গোটা বিশ্বকে স্তব্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা এর আগে আর কোনো কাগজের ছিলো বলে মনে হয় না। বা একটি সোনালি কলমের।

ডায়েরির তিন টুকরো কাগজের ওপর সোনালি কলম দিয়ে লেখা কয়েক ছত্রই তো। সে কয়েক ছত্রে বিশ্বজোড়া শতকোটি মানুষের মনে এমন রক্তক্ষরণ এনে দেওয়ার ক্ষমতা কি খোদ শেক্সপিয়ারেরও ছিল? বা রবীন্দ্র-নজরুলের? শেলি-কিটসের? সাহিত্যবিদরা ভালো বলতে পারবেন। আবার বলা যায় না, কাল রাত থেকে হয়তো তাঁদেরও অনেকে ব্যথাতুর হয়েছেন ওই তিন কাগজের ফেরে।

ডায়রির ৩ পাতায় লিখে নিজের বিদায়ের সিদ্ধান্ত জানান মেসি।

দুদিন আগেই ইন্টার মায়ামির হয়ে একাই চার গোল করে অবিশ্বাস্যভাবে ম্যাচ জিতিয়ে আবারও সেই আলোচনার জন্ম দিয়েছেন, যে আলোচনা এর আগেও আরও অন্তত লক্ষাধিকবার ফুটবলপ্রেমীদের চায়ের কাপে ঝড় তুলেছে- ‘মেসি জাদুর শেষ কোথায়?’

আমাদের রাত হতে পারে, ফ্লোরিডার ফোর্ট লডারডেলে তখন সকাল। চার গোল করার দুদিন পর এমনই এক সকালে কী ভেবে ওই কয়েক ছত্র লিখে পুরো বিশ্বে কান্নার রোল উঠিয়ে দিলেন, তিনিই ভালো বলতে পারবেন। জাদুকরেরা ভীষণ খেয়ালি হন, আবেগী হন। সেই খেয়ালের নাগাল পাওয়া আপনার-আমার কম্মো নয়। আমরা শুধু জাদুকরের জাদু দেখে মুগ্ধই হতে পারি। অবিশ্বাসে মাথা নাড়াতে পারি। আর বিড়বিড় করে বলতে পারি, ‘এও কী সম্ভব?’

তিন কাগজের টুকরোয় লেখা জাদুকরের কয়েক ছত্র পড়ে ঠিক যেমনটা আবারও বলে উঠেছি, এও কি সম্ভব?

যে এখনও একাই চার গোল করে প্রতিপক্ষকে স্তব্ধ করে দেয়, যে দু-মাস আগেও বিশ্বকাপের মতো মঞ্চে একাই ভঙ্গুর দলকে ফাইনালে উঠিয়ে দেয় পা-জোড়ার কারুকাজে, খেলোয়াড়ি সামর্থ্যের দিক দিয়ে তর্কযোগ্যভাবে যে এখনও ক্যারিয়ারের মধগগনেই আছে, এমন অবস্থায় বিদায় বলে দেওয়ার সাহস, শক্তি, ক্ষমতা, এও কি সম্ভব?

লিওনেল মেসি জানিয়ে দিলেন, সম্ভব।  বিজয় মার্চেন্টের নাম মেসি কখনও শুনেছেন বলে মনে হয় না। দুজন দুই জগতের বাসিন্দা। কিন্তু মেসির এই অবসরের ঘোষণা দুজনকে মিলিয়ে দিয়েছে এক বিন্দুতে। বিজয় মার্চেন্ট বলেছিলেন, ‘তখনই অবসর নেবে যখন মানুষ জিজ্ঞেস করবে না যে কখন অবসর নিচ্ছ, বরং বলবে, কেন অবসর নিচ্ছ?’

সে কেন’র জবাব হয়তো আছে। মেসি নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন তাঁর লেখায়। লেখার শেষদিকে বোঝা যায় এই সিদ্ধান্তের যৌক্তিকতা, ‘এই কথাগুলো আমি ২১ জুলাই লিখেছিলাম, ফাইনালের দুই দিন পর। আমার বাবার ঘটনার পর আমি আগের চেয়েও বেশি নিশ্চিত।’

ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা, সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা বাবার মৃত্যুর পর আর হয়তো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে জড়াতে মন চায়নি। মেসি আকাশী-সাদা গায়ে জড়িয়ে দেশের হয়ে মাঠে নামবেন আর বাবা সেটা চর্মচক্ষে দেখতে পারবেন না, তাতে হয়তো সায় দেয়নি মেসির মন।

ওই যে, জাদুকররা যে ভীষণ আবেগীও হন! মানুষটা মেসি বলেই হয়তো আবেগের সেই প্রদর্শনে আমরা চমকে যাই, অবিশ্বাস্য লাগে। দুই দশক ছাড়ানো ক্যারিয়ারে মেসির মনের ভেতর উথলে ওঠা আবেগের ছোঁয়া বাইরের বাকি সবাই যতবার পেয়েছেন- হাতে গোনা যাবে। নাহয় পুরো ক্যারিয়ারে যতবার তাঁকে নিয়ে কাটাছেঁড়া হয়েছে, তাঁর দিকে সমালোচনার বিষমাখা তির ধেয়ে গিয়েছে; ওগুলো সহ্য করে চল্লিশেও এই খেলা দেখিয়ে যাওয়া! জাদুকর বলেই সম্ভব হয়তো।

যতবার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, জবাবটা মুখ দেয়নি, দিয়েছে পা। মেসির গোটা ক্যারিয়ারটা তাঁর সামর্থ্য নিয়ে ওঠা প্রশ্ন আর সেই প্রশ্নকে চিরতরে থামিয়ে দেওয়ার গল্পই তো। প্রশ্ন উঠলো, বাঁ পায়ের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল। ডান পা দিয়ে শ-খানেক গোল করেও থামলেন না, বিশ্বকাপ ফাইনালেও ডান পা দিয়ে গোল করে জানিয়ে দিলেন, সব্যসাচী শব্দটা তাঁর নামের পাশেও ভালোই যায়।

তাঁর মতো খর্বাকৃতির ফুটবলার নাকি হেড করে গোল করতে পারেন না। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের রিও ফার্ডিনান্ডও ২০০৮ চ্যাম্পিয়নস লিগ ফাইনালের আগে হয়তো এমনটাই ভেবেছিলেন। পরে আরও ভালোভাবে মেসিকে মার্ক কেন করেননি। ভেবে হয়তো আজীবন পস্তিয়েছেন। 

ইংল্যান্ডের বৃষ্টিস্নাত ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় খেলতে পারবেন তো? ইংলিশ ক্লাবগুলোর বিপক্ষে যেকোনো খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি গোল, ওয়েম্বলিতে ফিনালিসিমা জয়ের উল্লাস সে প্রশ্নবোধক চিহ্নকে দাঁড়ি বানিয়ে দিয়েছে সেই কবে!

ফ্রি-কিক দিয়ে নাকি গোল করতে পারেন না। ডিরেক্ট ফ্রি-কিকে ৭৪টা গোল এখন হয়তো সেই সমালোচনা দেখে নিশ্চুপ হেসে যায়।

পেনাল্টি মিস করে চিলির বিপক্ষে দুবার কোপা আমেরিকার শিরোপা হারের পর পেনাল্টি-ব্যর্থতা নিয়ে এত শোরগোল উঠলো, ২০২২ বিশ্বকাপের পর সেই শোরগোলের সুর গেল বদলে। এখন পেনাল্টি শব্দের সঙ্গে তাঁর নামের এক বিচিত্র সমাস ঘোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন কোণে।

এরপর প্রশ্ন উঠল, পেনাল্টি ছাড়া নাকি কিছু জিততে পারেন না। পেনাল্টি ছাড়াই ২০২৪ কোপা আমেরিকা জিতে আবারও প্রমাণ করলেন - এসব সমালোচনার দৌড় তাঁর রাইট উইং থেকে দেওয়া কোনো দৌড়ের চেয়ে দীর্ঘ নয়। 

জাবি-ইনিয়েস্তা ছাড়া কিছু করতে পারেন না, ক্যাম্প ন্যুর বাইরে কিছু করতে পারেন না, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে চুপ থাকেন, অধিনায়কত্বের ক্যারিশমা নেই, ক্লাবের বাইরে কিছু করতে পারেন না! কত প্রশ্ন, কত সন্দেহ।

গত দশ বছরে প্রত্যেকটা প্রশ্নের উত্তর লিখেছেন সযতনে। আর সে উত্তরগুলোই সাফল্য হয়ে ধরা দিয়েছে একে একে। জাতীয় দলে কিছু জিততে না পারা ছেলেটার শোকেসে এখন জ্বলজ্বল করে বিশ্বকাপ, গোল্ডেন বল, ব্যালন ডি’অর, কোপা আমেরিকা আরও কত কী! যেকোনো পেশায় সর্বোচ্চ সফল হওয়ার যদি কোনো মাপকাঠি থেকে থাকে, সেটার শুরুও মেসিকে দিয়েই হবে, শেষটায়ও থাকবেন তিনিই।

তিন টুকরো কাগজের সঙ্গে এক সোনালি কলমের কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম। সোনালি কলমটার মাহাত্ম্যও কম নয়। কলমটার মাথায় দিকে তাকালে দেখবেন বিশ্বখ্যাত ফ্যান্টাসি সিরিজ হ্যারি পটারের অন্যতম সেরা চরিত্র হার্মিওনি গ্রেইঞ্জারের ‘টাইম-টার্নার’। কলমের গায়ে কালো রঙে খোদাই করা হ্যারি পটারের লোগো। 

মেসির হ্যারি পটার-প্রীতি আজকের নয়। কিন্তু খোদ হ্যারি পটারের স্রষ্টা জে.কে. রাওলিংও হয়তো স্বীকার করবেন, বইয়ের পাতায় অবিশ্বাস্য কাণ্ড-কীর্তি ঘটানো হ্যারি পটারকে সবচেয়ে সফলভাবে বাস্তবে ফুটিয়ে তুলেছেন খোদ মেসিই। ফুটবলকে নব্বই মিনিটের গণ্ডি থেকে বের করে এনে বিশ্বের আনাচে-কানাচে থাকা মানুষের হৃদয় রাঙিয়ে দেওয়ার কাজটা তাঁর চেয়ে ভালোভাবে করতে কে পেরেছেন?

প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে হাজারো ড্রিবলিং, ‘লা পাউসা', ‘স্টাটার স্টেপ’, ‘চপ কাট’, বডি ফেইন্ট আর স্টেপওভারের ভিড়ে তলিয়ে যেতে হয়। সে তলিয়ে যাওয়ার অভিজ্ঞতা বড় সুখের, বড় কাছের। মহাকালের অনন্ততার মাঝে সৃষ্টিকর্তা যে মেসির যুগেই আমাদের জীবিত থেকে বারংবার মুগ্ধ হওয়ার সৌভাগ্য দিয়েছেন, তলিয়ে যেতে যেতে সেই সৌভাগ্যের জন্য কৃতজ্ঞতাবোধও কম হয় না। পার্থক্য হোলো, এখন থেকে সেই সুখ আর কৃতজ্ঞতাপাশে আবদ্ধ থাকার অনুভূতির শেষ যুক্ত হবে একটা দীর্ঘশ্বাসও।

সবুজ ক্যানভাসে আকাশী সাদা রঙা এক মধুকরের বিভ্রমজাগানিয়া মুভমেন্ট আর না দেখতে পাওয়ার দীর্ঘশ্বাস।