সময়মতো কিছুই পাই না। আশ্রয়কেন্দ্র কয়েক মাইল দূরে। তাও আবার নারীদের জন্য আলাদা কোনো নিরাপত্তা নেই। আমরা খুব কষ্টে দিন কাটাই।

বরিশাল জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জাগো নিউজকে বলেন, দুর্যোগকালীন সময়ে জেলার সব স্কুল ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। এতে কিছু কিছু স্কুলের বাথরুমের সমস্যা থাকতে পারে, তা পর্যায়ক্রমে সংস্কার করা হয়। দুর্যোগকালীন সময়ে যাতে কেউ ভোগান্তির শিকার না হয় সেজন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
‘ঝড়-বন্যা এলেই আমরা আতঙ্কে থাকি। আশ্রয়কেন্দ্রে গেলে দেহি পানির কল নষ্ট, বাথরুম ব্যবহারের উপায় নেই। আলো-বাতাস নেই, দম বন্ধ হয়া আহে। মোদের খোঁজ নেওয়ার কেউ নেই।’
সিপিপি বরিশাল জেলার উপ-পরিচালক মামুনার রশীদ জাগো নিউজকে বলেন, বরিশাল জেলার সদর (সিটি ইউনিট) এলাকায় বর্তমানে তালিকাভুক্ত স্বেচ্ছাসেবক মাত্র ৬০ জন। নদীবেষ্টিত ৫টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলার বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় এই সংখ্যা সত্যিই নগণ্য। আমরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি এবং নতুন করে সদরে আরও ১২টি ইউনিটে স্বেচ্ছাসেবক নিবন্ধনের জন্য প্রস্তুতি চলছে। যাতে দ্রুত এই শূন্যতা পূরণ করা যায়।
তবে মাঠপর্যায়ে সংকট থাকলেও প্রশাসনের দাবি, দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই।
আরও পড়ুন
অবহেলায় বন্ধ শমশেরনগর বিমানবন্দর
পানি উন্নয়ন বোর্ডের দক্ষিণাঞ্চলের অতিঃ প্রধান প্রকৌশলী মো. আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া জাগো নিউজকে বলেন, দুর্যোগকালীন ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। জরুরি ভাঙন প্রতিরোধের পাশাপাশি স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণের জন্য কয়েকটি বড় প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে। অনুমোদন পেলেই দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা আভাসের নির্বাহী পরিচালক রহিমা সুলতানা কাজল জাগো নিউজকে বলেন, দুর্যোগকালীন সময়ে বিভিন্ন প্রোজেক্টের মাধ্যমে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষা, নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থায় কাজ করে থাকি। এছাড়া আমার বিভিন্ন সময়ে শিশু ও নারীদের সাহায্য সহযোগিতা করে থাকি। পিছিয়ে পড়া এসব জনগোষ্ঠীর জন্য সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার পাশে দাঁড়ানো উচিত।
বরিশাল জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা রনজিত কুমার সরকার জাগো নিউজকে বলেন, যেকোনো দুর্যোগ ও জরুরি সংকট মোকাবিলায় সরকারের পর্যাপ্ত খাদ্যসামগ্রী ও নগদ অর্থ মজুত রয়েছে। বিতরণ ব্যবস্থাকে আরও গতিশীল করা হচ্ছে, যাতে দুর্যোগকালীন সময়ে সাধারণ মানুষ কষ্ট না পায়।
বরিশালের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার মো. সোহরাব হোসেন জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় সমগ্র বরিশাল বিভাগে সাড়ে তিন হাজার সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রয়েছে। এছাড়া জরাজীর্ণ ও ব্যবহারের অনুপযোগী আশ্রয়কেন্দ্রগুলো নিয়মিত সংস্কার করা হচ্ছে। পাশাপাশি আপদকালীন পরিস্থিতি সামাল দিতে ৪৭০ টন ত্রাণ সামগ্রী মজুত রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, স্বেচ্ছাসেবক সংখ্যার যে তারতম্য রয়েছে, তা সমন্বয় করে যেখানে লোকবল কম, সেখানে পার্শ্ববর্তী ইউনিটের মাধ্যমে উদ্ধার কাজ পরিচালনার গাইডলাইন রয়েছে। আমরা যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
এনএইচআর/জেআইএম








