ধরা যাক আজ রোববার। ব্যস্ত সকাল। যানজট মাড়িয়ে, বৃষ্টি ডিঙিয়ে অফিসে হাজির হলেন অবশেষে। গিয়েই দেখলেন, আপনার ডেস্কে একস্তূপ ফাইল আর কম্পিউটার খুলতেই পেলেন গোটা বিশেক জরুরি ই–মেইল। ফাইলের কাজ শেষ হতে হতে আপনি ক্লান্ত। ই–মেইলের উত্তর দেওয়ার উৎসাহ হারিয়েছেন।
ভাবছেন, চ্যাটজিপিটি বা জেমিনাইকে দিয়েই এই উত্তরগুলো তৈরি করাবেন। দীর্ঘ ই–মেইল লিখতে হবে। প্রথম ই–মেইলের ড্রাফট প্রায় ১০ বার পরিবর্তন করালেন। এরপর বাকি ৯টি ই–মেইলের ক্ষেত্রেও একই দশা। আপনি ভাবছেন, বাঁচা গেল। অন্তত কিছুটা তো পরিশ্রম কমল। কাজ শেষ করে এক গ্লাস পানি পান করলেন।
আপনি কি এই সময়ে ভেবে দেখেছেন যে এই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দিয়ে ই–মেইল লেখাতে গিয়ে আপনি কতটুকু অদৃশ্য পানি খরচ করলেন? আপনি, মানুষ হিসেবে পান করলেন এক গ্লাস পানি, আর জেমিনাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হিসেবে? প্রায় ১০ গ্লাস! ভাবতে পারেন?
এ অবধি পড়ে হয়তো আপনার মনে সন্দেহ জেগেছে যে লেখক হয় ম্যাজিক রিয়ালিজমের পৃথিবীতে ঘুরছেন কিংবা নিশ্চিত জ্ঞান হারিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর পানির এই সম্বন্ধের কথা জানলে অবাক হওয়ারই তো কথা! তবে এই সত্যকে উপলব্ধি আমাদের যে করতেই হবে।
মনুষ্যপৃথিবীর তৃষ্ণা মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে যখন পৃথিবী, তখন আরেক সমান্তরাল যান্ত্রিক পৃথিবীর ‘জেমিনাই’ কিংবা ‘চ্যাটজিপিটি’দের তৃষ্ণা মেটাবার সামর্থ্য কি সত্যিই আমাদের আছে?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে আলোচনা, বিতর্ক, সমালোচনা চলছে বিস্তর। যন্ত্র কি আদতেই বুদ্ধিমান হতে পারে? যন্ত্র গণনা করতে পারে, তবে ভাবতে পারে কি? জেমিনাই বা চ্যাটজিপিটির আর যা–ই হোক মনন আছে কি? আর অনুভূতি কিংবা আত্মা?
সম্প্রতি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পরিচালনার কেন্দ্রে থাকা উপাত্তকেন্দ্র বা ডেটাসেন্টারগুলোর অতিরিক্ত শক্তি ব্যবহার নিয়েও কথা উঠছে। শক্তির এই অতিব্যবহার কি টেকসই হওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নের সবগুলোই যৌক্তিক এবং জরুরি। তবে ইত্যাকার এই প্রশ্নের পাশাপাশি যে বিষয়টি কেবল ভাবতে শুরু করেছি আমরা, তা হলো এই উপাত্তকেন্দ্রগুলোর পরিচালনাতে তৈরি হওয়া তাপের বিকিরণ ও এতে পানির প্রয়োজনীয়তার কথা।
আমাদের জীবনের সঙ্গে কম্পিউটার প্রযুক্তির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও অবশ্যম্ভাবীভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার বাড়তেই থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যেকোনো অনুরোধ বা জিজ্ঞাসার সময় মনে রাখা দরকার যে এই প্রতিটি উত্তর তৈরি করার পেছনে রয়েছে বিদ্যুৎ, তাপ আর জলের অপরিহার্যতা।
ধরুন, আমি ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের একটি ক্যাফেতে বসে একটি ছবি তৈরি করার অনুরোধ রাখলাম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে। একটি স্থিরচিত্র। আমার এই অনুরোধ গিয়ে পৌঁছাল যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের একটি উপাত্তকেন্দ্রে। উপাত্তের গুনতি করতে কেবল শক্তির প্রয়োজন পড়ে তা নয়, গণনার শেষে তাপেরও উদ্গিরণও হয়; যেমনটি হয় আমাদের কম্পিউটারে।
আমরা হয়তো কম্পিউটার উত্তপ্ত হয়ে গেলে তাকে শীতল করার জন্য এর ভেতরে থাকা পাখা চলবার সঙ্গে ভালোই পরিচিত। এই উদ্গিরীত তাপকে সরাবার প্রয়োজনে শীতলীকরণ প্রক্রিয়া দরকার হয়ে পড়ে। আর এই প্রক্রিয়া দুটি ধাপে পানি ব্যবহার করে থাকে। ঢাকার ক্যাফে থেকে অনুরোধ করা এই একটি ছবি তৈরি করতে ক্যালিফোর্নিয়ার উপাত্তকেন্দ্রের প্রায় দুই গ্লাস সুপেয় পানি ব্যবহার করা জরুরি হয়ে পড়ে!
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই পানির তৃষ্ণার কারণ খুঁজে দেখা যাক। পৃথিবীর যেকোনো ব্যক্তি, যেকোনো স্থান থেকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একটি অনুরোধ করলে, সেই অনুরোধ রাখতে উপাত্তকেন্দ্রের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয় তার। উপাত্ত খুঁজে বের করা ও তা প্রক্রিয়াজাত বা প্রসেস করতে অসংখ্য গণনা ধাপ সম্পন্ন করতে হয়। এই ডিজিটাল প্রক্রিয়াকরণ থেকে তৈরি হয় তাপ। অতিরিক্ত এই তাপ তাই বিকিরণ করতে হয় যন্ত্রকে সচল ও সমর্থ রাখতে।
এআই এআই ডাক পাড়ি, মোদের এআই কার বাড়ি২০১৬ পর্যন্ত কেবল বায়ুভিত্তিক শীতলীকরণই যথেষ্ট ছিল। কেননা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার ও প্রসার ছিল সীমিত। তবে এর পর থেকে, গত এক দশকে উপাত্তকেন্দ্রের ব্যবহার ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। আর এ কারণে, বায়ুভিত্তিক শীতলীকরণ অপ্রতুল হয়ে দাঁড়ায়, আর দরকার হয় তরলভিত্তিক শীতলীকরণের। এর কারণ, পানির তাপ শোষণ ক্ষমতা বায়ুর প্রায় ৪ হাজার গুণ।
এই শীতলীকরণ প্রক্রিয়া চালু রাখতে পানির দরকার পড়ছে দুটি ধাপে। প্রথমটি ডিজিটাল উপকরণের সঙ্গে সরাসরি সংস্পর্শে থাকা ‘ডিরেক্ট-টু-চিপ’ কুলিং প্রযুক্তিতে পানি ও গ্লাইকল মিশ্রণে, আর দ্বিতীয়টি এই মিশ্রণ থেকে তাপ সরাবার জন্য সরাসরি পানির ব্যবহারে।
অর্থাৎ আপনার যেকোনো অনুরোধ মেটাতে যে গণনা সম্পাদন করতে হয়, এর পরিণাম হিসেবে সুপেয় পানি উত্তোলন আর ব্যবহার করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। ২০২৫ সালে এক ডাচ গবেষকের হিসাব অনুযায়ী, এক বছরে উপাত্তকেন্দ্রগুলোর শীতলীকরণে দরকার পড়েছে প্রায় ৫৫০ বিলিয়ন লিটার পানি, যা কিনা পৃথিবীর তাবৎ বোতলজাত সুপেয় পানির বার্ষিক পরিমাণের সমান!
প্রশ্ন হচ্ছে, এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি হিসেবে আমার বা আপনার ভূমিকা কী হতে পারে? যেকোনো বৈশ্বিক সমস্যা মোকাবিলায় ব্যক্তিমানুষের ভূমিকা নগণ্য হলেও, অনেকের অংশগ্রহণে তা উল্লেখযোগ্য হয়ে দাঁড়ায়। আর এ জন্য জানতে হবে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আমরা দৈনিক যেভাবে ব্যবহার করি তাতে কতটুকু পানি খরচ হয়। আর এই প্রযুক্তির ব্যবহার আমি সচেতনভাবে নিচ্ছি কি না।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর পানির সম্পর্কের যদিও কোনো নিখুঁত অনুমান এখনো মেলেনি, তবে গণনাগত শক্তির প্রয়োজনীয়তা ও এর ফলে তৈরি হওয়া তাপের শোষণের হিসাব কষলে কিছুটা ধারণা করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একটি ই–মেইল ড্রাফট করাতে এবং তা ১০ বার সংশোধন করাতে খরচ হবে এক গ্লাস পানি।
একইভাবে, একটি ছবি একবার তৈরি করাতে খরচ হবে কমপক্ষে দুই গ্লাস এবং একটি ১০ সেকেন্ডের ভিডিও একবার তৈরিতে ২০ গ্লাস সুপেয় পানি খরচ করবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। তাই অবসরে সময় কাটাতে কিংবা অপ্রয়োজনে কেবল বিনোদনের জন্য জেমিনাইকে ব্যবহার করার আগে একবার অন্তত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনন্ত জলতৃষ্ণার কথা আমাদের ভাবা উচিত।
আমাদের জীবনের সঙ্গে কম্পিউটার প্রযুক্তির মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাও অবশ্যম্ভাবীভাবে জড়িয়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে এর ব্যবহার বাড়তেই থাকবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে যেকোনো অনুরোধ বা জিজ্ঞাসার সময় মনে রাখা দরকার যে এই প্রতিটি উত্তর তৈরি করার পেছনে রয়েছে বিদ্যুৎ, তাপ আর জলের অপরিহার্যতা।
একটি ই–মেইল, একটি ছবি বা একটি ভিডিও তৈরি হয়তো কয়েক গ্লাস জল দাবি করে, তবে শতকোটি মানুষের দৈনিক অনুরোধ যোগ হতে থাকে যখন, তখন সে চাহিদা অপূরণীয় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই প্রশ্নটি আমি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করব কি করব না তা নয়, প্রশ্নটি হলো, আমি কখন এই প্রযুক্তির সহায়তা নেব এবং কেন নেব?
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অহেতুক ব্যবহার কিংবা নিছক বিনোদনের জন্য এর উপযোগ এই পরাক্রমশালী প্রযুক্তিকে কেবল তৃষিতই করে তুলবে। আগামী পৃথিবীতে সুপেয় পানির অভাবকে অনিবার্য করে তুলতে অন্তত ব্যক্তি আমি যেন নিজেকে দায়ী না করে তুলি।
নাভিদ সালেহ ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাস অ্যাট অস্টিনের অধ্যাপক এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও পানির সম্বন্ধের একজন গবেষক।
*মতামত লেখকের নিজস্ব








