সামিন ইয়াসার
প্রযুক্তি খাতে চলতি বছরের অন্যতম বড় ছাঁটাইয়ের ঘোষণা দিল মাইক্রোসফট। গত সোমবার (৬ জুলাই) প্রতিষ্ঠানটি জানায়, একযোগে ৪ হাজার ৮০০ কর্মীকে ছাঁটাই করা হচ্ছে, যা তাদের মোট বৈশ্বিক জনবলের প্রায় ২ দশমিক ১ শতাংশ। ছাঁটাইয়ের আগে মাইক্রোসফটের কর্মীসংখ্যা ছিল প্রায় ২ লাখ ২০ হাজার।
এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রতিষ্ঠানটির দুর্বল শেয়ারবাজার পারফরম্যান্স। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যে মাইক্রোসফটের শেয়ার দরই সবচেয়ে বেশি কমেছে, প্রায় ১৯ থেকে ২৩ শতাংশ যা ২০২২ সালের পর প্রতিষ্ঠানটির সবচেয়ে খারাপ অর্ধবার্ষিক ফল। এই সময়ে বাজারমূল্য থেকে উবে গেছে প্রায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার।
একই সঙ্গে এআই অবকাঠামো নির্মাণে মাইক্রোসফটের ব্যয় রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছেছে; ২০২৬ সালের জন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১৯০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের পূর্বাভাস দিয়েছিল, যা বিশ্লেষকদের প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওয়াল স্ট্রিটের চাপ বাড়ছিল প্রতিষ্ঠানের ওপর।
আরও পড়ুন
এআইকে চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা বিপজ্জনক
ছাঁটাইয়ের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে এক্সবক্স গেমিং বিভাগে। ঘোষিত ৪ হাজার ৮০০ পদের মধ্যে ১ হাজার ৬০০টিই এই বিভাগের, আর চলতি ২০২৭ অর্থবছর শেষে বিভাগটিতে মোট ছাঁটাই ৩ হাজার ২০০ জনে পৌঁছাতে পারে বলে জানানো হয়েছে, যা এক্সবক্সের বৈশ্বিক জনবলের প্রায় ২০ শতাংশ। এর পাশাপাশি চারটি গেমিং স্টুডিওকে নতুন মালিকানার কাছে হস্তান্তর করছে মাইক্রোসফট।
বিভাগটির আর্থিক অবস্থাও এই সিদ্ধান্তের একটি বড় কারণ: এক্সবক্সের মুনাফার হার নেমে এসেছে মাত্র ৩ শতাংশে, আর অ্যাক্টিভিশন ব্লিজার্ড কিং বাদ দিলে গত পাঁচ বছরে কনটেন্ট, প্ল্যাটফর্ম ও হার্ডওয়্যার খাতে ২০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ সত্ত্বেও বিভাগটির বার্ষিক আয় বরং প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার কমেছে। ডাটা সেন্টারের চাহিদায় মেমোরি চিপের দাম বেড়ে যাওয়ায়, চাহিদা কম থাকা সত্ত্বেও এক্সবক্স কনসোলের দামও বাড়াতে বাধ্য হয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
মাইক্রোসফটের ওয়াশিংটন অঙ্গরাজ্যের সদর দপ্তরে এবারের ছাঁটাই তুলনামূলক সীমিত প্রায় ৬০০ কর্মী। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ২০০। নিয়মিত নিয়োগ চলমান থাকায় অঙ্গরাজ্যটিতে প্রতিষ্ঠানের মোট কর্মীসংখ্যা প্রায় ৫২ হাজারেই স্থিতিশীল থাকবে বলে জানানো হয়েছে।
মাইক্রোসফট অবশ্য এই ছাঁটাইকে সরাসরি এআই-চালিত জনবল প্রতিস্থাপন হিসেবে স্বীকার করেনি। প্রধান পিপল অফিসার অ্যামি কোলম্যান কর্মীদের উদ্দেশে বার্তায় লেখেন-আজ যেসব পদ বিলুপ্ত হয়েছে, সেগুলো এআই দিয়ে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে না, যদিও এআই সামগ্রিকভাবে কাজ করার পদ্ধতি বদলে দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ও ভাইস চেয়ার ব্র্যাড স্মিথ বিষয়টিকে ব্যবসায়িক প্রয়োজনীয়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তার ভাষায়-একটি প্রতিষ্ঠান তখনই ভালো নিয়োগকর্তা থাকতে পারে, যখন তার ব্যবসা সফল থাকে।
আরও পড়ুন
অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মডেল আনছে মাইক্রোসফট
মাইক্রোসফটের এই পদক্ষেপ বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়। চলতি বছরের শুরুতেই প্রতিষ্ঠানটি তার যুক্তরাষ্ট্রের কর্মীবাহিনীর প্রায় ৭ শতাংশ বা ৯ হাজার কর্মীকে স্বেচ্ছা অবসর প্যাকেজের প্রস্তাব দিয়েছিল, আর গত বছর (২০২৫) বসন্ত ও গ্রীষ্মে দুই দফায় ছাঁটাই করেছিল ১৫ হাজারের বেশি কর্মী যা ছিল গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছাঁটাই। সাধারণত অর্থবছর শেষ হওয়া জুন মাসের কাছাকাছি সময়ে নতুন বছরের ব্যয় পরিকল্পনা সাজাতে গিয়ে কর্মী ছাঁটাই করে থাকে প্রতিষ্ঠানটি।
বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, এআই অবকাঠামোয় বিনিয়োগ থেকে দ্রুত ফল দেখানোর চাপ গোটা প্রযুক্তি খাতেই ছাঁটাইয়ের ঢেউ তৈরি করছে। চলতি বছর বিগ টেক কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত এআই ব্যয় ৭০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে। মাইক্রোসফটের পাশাপাশি অ্যামাজন ও মেটা প্ল্যাটফর্মসও চলতি বছর হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই করেছে; এক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধেই ওরাকল, মেটা, মাইক্রোসফট ও স্যামসাংসহ বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার কর্মী চাকরি হারিয়েছেন।
লেখক: প্রযুক্তি লেখক ও পোস্ট-কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি গবেষক।
কেএসকে




