উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ঋণের চড়া সুদ এবং অর্থনৈতিক চাপের মধ্যেও দেশে ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, ক্রেডিট কার্ড ও অন্যান্য ব্যক্তিগত ব্যয় মেটাতে মানুষ আগের তুলনায় বেশি ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। একই সঙ্গে করপোরেট ঋণের তুলনায় ব্যাংকগুলোও খুচরা বা ভোক্তা ঋণ বিতরণে বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ভোক্তা ঋণের স্থিতি ছিল ১ লাখ ৫১ হাজার ৭৩৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের মার্চ শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৩৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকায়। অর্থাৎ, মাত্র তিন মাসে ভোক্তা ঋণ বেড়েছে ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা।
এক বছরের ব্যবধানেও ভোক্তা ঋণে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চ শেষে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে এ খাতে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।
আরও পড়ুন
ইলেকট্রিক গাড়িতে বাড়লো ঋণ সুবিধা, ব্যক্তিগত ঋণের সীমাও বৃদ্ধি
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি-মার্চ প্রান্তিকে ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে আবাসন, বেতননির্ভর ঋণ, ক্রেডিট কার্ড, জমি কেনা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি।
২০২৫ সালের মার্চ শেষে ভোক্তা ঋণের পরিমাণ ছিল প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। সেই হিসাবে এক বছরে এ খাতে ঋণ বেড়েছে প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা।—বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্চ শেষে ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার কোটি টাকায়, যা গত ডিসেম্বর শেষে ছিল ৩১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা। একই সময়ে বেতননির্ভর ঋণ বেড়ে ২২ হাজার ৫৯৫ কোটি থেকে ২৩ হাজার ২৩৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে নেওয়া ঋণও বেড়েছে। গত ডিসেম্বর শেষে এ ঋণের পরিমাণ ছিল ১৩ হাজার ১০৩ কোটি, যা চলতি বছরের মার্চ শেষে বেড়ে হয়েছে ১৩ হাজার ৫১৯ কোটি টাকা। এতে স্বল্পমেয়াদি ব্যক্তিগত ব্যয় মেটাতে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের প্রবণতা অব্যাহত থাকার ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
এদিকে, জমি কেনার ঋণ ৬ হাজার ৯৩৬ কোটি থেকে বেড়ে ৭ হাজার ১৮১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। মোটরগাড়ি ও মোটরসাইকেল কেনার ঋণও ৬ হাজার ৮৫ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ৬ হাজার ৩৭৪ কোটি টাকা।
আরও পড়ুন
সার্বিকভাবে বাজেট ভোক্তা ও বিনিয়োগবান্ধব: আহসান খান চৌধুরী
সবচেয়ে বেশি প্রবৃদ্ধি হয়েছে স্থায়ী আমানত (এফডিআর) ও অন্যান্য সঞ্চয়পত্রের বিপরীতে নেওয়া ব্যক্তিগত ঋণে। এ ধরনের ঋণের পরিমাণ ২২ হাজার ৫৯১ কোটি থেকে বেড়ে ২৭ হাজার ৬২৫ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
এছাড়া চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের ঋণ ১ হাজার ৩৮ কোটি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৬৩ কোটি টাকা হয়েছে। প্রভিডেন্ট ফান্ডের বিপরীতে ঋণ ১ হাজার ৭৫০ কোটি থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৮৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। অন্যান্য ব্যক্তিগত ঋণও বেড়ে ২ হাজার ৯৯০ কোটি থেকে ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি দুর্বল এবং করপোরেট ঋণে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক এখন ভোক্তা অর্থায়নের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এ ধরনের ঋণ দ্রুত বিতরণ করা যায় এবং ঋণ পোর্টফোলিওতেও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব।—আরিফ হোসেন খান
তবে টেলিভিশন, রেফ্রিজারেটর, কম্পিউটারসহ গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি কেনার ঋণ কিছুটা কমেছে। ডিসেম্বর শেষে এ খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৪ হাজার ৬৬২ কোটি, যা মার্চ শেষে কমে ৩৪ হাজার ৫৩৫ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
ব্যাংকারদের মতে, ভোক্তা ঋণ এখন আর শুধু গৃহস্থালি পণ্য কেনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অনেক পরিবার শিক্ষা, চিকিৎসা, বিয়ে, ভ্রমণ ও পেশাগত ব্যয় নির্বাহেও ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভর করছে। উচ্চ সুদের হার থাকা সত্ত্বেও চাহিদা স্থিতিশীল থাকায় ব্যাংকগুলোও এ খাতে অর্থায়ন বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জাগো নিউজকে বলেন, স্বল্প অঙ্কের ঋণের চাহিদা বৃদ্ধি এবং ব্যাংকগুলোর আগ্রাসী বিপণন কার্যক্রম ভোক্তা ঋণের ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের গতি দুর্বল এবং করপোরেট ঋণে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ায় অনেক ব্যাংক এখন ভোক্তা অর্থায়নের দিকে বেশি ঝুঁকছে। এ ধরনের ঋণ দ্রুত বিতরণ করা যায় এবং ঋণ পোর্টফোলিওতেও বৈচিত্র্য আনা সম্ভব।
আরও পড়ুন
‘ভিসিয়াস সাইকেলে’ আটকে গেছে দেশের অর্থনীতি
তবে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেন, ভোক্তা ঋণ স্বল্পমেয়াদে পরিবারগুলোকে আর্থিক সহায়তা দিলেও এর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা দীর্ঘমেয়াদে ঋণের বোঝা বাড়াতে পারে। উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে যদি ঋণের বড় অংশ ভোগ ব্যয়ে চলে যায়, তাহলে তা বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
উৎপাদনশীল খাতে ঋণের তুলনায় ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি হলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ, খেলাপি ঋণের ঝুঁকি এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।—এম হেলাল আহমেদ জনি
ব্যাংক খাত বিশ্লেষক ও গবেষণাভিত্তিক থিংক ট্যাংক ‘চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ’র রিসার্চ ফেলো এম হেলাল আহমেদ জনি জাগো নিউজকে বলেন, ভোক্তা ঋণের ধারাবাহিক বৃদ্ধি একদিকে মানুষের ব্যয় নির্বাহে ব্যাংক ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে করপোরেট ঋণের তুলনায় ব্যাংকগুলোর খুচরা ঋণে বেশি মনোযোগেরও প্রতিফলন।
তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক পরিবার শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও আবাসনের মতো প্রয়োজনীয় ব্যয় মেটাতে ঋণ নিচ্ছে। তবে উৎপাদনশীল খাতে ঋণের তুলনায় ভোক্তা ঋণের প্রবৃদ্ধি বেশি হলে ভবিষ্যতে ঋণ পরিশোধের চাপ, খেলাপি ঋণের ঝুঁকি এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
‘তাই ভোক্তা ঋণের পাশাপাশি উৎপাদনমুখী বিনিয়োগে ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং ঋণের মান পর্যবেক্ষণে ব্যাংকগুলোকে আরও সতর্ক থাকতে হবে’—যোগ করেন এ ব্যাংক খাত বিশ্লেষক।
ইএআর/এমকেআর/ এমএফএ








