জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি বেড়েই চলেছে। অথচ এমন একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশে আধুনিক আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা যেন এক রূপকথার গল্প! নিজস্ব কোনো স্যাটেলাইট তো নেইই, সুপার কম্পিউটারের মতো উন্নত প্রযুক্তির সুবিধাও অধরা। দেশের পাঁচটি রাডারের মধ্যে কার্যত সচল আছে মাত্র একটি। শুধু তাই নয়, ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে স্থাপিত বজ পাত সেন্সরগুলোও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। দক্ষ জনবলের অভাবে ডেটা বিশ্লেষণ বা মডেলিংয়েও (তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও পূর্বাভাস মডেল) রয়েছে চরম দুর্বলতা। উন্নত বিশ্বের দেশগুলো যেখানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে নিখুঁত পূর্বাভাস দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর চলছে জোড়াতালির ওপর ভিত্তি করে, ধার করা তথ্য ও মান্ধাতা যান্ত্রিক সক্ষমতা দিয়ে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পরিচালক (চলতি দায়িত্ব) মো. মমিনুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, আমাদের দুটি রাডার সচল ছিল-ঢাকা ও রংপুরে। ঝড়ের কারণে ঢাকার রাডারের ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়ে গেছে। এটি পরিবর্তন করতে হবে। ইতোমধ্যে পিডব্লিউডিকে আমরা জানিয়েছি। তারা ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বলেন, রাডার একটি পার্টিকুলার প্যারামিটার। আমাদের আবহাওয়ার পূর্বাভাসে কিন্তু কোনো কমতি ছিল না। ভারি বৃষ্টিপাত ও ভূমিধসের বিষয়ে আমরা গত কয়েকদিন থেকেই সতর্ক করেছি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাঁচটি রাডার স্টেশনের মধ্যে কক্সবাজার, খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডার দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। সম্প্রতি ঝড়ে ট্রান্সফরমার নষ্ট হয়ে অচল হয়ে পড়েছে ঢাকার রাডারও। বর্তমানে সচল আছে শুধু রংপুরের রাডার। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, রাডার অচল থাকলে স্বল্পমেয়াদি পূর্বাভাস দুর্বল হয়ে পড়ে। কারণ, রাডার মেঘের অবস্থান, বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, বজ ঝড়ের গঠন, মেঘ চলাচল ও বায়ুপ্রবাহের আনুমানিক গতিবিধি পর্যবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। নিজস্ব রাডার অকার্যকর থাকলে সুনির্দিষ্টভাবে মেঘ কোথায় আছে, কোথায় যেতে পারে, বৃষ্টিপাত কতটা তীব্র হতে পারে এবং ঝড়ের গঠন কীভাবে পরিবর্তিত হচ্ছে এসব তথ্য দ্রুত ও নির্ভুলভাবে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। স্যাটেলাইট ছবি দিয়ে মেঘের বিস্তৃতি, মেঘের শীর্ষভাগ ও বৃহৎ আকারের আবহাওয়া চিত্র দেখা যায়। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে বৃষ্টিপাতের তীব্রতা, মেঘের অভ্যন্তরীণ গঠন এবং ঝড়ের দ্রুত পরিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রে রাডারের বিকল্প নেই। তাই বাংলাদেশের মতো একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশের জন্য আধুনিক ও উচ্চ রেজ্যুলেশনের ডপলার রাডার নেটওয়ার্ক জরুরি।
আবহাওয়াবিদদের মতে, বাংলাদেশে ব্যবহৃত কিছু রাডার পুরোনো প্রজন্মের। এসব রাডারের খুচরা যন্ত্রাংশ পাওয়া কঠিন, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও অনেক ক্ষেত্রে আগের মডেলের যন্ত্র আর তৈরি করে না। ফলে শুধু সাময়িক মেরামত নয়, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে আধুনিক রাডার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. রাফি উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, সত্যি বলতে আমাদের রাডার নেই। বিমানবাহিনীর রাডার দিয়ে কাজ করা হয়। ঢাকার রাডার বন্ধ। আবহাওয়া পূর্বাভাস দিতে হলে রাডার ডেটা ছাড়া সম্ভব নয়। একেবারেই ট্রপিকাল অবস্থান বলে দেশের তাপমাত্রার তারতম্য খুব দ্রুত হয়। দেখা যায়, এক জায়গায় বৃষ্টি হচ্ছে, তার দুই কিলোমিটার পরেই আবার বৃষ্টি নেই। তাই রাডার ছাড়া আমাদের চলবে না। দ্বিতীয়ত, ডাটা সিমুলেশনের (তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্যে আবহাওয়ার আগাম রূপ তৈরি) জন্য দক্ষ জনবল দরকার। এই দুই জায়গায় জনবল স্বল্পতা আছে।
সিলেট, ময়মনসিংহ ও উপকূলীয় অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র কম : বন্যা, অতিবৃষ্টি, বজ পাত, পাহাড়ি ঢল ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে-সিলেট, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামের পার্বত্য অঞ্চল ও উপকূলীয় এলাকা। জলবায়ু ও আবহাওয়া বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব এলাকায় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ও রাডার কাভারেজ আরও ঘন হওয়া দরকার। অথচ এসব অঞ্চলে পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র তুলনামূলক কম। তারা বলছেন, সিলেট অঞ্চলে পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি ও দূরবর্তী রাডারের কারণে মেঘ ও বৃষ্টিপাত পর্যবেক্ষণে অনেক সময় সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। একই ভাবে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, প্রবল বর্ষণ, বজ ঝড় ও জলোচ্ছ্বাস পর্যবেক্ষণে শক্তিশালী রাডার কাভারেজ জরুরি। কক্সবাজার, খেপুপাড়া, খুলনা, বরিশাল উপকূল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে আধুনিক রাডার কাভারেজ থাকলে ঘূর্ণিঝড়, ভারি বৃষ্টি ও বন্যার পূর্বাভাস আরও কার্যকর করা সম্ভব হবে।
শহরে বন্যার পূর্বাভাস নেই : বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার অ্যান্ড ফ্লাড ম্যানেজমেন্টের (আইডব্লিউএফএম) অধ্যাপক ড. একেএম সাইফুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশে ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে সৃষ্ট শহরে বন্যার কোনো পূর্বাভাস দেওয়া হয় না, অথচ ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো বড় শহরগুলোর জন্য এটি অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো প্রধান শহরগুলোর জন্য বন্যা মডেলিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সঙ্গে আবহাওয়া অধিদপ্তর যৌথভাবে কাজ করতে পারে। আগামীতে গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকায় বন্যার পূর্বাভাসের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজন হতে পারে।
অকার্যকর বজ পাত পর্যবেক্ষণ যন্ত্র : বজ পাতের আগাম সতর্কতা দেওয়ার জন্য ২০১৮ সালে ৬২ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের আটটি স্থানে লাইটনিং ডিটেকশন সেন্সর স্থাপন করা হলেও সেগুলো অকার্যকর হয়ে পড়েছে। পরে আরও পাঁচটি সেন্সর কেনা হলেও সেগুলো কার্যকরভাবে ব্যবহার হচ্ছে কিনা, সে বিষয়েও আবহাওয়াবিদদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে। জনবল, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ ও রক্ষণাবেক্ষণ সংকটের কারণে অনেক সেন্সর থেকে নিয়মিত তথ্য পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ আছে।
নেই নিজস্ব আবহাওয়া স্যাটেলাইট : আবহাওয়া অধিদপ্তরের নিজস্ব কোনো স্যাটেলাইট নেই। ফলে বাংলাদেশকে জাপান, কোরিয়া, চীন, ভারতসহ আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট ডেটার ওপর নির্ভর করতে হয়। আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট ডেটা ব্যবহার করা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাসে প্রায় সব দেশই আন্তর্জাতিক ডেটা ব্যবহার করে। তবে নিজস্ব আবহাওয়া স্যাটেলাইট না থাকলে ডেটা সংগ্রহ, জরুরি সময়ে দ্রুত স্ক্যান, ডেটা প্রাপ্তির সময়, ডেটার অগ্রাধিকার এবং পর্যবেক্ষণ কৌশলের ওপর সরাসরি জাতীয় নিয়ন্ত্রণ থাকে না। দুর্যোগ মুহূর্তে এটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। ভারতের নিজস্ব আবহাওয়া স্যাটেলাইট রয়েছে। পাকিস্তানের রিমোট সেন্সিং ও আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট রয়েছে; যা ভূমি পর্যবেক্ষণ, পরিবেশ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত হয়।
প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল : আধুনিক আবহাওয়াবিজ্ঞান এখন শুধু প্রচলিত পর্যবেক্ষণভিত্তিক বিদ্যা নয়। তাই অভিজ্ঞ আবহাওয়াবিদের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের প্রশিক্ষিত জনবল যুক্ত করা জরুরি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আবহাওয়াবিজ্ঞান, দুর্যোগবিজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, পরিসংখ্যান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষার্থীরা বের হচ্ছেন। তাদের জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতাকে জাতীয় আবহাওয়া সেবায় যুক্ত করা গেলে পূর্বাভাস, গবেষণা, সতর্কবার্তা প্রচার ও ইমপ্যাক্ট-বেজড ফোরকাস্টিং আরও শক্তিশালী হতে পারে। ২০১৩ সালের পর থেকে আবহাওয়া অধিদপ্তরে নতুন নিয়োগ সম্পূর্ণ বন্ধ ও পদোন্নতি নিয়ে জটিলতা থাকার অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন বিভাগে ব্যাপক জনবল সংকটও রয়েছে।
সুপার কম্পিউটার ও উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ঘাটতি : আধুনিক আবহাওয়া পূর্বাভাস শুধু পর্যবেক্ষণের ওপর নির্ভরশীল নয়। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক ডেটা সহায়ক, তবে জাতীয় সক্ষমতার বিকল্প নেই। উচ্চ রেজ্যুলেশনের নিজস্ব মডেল চালানো এবং জলবায়ু বিশ্লেষণ করার জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং অবকাঠামো প্রয়োজন। প্রতিবেশী ভারত ইতোমধ্যে আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষণার জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে।








