যক্ষ্মা, এইচআইভি–এইডস ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি পুষ্টিসহায়তা দিতে নতুন উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত একটি প্রকল্পের আওতায় এসব রোগীর মধ্যে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের মাসে ৮২০ টাকা করে দেওয়া হবে। যক্ষ্মার রোগীরা ছয় মাস এবং এইচআইভি ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা এক বছর এই সহায়তা পাবেন।

এই তিন রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের পুষ্টি সহায়তায় মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১৭ কোটি টাকা। ‘বাংলাদেশে যক্ষ্মা (টিবি), এইচআইভি–এইডস ও ম্যালেরিয়া মোকাবিলায় সমন্বিত স্বাস্থ্যব্যবস্থা জোরদারকরণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৪ হাজার ৩৯ কোটি টাকা। আগামীকাল বুধবার জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে।

প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৪ হাজার ৩৯ কোটি টাকার মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা গ্লোবাল ফান্ড দেবে ৮৭০ কোটি টাকা।

প্রকল্পের আওতায় প্রায় ১০ লাখ যক্ষ্মারোগীকে শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনা, এইচআইভি পরীক্ষার পরিধি বাড়ানো ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি কম্পিউটার সফটওয়্যার, সেমিনার-সম্মেলন, পরামর্শক ও আউটসোর্সিংয়ের মতো খাতেও বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব রাখা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ প্রথম আলোকে বলেন, অপারেশন প্ল্যান কিংবা প্রকল্প, কোনোটি তিন বছরের জন্য; আবার কোনোটি পাঁচ বছরের জন্য। কিন্তু এ তিনটি রোগের একটি স্থায়ী সমাধান থাকা উচিত। সে জন্য প্রকল্প বা ওপি থেকে বের হয়ে এসে সরকারি বিদ্যমান চিকিৎসাসেবার সঙ্গে এ তিনটি সেবাকে কীভাবে একীভূত করা যায়, সে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এটি করতে না পারলে দেখা গেল এ প্রজেক্টটি তিন বছর পর শেষ হয়ে গেল, নতুন প্রকল্প নিতে সময় লাগে। তখন রোগীর চিকিৎসাসেবা পেতে সমস্যা হয়।

যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও এইডস রোগীদের পুষ্টিকর খাবারের জন্য জনপ্রতি ৮২০ টাকা দেওয়ার উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এখন শুধু এইচআইভি এইডস রোগীদের পুষ্টিকর খাবারের জন্য কিছু টাকা দেওয়া হয়। তবে সমস্যা হচ্ছে মাসওয়ারি যাদের টাকা দেওয়া হবে, অতীত অভিজ্ঞতা দেখা যায় তাঁরা পুষ্টিকর খাবারের জন্য এই টাকা খরচ করেন না। অন্য খাতে এ টাকা খরচ করেন। তাই সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে পুষ্টিকর খাবারের জন্য দেওয়া টাকা যাতে এই খাতে খরচ হয়, সেটি নিশ্চিত করা।

মোহাম্মদ খায়রুজ্জামান, পরিচালক (এইডস), স্বাস্থ্য অধিদপ্তরবর্তমানে ২৩ জেলায় এইচআইভি পরীক্ষার সেবা রয়েছে। নতুন রোগী শনাক্তের প্রবণতা বাড়ায় পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ কারণে প্রতিটি জেলা সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

৪০৩৯ কোটির প্রকল্পে সরকার দেবে ৩১৬৯ কোটি টাকা

প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ৪ হাজার ৩৯ কোটি টাকার মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৩ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা এবং উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা গ্লোবাল ফান্ড দেবে ৮৭০ কোটি টাকা। প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৪৩০ কোটি টাকার চিকিৎসাসামগ্রী কেনার প্রস্তাব রয়েছে। এর মধ্যে ওষুধ ও টিকা কিনতে ব্যয় হবে ৯৫৯ কোটি টাকা। ল্যাবরেটরি উপকরণে ৮০ কোটি এবং চারটি লটে জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রী কিনতে ৪০ কোটি টাকা ব্যয় হবে। ভবন ও স্থাপনা নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালে।

প্রকল্পের প্রধান লক্ষ্য যক্ষ্মা, এইচআইভি ও ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুহার কমানো। এর জন্য রোগ প্রতিরোধ, দ্রুত শনাক্তকরণ, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ প্রকল্পের আওতায় কম্পিউটার সফটওয়্যার কিনতে ৫৬ কোটি টাকা, ভ্রমণে ১০ কোটি, সেমিনার ও কনফারেন্সে ৫৩ কোটি, পরামর্শক খাতে ৪১ কোটি, আউটসোর্সিংয়ে ১৫৮ কোটি এবং প্রশিক্ষণে ৭১ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে বর্তমানে এইচআইভিতে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার ৭০০। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসাধীন ৯ হাজার ৪০০ এইচআইভি আক্রান্ত ব্যক্তিকে ১ বছর ধরে মাসে ৮২০ টাকা করে পুষ্টিসহায়তা দেওয়া হবে।

৬৪ জেলাতেই এইচআইভি শনাক্ত

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের জাতীয় এইডস ও এসটিডি নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ১ হাজার ৮৯১ জন নতুন করে এইচআইভিতে সংক্রমিত হয়েছেন। এটি দেশে এক বছরে নতুন এইচআইভি সংক্রমণের সর্বোচ্চ সংখ্যা। একই সময়ে এইডসে মারা গেছেন ২১৯ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে বর্তমানে এইচআইভিতে সংক্রমিত মানুষের সংখ্যা প্রায় ১৭ হাজার ৭০০। প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসাধীন ৯ হাজার ৪০০ এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তিকে এক বছর ধরে মাসে ৮২০ টাকা করে পুষ্টিসহায়তা দেওয়া হবে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত বছর দেশের ৬৪ জেলাতেই নতুন এইচআইভি সংক্রমিত ব্যক্তি শনাক্ত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি শনাক্ত হয়েছে মুন্সিগঞ্জে। এরপর রয়েছে ফেনী, নড়াইল, নওগাঁ ও মাদারীপুর।

জনস্বাস্থ্যবিদ, চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অসচেতনতা, যৌনতা নিয়ে ভুল ধারণা এবং সুরক্ষাসামগ্রী ব্যবহারের বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকার কারণে তরুণদের মধ্যে এইচআইভির সংক্রমণ বাড়ছে। অবিবাহিত কিশোর ও তরুণদের মধ্যেও এইচআইভি শনাক্তের হার বাড়ছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (এইডস) মোহাম্মদ খায়রুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে ২৩ জেলায় এইচআইভি পরীক্ষার সেবা রয়েছে। নতুন শনাক্তের প্রবণতা বাড়ায় পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা বাড়ানোর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ কারণে প্রতিটি জেলা সরকারি হাসপাতালে এইচআইভি পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় সব জেলা হাসপাতালে এইচআইভির ওষুধের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং পরীক্ষা করার ব্যবস্থা করা হবে বলেও জানিয়েছেন তিনি।

চিকিৎসা পাবে ১০ লাখ যক্ষ্মারোগী

প্রস্তাবিত প্রকল্পের আওতায় ৯ লাখ ৮৭ হাজার ৭১৮ জন যক্ষ্মারোগীকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করে চিকিৎসাসেবার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। আর চিকিৎসাধীন ৮ লাখ ২৪ হাজার রোগীকে ছয় মাস ধরে পুষ্টিসহায়তা দেওয়া হবে।

প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যক্ষ্মা এখনো বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। দেশটি বিশ্বের ৩০টি উচ্চ যক্ষ্মা ঝুঁকিপূর্ণ দেশের একটি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গত বছরের বৈশ্বিক যক্ষ্মা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি লাখে আনুমানিক ২২১ জনের যক্ষ্মা শনাক্ত হয়। প্রতিবছর এ রোগে প্রায় ৪৪ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। যক্ষ্মার সংক্রমণ এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়েছে।

যক্ষ্মা শনাক্তে মলিকুলার ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। আক্রান্ত ব্যক্তিদের নিরবচ্ছিন্ন ওষুধ সরবরাহও প্রকল্পের অন্যতম লক্ষ্য।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ওপি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে এই তিন রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ম্যালেরিয়ার ৯০ শতাংশই তিন পার্বত্য জেলায়

বাংলাদেশে ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা ২ কোটি ৭২ লাখ। অর্থাৎ দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ ম্যালেরিয়ার ঝুঁকিতে আছে। দরিদ্র, প্রান্তিক, দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী এ রোগে বেশি আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে।

প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ম্যালেরিয়া এখন মূলত এলাকাভিত্তিক রোগে পরিণত হয়েছে। গত বছর দেশের মোট ম্যালেরিয়া রোগীর প্রায় ৯০ শতাংশই শনাক্ত হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায়। এর মধ্যে বান্দরবানে ৪৯ শতাংশ এবং রাঙামাটিতে ৩৬ শতাংশ রোগী শনাক্ত হয়েছে।

২০২৯ সালের মধ্যে ম্যালেরিয়ায় মৃত্যু শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে প্রকল্পটিতে। ম্যালেরিয়া ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর প্রতি ১ হাজার মানুষের মধ্যে বছরে আক্রান্তের হার একের নিচে নামিয়ে আনার পরিকল্পনাও করা হয়েছে।

এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ৮৩০ জনকে ১২ মাস ধরে মাসে ৮২০ টাকা করে পুষ্টিসহায়তা দেওয়া হবে। পাশাপাশি ম্যালেরিয়া প্রতিরোধে মশারি বিতরণও করা হবে।

দাতা-নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি অর্থায়ন

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া ও এইডস নিয়ন্ত্রণের কর্মসূচি প্রায় ৩০ বছর ধরে উন্নয়ন সহযোগীদের সহায়তায় পরিচালিত হয়ে আসছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এসব কর্মসূচি অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে পরিচালিত হতো।

ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ওপি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে এই তিন রোগের পরীক্ষা ও চিকিৎসাসেবা অনেকটা স্থবির হয়ে পড়ে বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

বর্তমান সরকার ওপির পরিবর্তে প্রকল্পের মাধ্যমে যক্ষ্মা, এইচআইভি ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি চালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন সহযোগীদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরকারি রাজস্ব বা জিওবি অর্থায়নে এসব কর্মসূচি পরিচালনার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, এনজিও, গণমাধ্যম ও বিভিন্ন কমিউনিটির সহযোগিতা নেওয়া হবে।