বিএনপির মূল ও অঙ্গসংগঠনের অনেক নেতা সংসদ ও মন্ত্রিসভার দায়িত্বে রয়েছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের ব্যস্ততার কারণে দলটির সাংগঠনিক কার্যক্রমে এক ধরনের স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। এটি কাটিয়ে দলকে পুনরায় চাঙা করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকার পরিচালনার পাশাপাশি তৃণমূলকে শক্তিশালী করতে এবং দ্রুততম সময়ে জাতীয় কাউন্সিল আয়োজনের লক্ষ্যে তিনি মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটিগুলো পুনর্গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন। এরই অংশ হিসাবে খুব শিগগিরই কেন্দ্রীয় নেতারা সাংগঠনিক সফরে বের হবেন এবং ত্যাগী ও তরুণদের নেতৃত্বে এনে দলকে আগামী দিনের জন্য প্রস্তুত করবেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একজন শীর্ষ নেতা জানান, গত সাড়ে চার মাসে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে সরকারকে একটি স্থিতিশীল ও সুদৃঢ় অবস্থানে নিয়ে এসেছে বিএনপি। কোথায় কী পদক্ষেপ নিতে হবে এবং প্রশাসন কীভাবে চালাতে হবে, তা এখন নীতিনির্ধারকদের পুরোপুরি নখদর্পণে। সরকারের ভিত মজবুত করার পর এবার দলের দিকে পূর্ণ মনোযোগ দিচ্ছেন তারেক রহমান।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির প্রবীণ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন যুগান্তরকে বলেন, সরকার পরিচালনার পাশাপাশি দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। সংসদীয় কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হয়েছে। এখন কেন্দ্র থেকে তৃণমূল গোছানো হবে। তবে জাতীয় কাউন্সিলের দিনক্ষণ এখনো নির্ধারণ হয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, দল গোছানোর কাজ চলছে। বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে।

দলীয় সূত্র জানায়, শনিবার রাতে ঢাকা জেলা বিএনপি, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তারেক রহমান। সেখানে দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে গতি আনা, শৃঙ্খলা রক্ষা, তৃণমূল পর্যায়কে আরও শক্তিশালী ও দলীয় ঐক্য সুসংহত করা এবং জনগণের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ বাড়ানোর নির্দেশনা দেন তিনি। একই সঙ্গে সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সহযোগিতার কথা বলেন।

জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হলে ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপি এবং অন্যান্য অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গেও তারেক রহমানের বৈঠক হতে পারে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য মহানগর ও জেলা বিএনপির নেতাদের সঙ্গেও তার বৈঠক করার কথা রয়েছে।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক রফিকুল আলম মজনু যুগান্তরকে বলেন, দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। তিনি আমাদের নেতাকর্মীদের খোঁজ নেন এবং সাংগঠনিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। দলকে শক্তিশালী করার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।

তবে বৈঠক সূত্র জানায়, তারেক রহমান স্পষ্টভাবে বলেছেন, অনেক কমিটি মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এসব কমিটিকে পুনর্গঠিত করতে হবে এবং যেখানে সম্ভব কাউন্সিলের মাধ্যমে নেতৃত্ব নির্বাচন করতে হবে। এতে সংগঠন আরও গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য হবে।

এদিকে বিএনপির সর্বশেষ জাতীয় কাউন্সিল হয়েছিল ২০১৬ সালের মার্চে। নিয়ম অনুযায়ী তিন বছর পরপর কাউন্সিল হওয়ার কথা থাকলেও এক দশকেও তা হয়নি। তবে এই সময়ে নির্বাহী কমিটিতে একাধিকবার পরিবর্তন আনা হয়েছে, যুক্ত হয়েছে নতুন মুখ। কেউ পদোন্নতি পেয়েছেন, আবার কেউ দায়িত্ব থেকে সরে গেছেন।

বর্তমানে বিএনপির ৮২টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে বেশির ভাগ কমিটিই মেয়াদোত্তীর্ণ। দলটির ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের মধ্যে ১০টি কমিটির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। কোথাও তিন বছর, কোথাও পাঁচ বছর, আবার কোথাও এক যুগ ধরে একই কমিটি বহাল রয়েছে। সাংগঠনিক ইউনিটের শীর্ষ অনেক নেতা সরকারের এমপি-মন্ত্রী। কেউ কেউ মনে করছেন, এতে সংগঠনের কার্যক্রমে কার্যত স্থবিরতা তৈরি হয়েছে এবং নতুন নেতৃত্ব তৈরির পথও সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

কয়েকজন সংসদ-সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতা জানান, সরকারের পাশাপাশি দল পুনর্গঠনে জোর দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিএনপিসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়, ত্যাগী ও অপেক্ষাকৃত তরুণ রাজপথমুখী নেতাদের নেতৃত্বে আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে নেতৃত্ব নির্বাচনের কথাও বলছেন কেউ কেউ।

সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া মারা যাওয়ার পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে বিএনপি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন তারেক রহমান। দলের শীর্ষ পদে থেকেই প্রথমবার নির্বাচনে সাফল্য দেখিয়েছেন তিনি। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় এনে জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

এদিকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ স্থায়ী কমিটির অনেক সদস্য ও কেন্দ্রীয় নেতারা সরকারের মন্ত্রণালয় সামলাচ্ছেন। দলের যেসব নেতা সংসদ-সদস্য হয়েছেন, তারাও সংসদীয় কাজে ব্যস্ত রয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুততম সময়ে দল পুনর্গঠন করতে চান বিএনপি চেয়ারম্যান।

বিএনপির একাধিক সূত্র জানিয়েছে, এ বছর না হলে আগামী বছরের শুরুতে দলের কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে। তার আগে জেলা ও মহানগর পর্যায়ে কাউন্সিলের মধ্য দিয়ে দল পুনর্গঠন করার কথা রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একজন মন্ত্রী ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বলেন, সরকারের মেয়াদ সাড়ে চার মাস অতিবাহিত হয়েছে। সময়ের সঙ্গে কার্যক্রম বাড়ছে। সরকারে মন্ত্রী-এমপিদের ব্যস্ততাও বেড়েছে। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান চাচ্ছেন রাষ্ট্রীয় কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি দ্রুত সময়ে দলকে সুসংগঠিত করতে এবং সেই অনুযায়ী কার্যক্রমও শুরু করেছেন তিনি।

দলের নেতারা বলছেন, জাতীয় কাউন্সিল ও সংগঠনগুলোর কমিটি পুনর্গঠন করার আভাসে নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। অঙ্গসংগঠনগুলোর মধ্যে চাঙা ভাব এসেছে। এটি দলে গতি সঞ্চারে ভূমিকা রাখবে এবং দল সাংগঠনিকভাবে শক্তিশালী হবে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গত এপ্রিলের শুরুতে সাংবাদিকদের বলেছেন, জাতীয় কাউন্সিল করতে অন্তত কয়েক মাস লাগবে। তারা খুব দ্রুত দলকে কাউন্সিলের দিকে নেওয়ার চেষ্টা করবেন।