চব্বিশের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় পেরিয়ে বেঁচে আছেন ঠিকই, কিন্তু তার শরীরে ও চোখে রয়ে গেছে ক্ষতচিহ্ন। জয়পুরহাটের জুলাই যোদ্ধা রাকিবুল হাসান রকির ডান চোখ ও শরীরের বিভিন্ন অংশে এখনো বিঁধে আছে অর্ধশত গুলির ছররা। দেশের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চোখের ভেতরে থাকা এই ছররা গুলি অপসারণ এখানে সম্ভব নয়। এর জন্য দ্রুত বিদেশে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। কিন্তু সময়মতো চিকিৎসা না হওয়ায় রকির ডান চোখটি ইতোমধ্যে পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেছে। এখন ভেতরে থাকা গুলির কারণে ভালো থাকা বাম চোখটিও অন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কায় দিন কাটছে তার।
জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে জয়পুরহাট জেলায় ৪ জন শহীদ এবং ৮৬ জন আহত হন। কেউ হাত হারিয়েছেন, কেউ পা, আর কেউ বা রকির মতো হারিয়েছেন চোখের আলো। জয়পুরহাট জেলা শহরের পূর্ব জানিয়ার বাগান মহল্লার দরিদ্র হোটেল কর্মচারী মোখলেসুর রহমানের ছেলে রাকিবুল হাসান রকি (২৬)। পরিবারের অভাব-অনটন ঘোচাতে পড়াশোনা শেষ না করেই নারায়ণগঞ্জের একটি টেক্সটাইল মিলে চাকরি নিয়েছিলেন। কিন্তু স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তীব্র হলে মিলটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপরই রকি বাড়ি ফিরে বন্ধুদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আন্দোলনে যোগ দেন।
বিজয় লাভের মাত্র একদিন আগে, উত্তাল ৪ আগস্ট জয়পুরহাট জিরো পয়েন্ট এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলের প্রথম সারিতে ছিলেন রকি। হঠাৎ পুলিশের ছোড়া গুলিতে তার চোখ ও শরীর ক্ষতবিক্ষত হয়। ৬৫টি গুলির ছররা নিয়ে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। স্থানীয়রা তাকে উদ্ধার করে প্রথমে জয়পুরহাট ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে এবং পরে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে ভর্তি করেন। সেখানে এক মাস চিকিৎসা শেষে চিকিৎসকরা জানান, তার ডান চোখটি পুরোপুরি নষ্ট হয়ে গেছে এবং বাম চোখটি বাঁচাতে হলে দ্রুত বিদেশে নিতে হবে।
আহত জুলাই যোদ্ধা রকি তার বর্তমান অবস্থা নিয়ে বলেন, ‘আমার ভালো থাকা বাম চোখটি এখন প্রায়ই খচখচ করে, পানি পড়ে এবং তীব্র জ্বালা-যন্ত্রণা হয়। একনাগাড়ে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না।’
জুলাই ফাউন্ডেশন ও স্থানীয় বিভিন্ন সংস্থা থেকে কয়েক লাখ টাকার আর্থিক সহায়তা পেলেও ঢাকায় চিকিৎসা ও যাতায়াত খরচেই তা শেষ হয়ে গেছে। রকির বাবা মোখলেসুর রহমান বলেন, আমাদের নিজস্ব বাড়ি নেই, ভাড়ায় থাকি। ছেলের চিকিৎসার পেছনে ঢাকা দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে আমার হোটেলের চাকরিটাও চলে গেছে। রকিও এখন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কোনো কাজ করতে পারছে না। পাঁচজনের সংসারে এখন দুবেলা-দুমুঠো অন্ন জোগানোই যেখানে অসম্ভব, সেখানে ছেলেকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য আমাদের কোথায়?
এ অবস্থায় রকির পরিবার বর্তমান সরকারের কাছে রকিকে দ্রুত বিদেশে নিয়ে সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা এবং এই অসহায় পরিবারের পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছে। রকির পরিবার সূত্রে জানা গেছে, সরকারি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে ঢাকায় জুলাই ফাউন্ডেশনে আবেদন করা হয়েছে। জয়পুরহাটের জেলা প্রশাসক মো. আল মামুন মিয়া নিশ্চিত করেছেন, রকির বিদেশে চিকিৎসার আবেদনটি যথাসময়ে জুলাই ফাউন্ডেশনে পাঠানো হয়েছে। রকি জানান, জুলাই ফাউন্ডেশন তার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাপত্র ও কাগজপত্র জমা দিতে বলেছে। আগামী সপ্তাহে ঢাকায় জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ করে তিনি সব কাগজপত্র জমা দেবেন।








