আমাদের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় দশকের পর দশক ধরে শিক্ষার্থীদের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের বিশ্লেষণাত্মক চিন্তাভাবনা, সুশৃঙ্খল শিক্ষা এবং নিয়মানুবর্তিতা শেখানো হচ্ছে। এসব অবদানকে কোনোভাবেই ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। কিন্তু এখন সময় এসেছে সেই ভিত্তির ওপর নতুন একটি ভিত্তি যোগ করার।

আমি যখন কর্মজীবনের শুরুতে করপোরেট প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি, তখন গ্রাহকদের জানতে ও বুঝতে মাসের পর মাস মাঠপর্যায়ে গবেষণা করেছি। সেই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমি শিখেছি কীভাবে সঠিক প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে পরিবর্তনের ধারা বা নকশা চিনতে হয়। আজ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নানা মাধ্যম সেই সব তথ্য আমাদের সামনে এনে দিচ্ছে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে। ফলে এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দক্ষতাকে বলা যায় সঠিক প্রশ্ন করার ক্ষমতা। আর সেই ক্ষমতাটি এখনো মানুষকেই অর্জন করতে হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় মূলত তরুণদের মনে সেই জিজ্ঞাসার শক্তিটাই তৈরি করে। তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নানা মাধ্যমের প্রয়োগ ও ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের এখনো কিছুটা দুর্বলতা আছে। পাঠ্যক্রমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ যত বাড়াবে, শিক্ষার্থীরা তত দ্রুত এর ভেতরের বিষয়টি বুঝবে।

ভেরিফিকেশনে আটকা, ১৪ হাজার শিক্ষকের অপেক্ষার শেষ কবে

প্রযুক্তিগত দক্ষতা নাকি মানবিক গুণাবলি—

আমার ১৬ বছরের কর্মজীবনে আমি দেখেছি, যে মানুষটা সবচেয়ে ভালো কোড লিখতে পারত, সে-ই সব সময় ঘরের সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ ছিল না। বরং যে মানুষটা একটা সূক্ষ্ম ধারণাকে আকর্ষণীয় গল্পে রূপান্তর করতে পারত, একটা দলকে অনুপ্রাণিত করতে পারত এবং যেকোনো দ্বন্দ্বের সুন্দর সমাধান করতে পারত, দিন শেষে সে-ই পেশাজীবীই সামনে এগিয়ে গেছে। আমি নিজে টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সময় দেখেছি, যারা শুধু প্রযুক্তিগত দিক থেকে দক্ষ ছিল, তারা একটা নির্দিষ্ট সীমানার পর আটকে গেছে। আর যারা প্রযুক্তিগত জ্ঞানের সঙ্গে আবেগপ্রবণ বুদ্ধিমত্তা এবং গভীরভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা মেলাতে পেরেছে, তারাই নেতৃত্বের আসনে বসেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোড লিখতে পারে, উপাত্ত বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু একটা শোকার্ত গ্রাহকের কষ্ট অনুভব করে, সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। একটি মনোবল হারিয়ে ফেলা দলকে আবার বিশ্বাসের জায়গায় ফিরিয়ে আনতে পারে না। কঠোর প্রায়োগিক দক্ষতা আপনাকে কেবল দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতে সাহায্য করবে, কিন্তু মানবিক গুণাবলিই আপনাকে সেই ঘরে টিকিয়ে রাখবে।

শিক্ষার্থীদের বলব, জীবনজুড়ে শিক্ষা মানে শুধু বিশেষ পাঠ্যক্রম বা কোর্স সম্পন্ন করা নয়। জানার আগ্রহকে জীবনের অংশ বানিয়ে নিতে হবে। প্রতিদিন নতুন কিছু জানার ক্ষুধা রাখতে হবে।

এআই কি চাকরির সংকট বাড়াবে—

এই সমস্যাটি আমি খুব কাছ থেকে দেখছি। আর্থিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে আমরা যে কাজের জন্য আগে একজন তরুণকে নিয়োগ দিতাম, সে সাধারণ রিপোর্ট তৈরি বা মিটিং, প্রেজেন্টেশনের নানা বিষয় নিয়ে কাজ করত। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়েই এসব কাজ অনায়াসে হয়ে যাচ্ছে। এটা বাস্তব সত্য, একে অস্বীকার করে কোনো লাভ নেই। তবে এই সংকটের ভেতরেও আমি একটি বড় সুযোগ দেখি। আগে প্রাথমিক স্তরের চাকরি মানেই ছিল শুধু নির্দেশ বাস্তবায়ন করা। এখন প্রাথমিক স্তরের কাজের সংজ্ঞা হওয়া উচিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় কাজ সম্পাদন এবং মানুষের বিচারবুদ্ধির প্রয়োগ। যে নবাগত তরুণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ব্যবহার করে ১০ গুণ দ্রুত কাজ করতে পারছে এবং সেই কাজের ফলাফলে নিজের প্রখর চিন্তাভাবনা যোগ করতে পারছে, সে আর কেবল একজন কনিষ্ঠ কর্মী নয়, সে প্রতিষ্ঠানের নতুন শক্তি। এআইকে চ্যালেঞ্জ মনে না করে, বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকতেই বাস্তব জগতের নানা সমস্যা নিয়ে কাজ করো। ব্যক্তিগত প্রকল্প, স্বেচ্ছাসেবী কাজসহ নানা ধরনের সৃজনশীল প্রতিযোগিতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে একটি বাস্তব সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে যাও।

চাকরির পাশাপাশি পড়াশোনায় তিন বিসিএসে সফল মেহেদী হাসান বললেন, বিসিএস প্রস্তুতির ৬ কৌশল

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো প্রতিপক্ষ নয়—

আমার নিজের কথাই বলি। আমি যখন প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার শুরু করি, আমার মনেও একটা জড়তা ছিল। আমি ভাবছিলাম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কি আমার সৃজনশীলতাকে কেড়ে নেবে? কিন্তু কাজ করতে করতে খুব দ্রুতই বুঝলাম, এটি আসলে আমার সৃজনশীলতাকে বদলে দিচ্ছে না, বরং তাকে কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। আমি এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে একজন মেধাবী কিন্তু অনভিজ্ঞ শিক্ষানবিশ হিসেবে দেখি। সে অনেক কিছু জানলেও তার বাস্তব অভিজ্ঞতা কম। অনেক বিষয় মুখস্থ থাকলেও অনেক কিছু সে এখনো নিজের আয়ত্তে আনতে পারেনি। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে দারুণভাবে নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ আছে। শিক্ষার্থীদের জন্য পরামর্শ হিসেবে বলব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কে জানা মানেই শুধু এই প্রযুক্তিকে সাধারণ চ্যাট করার মাধ্যম ভাবা নয়। কোন পরিস্থিতিতে তাকে ঠিক কোন প্রশ্নটা করতে হবে, সেটা জানাই এখন সবচেয়ে বড় পাওনা।

অস্ট্রেলিয়াতে পড়ার সময় শুনেছিলাম, যেকোনো নতুন দক্ষতা আয়ত্ত করার সময় এখন কমে আসছে। আগে একটা কাজ ভালোভাবে জানতে ও শিখতে ১০ বছর লেগে যেত। এখন হয়তো মাত্র ৩ বছর সময় লাগে। আমি নিজে ১৬ বছরে করপোরেট থেকে টেলিযোগাযোগ, আবার টেলিযোগাযোগ থেকে আর্থিক প্রযুক্তি খাতে নিজের কর্মক্ষেত্র বদলেছি। প্রতিটা বদলের জন্য আমাদের নতুন দক্ষতা শিখতে হয়েছে বা পুরোনো দক্ষতাকে নতুন করে রূপান্তর করতে হয়েছে। প্রতিবারই শেখার তীব্র আগ্রহ আমাকে আগের চেয়ে শক্তিশালী করেছে। আমি নিজের ভয়কে এগিয়ে যাওয়ার জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে শিখেছি।

বুয়েট থেকে বিসিএস: রিভার-কেয়ার একসঙ্গে জয়ী হওয়ার গল্প

শিক্ষার্থীদের বলব, জীবনজুড়ে শিক্ষা মানে শুধু কোনো বিশেষ পাঠ্যক্রম বা কোর্স সম্পন্ন করা নয়। জানার আগ্রহকে জীবনের অংশ বানিয়ে নিতে হবে। প্রতিদিন একটু নতুন কিছু জানার ক্ষুধা মনের মধ্যে রাখতে হবে। আর নিজের চেনা স্বাচ্ছন্দ্যের ঘেরাটোপকে বারবার চ্যালেঞ্জ করা শিখতে হবে, এর চর্চা করতে হবে। একটা কথা মনে রাখুন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আসলে আগামী দিনে আসছে না, এআই এরই মধ্যে চলে এসেছে। প্রশ্ন হলো, তুমি কি তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে হাঁটতে শিখবে, নাকি স্রেফ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তার এগিয়ে যাওয়া দেখবে?