মাটির প্রদীপের আলো কতটুকুই–বা ছড়ায়; কিন্তু সেই সলতে যদি কেউ বুকের রক্ত দিয়ে ভেজায়, তবে তার শিখা অনির্বাণ হয়ে জ্বলে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলার নিভৃত সুহাতা গ্রামে কান পাতলে আজ যে বইয়ের পাতার মৃদু গুঞ্জন শোনা যায়, তার পেছনে রয়েছে এক বুকচেরা দীর্ঘশ্বাস আর সীমাহীন জেদ। জাতে মাতাল তালে ঠিক, ঘোর অভাবের সংসারে খাবি খেয়েও এক যুবক আস্ত একটা গাঁয়ের মানুষের চোখের পাতা খুলে দিয়েছেন। তাঁর নাম স্বপন মিয়া। আর তাঁর সেই সাধনার ধন হলো গুঞ্জন পাঠাগার।
স্বপনের জীবনের শুরুটা কিন্তু ডালভাত ছিল না। মাত্র দেড় বছর বয়সে পিতৃহীন হওয়া এই ছেলের মাথার ওপর ছিল না কোনো বড় ছাদ। তিন সন্তানের অন্ন জোগাতে মা রাজিয়া খাতুন মাটি কাটার ঝুড়ি মাথায় তুলে নিয়েছিলেন। বড় দুই ভাই রিকশার হ্যান্ডেল ধরে দিন আনে দিন খায়। সংসারে কোনোমতে জোড়াতালি দিচ্ছিলেন। ঘরের কনিষ্ঠ ছেলে স্বপনকে যখন ভাইয়েরা বললেন পড়াশোনার পাট চুকিয়ে দুই পয়সা কামাই করতে, স্বপন তখন উল্টো পিঠে হাঁটা ধরলেন। ঘরের মায়া কাটালেন, কিন্তু বইয়ের মলাট হাতছাড়া করলেন না। রত্নগর্ভা মা–ও ছেলের এই পাগলামিকে বুক দিয়ে আগলে রাখলেন। নিজের বসতভিটার সোয়া ২ শতাংশ জমি লিখে দিলেন স্বপনের নামে, আর এনজিও থেকে ধার করে আনলেন আট হাজার টাকা। ব্যস, ২০০৪ সালের ৩০ মার্চ সামান্য টিনের একচালা ঘরে মাত্র তিনটা বই সম্বল করে শুরু হলো ‘এসো বই পড়ি, আলোকিত সমাজ গড়ি’র এক নতুন অধ্যায়।
পাখিরা কেন অপটিক্যাল ফাইবার দিয়ে বাসা বানাচ্ছেনুন আনতে পান্তা ফুরানোর সেই দিনগুলোয় এই যজ্ঞ টিকিয়ে রাখা ছিল আকাশের চাঁদ হাতে পাওয়ার মতো কঠিন। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়—এ প্রবাদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে স্বপন নেমে পড়লেন জীবনযুদ্ধে। কখনো মোড়ে মোড়ে পান সিগারেটের ডালা নিয়ে বসেছেন, কখনো দিনমজুরের খাটুনি খেটেছেন, আবার কখনো রিকশার প্যাডেল চেপেছেন। রক্ত জল করা সেই উপার্জনের কানাকড়ি জমিয়ে কেনা বইয়ের সংখ্যা আজ সুদীর্ঘ ২২ বছরের পথপরিক্রমায় এসে ঠেকেছে প্রায় ১৫ হাজারে।
স্বপন শুধু পরের ঘরে আলো জ্বালাতেই ব্যস্ত ছিলেন না, নিজের আখেরও গুছিয়েছেন পড়াশোনা দিয়ে। কষ্ট করে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক আর উচ্চমাধ্যমিকের বৈতরণি পার হয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সরকারি কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স ও মাস্টার্স করেছেন। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আজ তিনি কসবার বায়েক শাহ আলম কলেজের বাংলার প্রভাষক।
তবে শিক্ষকতার চাকরিটা তাঁর কাছে কেবলই এক উসিলা; পকেটের সিংহভাগ বেতনই তিনি মাসের শেষে অকাতরে ঢেলে দেন পাঠাগারের পেছনে।
কালের নিয়মে সেই একচালা ঘর আজ দোতলা দালানে রূপ নিয়েছে। ২০২২ সালে মা পাড়ি জমালেন ওপারে। এর পর থেকে স্বপনের জীবনে এই পাঠাগারই হয়ে উঠল ঘরগেরস্থালি, একমাত্র ধ্যানজ্ঞান।

আজ সুহাতা গ্রামের গরিব–দুঃখী ছেলেমেয়েদের জন্য এই পাঠাগার যেন এক কামধেনু। প্রতি শুক্রবার সেখানে জমে ওঠে বইয়ের আড্ডা, ছোটদের সাধারণ জ্ঞানের লড়াই। এই চত্বর থেকে বই ধার নিয়ে পড়ে আজ কত ছেলেমেয়ে নামী বিশ্ববিদ্যালয় আর মেডিক্যালের বারান্দায় পা রাখছে। কেউ শিক্ষক হচ্ছে, কেউ বড় সরকারি চাকুরে।
নিজের জীবনের এই যজ্ঞ নিয়ে স্বপন মিয়া খুব সহজ করে বলেন, ‘আমার মতো কত ছেলেমেয়ে টাকার অভাবে বই কিনতে পারে না, পড়াশোনা মাঝপথে লাটে ওঠে। তাদের জন্যই এই গুঞ্জন পাঠাগার। আজ আমি না থাকলে পৃথিবীর কিছু আটকাবে না; কিন্তু এই বইয়ের ঘরটা বন্ধ হলে গোটা গ্রামের কপাল পুড়বে।’
মানুষ আসে আর যায়, কিন্তু তার হাতের কাজের দাগ থেকে যায় চিরকাল ইতিহাসের পাতায় সাক্ষী হয়ে। স্বপন মিয়ার এই অনন্য লড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, খাঁটি ইচ্ছা আর বুকের পাটা থাকলে ছেঁড়া কাঁথাতে শুয়েও আকাশের চাঁদ ছোঁয়া যায় এবং তা সত্যিও করা যায়।
কার্যনির্বাহী সদস্য, সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধুসভা







