কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার কাঁচকোল এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের ডান তীর রক্ষা বাঁধে তিন সপ্তাহের ব্যবধানে তৃতীয় দফায় ধস দেখা দিয়েছে। গতকাল সোমবার রাতে নতুন করে বাঁধের ৩০ মিটার অংশে ধস শুরু হয়। এতে তীরবর্তী বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে প্রতিরক্ষা কাজ শুরু করেছে। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বরাদ্দ কম হওয়ায় বাঁধের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। পাউবোর মতে, বাঁধের অন্তত ৩০০ মিটার অংশ মারাত্মক ভাঙনঝুঁকিতে রয়েছে।
সন্ধ্যায় বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানায়, আগামী ২৪ থেকে ৭২ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র নদের পানি সতর্কসীমায় পৌঁছে কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চলের কোন কোন স্থান প্লাবিত হতে পারে।
পাউবোর নিয়ন্ত্রণ কক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আজ সন্ধ্যা ৬টায় কুড়িগ্রামের চিলমারী পয়েন্টে ব্রহ্মপুত্রের পানির উচ্চতা বিপৎসীমার ৩৭ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। তবে ওই সময় নদের সব কটি পয়েন্টে পানির উচ্চতা স্থিতিশীল ছিল।
এর আগে গত ১ জুলাই প্রথমবার এবং ১৬ জুলাই দ্বিতীয় দফায় তীর রক্ষা বাঁধে ধস দেখা দেয়। পরে সেখানে জরুরি ভিত্তিতে বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে ধস ঠেকানোর উদ্যোগ নেয় পাউবো। আগের ধস ঠেকানোর কাজ শেষ হওয়ার পর এবার কিছুটা ভাটিতে তৃতীয় দফায় ধস দেখা দিয়েছে।
পাউবো বলছে, তিন দফায় তীর রক্ষা বাঁধের ৯০ মিটার অংশে ধস দেখা দিয়েছে। বাঁধটির ওই স্থান দুর্বল কাঠামোর ওপর নির্মিত এবং সেখানে প্রায়ই ধস দেখা দেয়। ধসের খবর পেয়ে জরুরি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জিও ব্যাগ ডাম্পিং চলমান রাখা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। তবে পানির চাপে বাঁধটি একেবারে বিচ্ছিন্ন হওয়ার সম্ভাবনা কম বলেও দাবি করেছে পাউবো।
একের পর এক ধসের কারণ হিসেবে পাউবো বাঁধের প্রতিরক্ষা কাজে নকশাগত দুর্বলতা এবং ব্রহ্মপুত্রের সম্ভাব্য চ্যানেল পরিবর্তনের কথা বলছে। সংস্থাটির ভাষ্য, কাঁচকোল এলাকার তীররক্ষা বাঁধটি ২০১৬ সালে নির্মাণ করা হয়। সে সময়ের নকশা অনুযায়ী ডাম্পিংয়ে ব্লক ও জিও ব্যাগের ঘনত্ব কম ছিল। ফলে প্রায়ই ধস দেখা দেয়। এ বছরও একই সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং আপাতত জিও ব্যাগ ছাড়া বিকল্প কোনো ব্যবস্থা নেই।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সোমবার রাতে বাঁধে আবার তীব্র ভাঙন দেখা দেয়। একের পর এক ব্লক ও জিও ব্যাগ ধসে যেতে থাকে। আতঙ্কে মাইকিং করে স্থানীয়দের বাঁধের পাড়ে ডাকা হয়। রাতেই তীরে রাখা বালুভর্তি জিও ব্যাগ ধসের স্থানে ফেলেন এলাকাবাসী। পরে সকালে পাউবোর লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছে জিও ব্যাগ ফেলা শুরু করেন। মূল ভাঙন এলাকা ছাড়াও উভয় পাশে বিভিন্ন স্থানে ব্লক স্থানচ্যুত হয়েছে বলেও জানিয়েছেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, `বাঁধ নির্মাণের পর আমরা নদীভাঙন থেকে কিছুটা রক্ষা পেয়েছিলাম। কিন্তু কয়েক বছর ধরে বারবার ধসের ঘটনায় আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। পানি উন্নয়ন বোর্ড এখন পর্যন্ত স্থায়ী কোনো সমাধান দিতে পারেনি। বাঁধটি ভেঙে গেলে আমরা সর্বস্ব হারিয়ে আবারও ভাঙন ও বন্যার কবলে পড়ব।'
বাঁধপাড়ের বাসিন্দা নুরজাহান বেগম বলেন, `একটার পর একটা ধস শুরু হইছে। কয়টা বালুর বস্তা ফেইলা কোনো রকমে ঠেকায়। কী কাজ করে যে, ফের ধস নামে। পোক্ত কাজ না করলে বাঁধও যাইব, মানুষের বাড়িঘরও যাইব।'
ব্রহ্মপুত্র পাড়ের বাসিন্দারা বড় ধরনের বিপর্যয় এড়াতে জরুরি ভিত্তিতে কার্যকর ও শক্তিশালী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তাদের আশঙ্কা, ধস ঠেকানো না গেলে চলমান বন্যা মৌসুমে উপজেলা শহরসহ হাজারো পরিবার পানিবন্দী হতে পারে। শত শত হেক্টর আবাদি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে আমনসহ স্থানীয় কৃষিতে বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।
পাউবো কুড়িগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান বলেন, `ইতিমধ্যে বাঁধের ভাঙন এলাকায় জরুরি প্রতিরোধমূলক কাজ শুরু করা হয়েছে। বালু ভর্তি জিও ব্যাগ ফেলে স্থানটির ধস বন্ধ করার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ধস না ঠেকানো পর্যন্ত কাজ চলবে।'
রাকিবুল হাসান আরও বলেন, `আবার ধস দেখা দেওয়ায় ওই স্থানে তিন দফায় ১৮ হাজার জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের অনুমোদন পাওয়া গেছে। বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান পরিদর্শন করে অ্যাসেসমেন্ট করা হচ্ছে। আর কী পরিমাণ জিও ব্যাগ লাগবে তা হিসাব করে আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানাব।'








