গত ২০ জুন প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, ৯০ শতাংশ ইসরায়েলি নাগরিক মনে করেন ইরানের সঙ্গে সদ্য সমাপ্ত যুদ্ধে ইরানই জয়ী হয়েছে। এর পরের দিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম সিবিএসের এক জরিপে দেখা যায় ৭৮ শতাংশ মার্কিন নাগরিক মনে করেন যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হওয়া উচিত। মাত্র ২২ শতাংশ মনে করেন, ইরানের কাছ থেকে আরও ছাড় পাওয়ার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া দরকার। যুদ্ধরত দেশগুলোর বাইরে পুরো বিশ্বই মনে করছে, এই ১০০ দিনের আকাশযুদ্ধে ইরান জয়লাভ করেছে।

২৪ জুন কাতারের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, উপসাগরীয় দেশগুলো যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরানের অর্থনীতি পুনর্গঠনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি দেশটির সঙ্গে একটি আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো গড়ে তুলতেও আগ্রহী।

মাত্র তিন মাস আগেও এই ফলাফল শুধু অপ্রত্যাশিত নয়, ছিল প্রায় অচিন্তনীয়। ১৯৭৯ সালের পর থেকে যে উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের বিপ্লবী ইসলামি সরকারকে তাদের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে দেখে এসেছে, তারাই এখন সেই ইরানকে আরও শক্তিশালী করতে এগিয়ে আসছে। ইতিহাস বলে, বড় আন্তর্জাতিক যুদ্ধে এমন অভাবনীয় ফলাফল বিশ্ব রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে সম্পূর্ণ নতুন এক পথে এগিয়ে দেয়।

বিখ্যাত বিপ্লবী ও তাত্ত্বিক লিওন ট্রটস্কি বলেছিলেন, ‘যুদ্ধ হলো ইতিহাসের ইঞ্জিন।’ গত এক-দেড়শ বছর বাদ দিলে, মানবসভ্যতার পুরো ইতিহাসেই যুদ্ধ নির্ধারণ করত আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণ ও রাষ্ট্রের সীমানা। বিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় যুদ্ধের সংখ্যা ও ব্যাপকতা সীমিত করার অনেক চেষ্টা করা হলেও বাস্তবে নিত্যনতুন যুদ্ধ থেমে নেই। যুদ্ধই এখনো অনেক ক্ষেত্রে শেষ মীমাংসাকারী।

ইরান-যুদ্ধে এই অপ্রত্যাশিত ফলাফলের পেছনে প্রত্যক্ষ কারণ ছিল হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নাছোড়বান্দা অবরোধ। তবে এই অবরোধ ও অন্যান্য ফ্রন্টের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি ছিল ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি। সমরবিশারদদের মতে, ইরান যুদ্ধ ও চলমান ইউক্রেন যুদ্ধ স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র বর্তমানে ‘যুদ্ধক্ষেত্রে

বিপ্লব’ ঘটিয়েছে। আর যুদ্ধক্ষেত্রের এই বিপ্লব সব সময়ই আন্তর্জাতিক সম্পর্কেও যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে।

সমরবিদ্যায় ‘যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব’ বা রেভুলেশন ইন মিলিটারি এফেয়ার্স বা সংক্ষেপে আরএমএ বলতে যুদ্ধ পরিচালনার পদ্ধতি, প্রযুক্তি, রণনীতি বা প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর এমন এক গভীর ও দ্রুত রূপান্তরকে বোঝায়, যা সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ, অভিযান ও সামরিক লক্ষ্য অর্জনের পদ্ধতিতে মৌলিক পরিবর্তন আনে। এই প্রযুক্তির প্রথম ব্যবহারকারীরা যুদ্ধক্ষেত্রে প্রায় অপরাজেয় সুবিধা পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সমরবিদ্যায় এই ধারণাটি একটি আবশ্যক পাঠ্য বিষয় হিসেবে যুক্ত হয়।

তবে ১৯৯১ সালে ইরাকের বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক নিখুঁত অস্ত্রপ্রয়োগের অভাবনীয় সাফল্যের পরই বিষয়টি গবেষণার মূল কেন্দ্রে চলে আসে। প্রযুক্তি, রণনীতি বা সংগঠন—এই তিনটি উপাদানের যেকোনো একটি বা একাধিক সমন্বয়ে এই বিপ্লব ঘটতে পারে। তবে প্রযুক্তির বর্তমান দ্রুতগতির যুগে প্রযুক্তি ছাড়া যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানো অসম্ভব।

সভ্যতার ইতিহাস জুড়ে এমন অসংখ্য বিপ্লব ঘটেছে এবং এর হাত ধরে আন্তর্জাতিক ভারসাম্যে পরিবর্তন এসেছে। ব্রোঞ্জ যুগে প্রথম অশ্বচালিত যুদ্ধরথের প্রচলন মিসরীয়, হিট্টি ও ব্যাবিলনীয়দের মতো বিস্তৃত সাম্রাজ্যের সূচনা করেছিল। প্রচলিত অস্ত্র নিয়েও কেবল সুশৃঙ্খল ‘লেজিয়ন’ ভিত্তিক সেনাবাহিনীর সুবাদে রোম প্রজাতন্ত্র ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। তেমনি নতুন রণনীতি ও গতিশীল অশ্বারোহী বাহিনীর কারণে চেঙ্গিস খানের মঙ্গোলরা পৃথিবীর দ্রুততম ও বৃহত্তম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করে।

ইতিহাসে দেখা যায়, বাবর তাঁর যুদ্ধকামান ও গোলন্দাজ বাহিনীর দক্ষতায় মাত্র ১২ হাজার সৈন্য নিয়ে দিল্লির সুলতান লোদির পাঁচ গুণ বড় বাহিনীকে হারিয়ে মোগল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। যদিও উপমহাদেশে আগে থেকেই ভারী কামান ছিল, কিন্তু অটোমান বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় যুদ্ধক্ষেত্রে চলমান ও গতিশীল কামানের ব্যবহার বাবরই প্রথম শুরু করেছিলেন।

ইউক্রেন একটি সামুদ্রিক ড্রোন দিয়ে কার্চ সেতুর নিচ থেকে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সেতুটি ধসিয়ে দেয়া হয় বলে ধারণা করা হয়ে থাকে

ফরাসি সেনাপতি নেপোলিয়ন বোনাপার্ট তাঁর উদ্ভাবিত ‘কর্পস পদ্ধতি’ ও অতুলনীয় রণকৌশলে কয়েক বছরের মধ্যে পুরো ইউরোপের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সমাজ বদলে দিয়ে আধুনিক ইউরোপের ভিত্তি স্থাপন করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর বছরগুলোতে জার্মানির ট্যাংক, বিমান ও বেতারের সমন্বয়ে গঠিত রণনীতি ‘ব্লিৎজক্রিগ’ বা তড়িৎযুদ্ধ আধুনিক আরএমএ ধারণার প্রধান প্রেরণা। আর মহাযুদ্ধের শেষে জাপানের ওপর পারমাণবিক বোমার প্রয়োগ পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর এক বিপ্লবের জন্ম দেয়। পারমাণবিক বোমার আবির্ভাব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো পরাশক্তিদের মধ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধকে অকল্পনীয় করে তোলে।

তবে পারমাণবিক বোমার মতো সব সামরিক বিপ্লব শক্তির ভারসাম্যে দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনে না। অনেক বিপ্লবই ক্ষণস্থায়ী হয়, যতক্ষণ না প্রতিপক্ষ সেই প্রযুক্তি বা রণকৌশল নিজেরা আয়ত্ত করে বা তা প্রতিহত করার ক্ষমতা অর্জন করে। এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন ওঠে, বর্তমানের ড্রোন প্রযুক্তি কি আসলেই যুদ্ধক্ষেত্রে এক স্থায়ী বিপ্লব? এর প্রভাব কতটা সুদূরপ্রসারী?

দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে মূলত এর ‘বিনিময় খরচের’ কারণে। যেখানে একটি ড্রোনের খরচ মাত্র ২০ হাজার ডলার, সেখানে তা ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ কয়েক লাখ থেকে মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর সঙ্গে রয়েছে নিচু দিয়ে ওড়া ড্রোন শনাক্তকরণের জন্য বিস্তৃত রাডার ব্যবস্থার বিশাল খরচ। ফলে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন আক্রমণ করলে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

গত এক দশকে সামরিক ও বাণিজ্যিক খাতে ড্রোনের ব্যবহার বাড়ছিল। কিন্তু কিছু নতুন প্রযুক্তির বিকাশের ফলে ড্রোনের খরচ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে এখন মাত্র কয়েকশ ডলারে নেমে এসেছে। এর পেছনে রয়েছে হালকা কিন্তু শক্তিশালী ব্যাটারি, ক্ষুদ্র ক্যামেরা, উন্নত মাইক্রোচিপ, জিপিএস, ক্ষুদ্র সেন্সর এবং ত্রিমাত্রিক (থ্রি-ডি) প্রিন্টিং প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তিগুলোর বেশির ভাগই স্মার্টফোনের মতো বাণিজ্যিক খাতের প্রতিযোগিতার কারণে বাজারে সহজলভ্য হয়েছে। বিশেষ করে চীন থেকে বাণিজ্যিক ড্রোনের বিশাল বাজার সৃষ্টি হওয়ায়, প্রযুক্তিগুলোকে অস্ত্রে রূপান্তর করতে প্রয়োজন পড়েছে কেবল দক্ষ প্রযুক্তিবিদ ও প্রোগ্রামারদের।

ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধে যে ড্রোনটি সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এনেছে, তা হলো দূরপাল্লার ‘আত্মঘাতী ড্রোন’। ১০-১২ ফুট লম্বা, ছোট বিমানের মতো দেখতে এই ড্রোনগুলো ৫০ কেজি বিস্ফোরক নিয়ে দেড় থেকে দুই হাজার মাইল দূরের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত আঘাত হানতে পারে। এগুলো মূলত খুব নিচু দিয়ে উড়ে যায় বলে রাডারে ধরা পড়া কঠিন।

এই ড্রোনে ব্যবহৃত ইঞ্জিনগুলো মূলত ঘাস কাটার গাড়ি বা স্কুটারের ইঞ্জিনের মতোই সাধারণ ও সস্তা। দিকনির্দেশনার জন্য এতে বাজারে সহজলভ্য গ্লোবাল নেভিগেশন স্যাটেলাইট সিস্টেম রিসিভার ব্যবহার করা হয়, যা মার্কিন জিপিএস, রুশ গ্লোনাস, ইউরোপীয় গ্যালিলিও কিংবা চীনা বাইডু উপগ্রহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকে। প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে এর যাত্রাপথ নির্ধারণ করা হয়।

একেকটি ড্রোনের উৎপাদন খরচ মাত্র ২০ থেকে ৩০ হাজার ডলার। রাশিয়া, ইউক্রেন ও ইরান—প্রত্যেকেই প্রতিদিন শত শত দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি করছে। ২০২২ সালে ইরান থেকে বিপুল পরিমাণ ‘শহীদ’ ড্রোন আমদানি করে ইউক্রেনে হামলা চালায় রাশিয়া। পরে রাশিয়া এর নিজস্ব সংস্করণ ‘গেরান’ তৈরি শুরু করে।

এখন ইউক্রেন নিজেও ‘বোবার’ নামের নিজস্ব দূরপাল্লার ড্রোন দিয়ে রাশিয়ার অভ্যন্তরে মস্কো, লেলিনগ্রাদসহ দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানছে। বিশেষ করে তেল শোধনাগার, বিমানঘাঁটি ও কারখানায় হামলা চালিয়ে ইউক্রেন রাশিয়ার অর্থনীতি ও সমর ব্যবস্থাকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। উপসাগরীয় যুদ্ধের সময় ইরানও মূলত এই শহীদ ড্রোন দিয়েই মার্কিন ঘাঁটি ও আরব রাষ্ট্রগুলোতে আক্রমণ চালিয়েছে।

দূরপাল্লার আত্মঘাতী ড্রোন যুদ্ধক্ষেত্রে বিপ্লব এনেছে মূলত এর ‘বিনিময় খরচের’ কারণে। যেখানে একটি ড্রোনের খরচ মাত্র ২০ হাজার ডলার, সেখানে তা ধ্বংস করার জন্য ব্যবহৃত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের খরচ কয়েক লাখ থেকে মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। এর সঙ্গে রয়েছে নিচু দিয়ে ওড়া ড্রোন শনাক্তকরণের জন্য বিস্তৃত রাডার ব্যবস্থার বিশাল খরচ। ফলে ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন আক্রমণ করলে প্রতিপক্ষের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দ্রুত ফুরিয়ে যায়।

ইরান যুদ্ধের সময় বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহ সংকটের চেয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছিল অন্য জায়গায়। ইসরায়েল, মার্কিন বাহিনী ও উপসাগরীয় দেশগুলোর আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র দ্রুত ফুরিয়ে আসছিল, যা যুদ্ধ থামানোর অন্যতম বড় কারণ। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, ইউক্রেন যুদ্ধে এখন ড্রোন ঠেকাতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আমলের ভারী মেশিনগান ব্যবহার করা হচ্ছে।

এই সময়ে আরেকটি বিপ্লবাত্মক অস্ত্র হলো ‘ফার্স্ট-পারসন ভিউ’ বা এফপিভি ড্রোন। বর্তমানে ক্যামেরাবাহী ড্রোনের ভিডিও যেভাবে সরাসরি স্মার্টফোনে দেখা যায়, এটি তারই সামরিক রূপ। তবে প্রচলিত ড্রোনের বেতার সংকেত সহজেই জ্যাম বা অকার্যকর করা সম্ভব। তাই এফপিভি ড্রোনে ব্যবহার করা হচ্ছে অত্যন্ত পাতলা ফাইবার অপটিক তার, যা ড্রোনের ক্যামেরাকে সরাসরি নিয়ন্ত্রণকারীর সঙ্গে যুক্ত রাখে। তারের ব্যবহারের কারণে এর পাল্লা ২০ কিলোমিটারের মতো সীমিত হলেও, একে জ্যাম করা অত্যন্ত দুরূহ। সার্বক্ষণিক নিয়ন্ত্রণের সুবিধা থাকায় এই ড্রোন নিখুঁতভাবে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত করতে পারে।

গত কয়েক মাসে ইউক্রেন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে বহু সৈন্য এই এফপিভি ড্রোনের আঘাতে নিহত হয়েছে এবং এর ফলে ফ্রন্টলাইনের গতি থমকে গেছে। অন্যদিকে, লেবানন যুদ্ধে ইরান থেকে পাওয়া এফপিভি ড্রোন দিয়ে হিজবুল্লাহ বাহিনী ইসরায়েলের ট্যাংক, ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ও সৈন্যদের ওপর সফল হামলা চালিয়েছে। গত ১৯ জুন হিজবুল্লাহর এমনই এক এফপিভি ড্রোন হামলায় একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাসহ চার ইসরায়েলি সৈন্য নিহত হয়, যার জেরে পুরো যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।

সস্তা উৎপাদন খরচ ও নিখুঁতভাবে আঘাত হানার ক্ষমতার কারণে আত্মঘাতী ড্রোন এখন তুলনামূলক দুর্বল শক্তির এক অমোঘ অস্ত্রে পরিণত হয়েছে, যা প্রচলিত সামরিক ভারসাম্যকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। ইউক্রেনের চেয়ে রাশিয়া জনসংখ্যা, অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিতে বহুগুণ এগিয়ে আর ইরানের তুলনায় তার প্রতিপক্ষদের সম্মিলিত শক্তির কোনো তুলনাই হয় না। ইতিহাসের প্রতিটি সামরিক বিপ্লব কখনো আক্রমণকারীকে শক্তিশালী করেছে, কখনো প্রতিরক্ষাকারীকে। বর্তমানের ড্রোন প্রযুক্তি মূলত প্রতিরক্ষাকেই বেশি শক্তিশালী করেছে। শক্তির ভারসাম্য বদলে দিয়ে দুর্বলের প্রতিরক্ষাকে শক্তিশালী করার এই ক্ষমতার কারণেই ড্রোন আজ যুদ্ধক্ষেত্রের এক নতুন বিপ্লব।

ড্রোনযুদ্ধের ভবিষ্যৎ কী? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খুব শিগগিরই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ‘এজ কম্পিউটিং’ যুক্ত হয়ে ড্রোনকে আরও ভয়ংকর করে তুলবে। এজ কম্পিউটিং হলো কোনো কেন্দ্রীয় নেটওয়ার্ক বা জিপিএস ছাড়াই ড্রোনের নিজস্ব সিস্টেমের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ফাঁকি দেওয়া এবং নিখুঁতভাবে আক্রমণ করার পদ্ধতি।

যুদ্ধক্ষেত্রের প্রতিটি বিপ্লব প্রযুক্তি, সংগঠন ও কৌশলের মধ্যে এক তীব্র প্রতিযোগিতার জন্ম দেয়। আধুনিক যুগে এই প্রতিযোগিতার চক্র অত্যন্ত দ্রুতগতির। নিজের সার্বভৌমত্ব, অস্তিত্ব ও কর্তৃত্ব রক্ষার জন্য—শক্তিশালী কিংবা দুর্বল—সব রাষ্ট্রের জন্যই যুদ্ধক্ষেত্রের এই পরিবর্তনশীল প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতা সম্পর্কে সজাগ থাকা এবং নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী তা ধারণ করা এখন সময়ের দাবি।

  • সফিকুর রহমান নির্বাহী পরিচালক, বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন)