একসময় তারা ছিলেন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কায়েম করেছিলেন ত্রাসের রাজত্ব। হত্যা, চাঁদাবাজি, দখল-বাণিজ্য ও মাদক কারবার নিয়ন্ত্রণ ছিল তাদের হাতেই। সরকারের তালিকাভুক্ত সেই শীর্ষ সন্ত্রাসীরাই এখন শিকার হচ্ছেন টার্গেট খুনের। আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে একে একে প্রাণ হারাচ্ছেন তারা। গত কয়েক মাসে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় খুন হয়েছেন একাধিক শীর্ষ সন্ত্রাসী। প্রতিটি ঘটনায় হামলাকারীরা এসেছেন মোটরসাইকেলে। খুব কাছ থেকে গুলি করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করেছেন। এসব ঘটনায় কয়েকজন গ্রেফতার হলেও মামলার তদন্তও শেষ হয়নি। নিহত সন্ত্রাসীরা দুই দশকের বেশি কারাগারে ছিলেন। বেশির ভাগ মামলায় তারা জামিনে থাকলেও দু-একটিতে ইচ্ছা করেই জামিন নিচ্ছিলেন না। তাদের ভয় ছিল, কারাগার থেকে বের হলে জীবননাশ হতে পারে। ২০০৪ সালে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন তারা। এরপর সত্য প্রমাণিত হচ্ছে তাদের আশঙ্কাই। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে এসব তথ্য।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সূত্র জানায়, আন্ডারওয়ার্ল্ডে এখন চলছে ক্ষমতার পুনর্বিন্যাস প্রক্রিয়া। জামিনপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে কেউ কেউ এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হচ্ছেন। আবার কেউ কেউ আর অপরাধজগতে ফিরতে চাচ্ছেন না। যারা পুনরায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়াচ্ছেন, তারাই খুন করছেন, খুনের শিকারও হচ্ছেন। আবার জামিন পাওয়ার পর অনেকেই দেশের বাইরে চলে গেছেন। সেখান থেকেই কলকাঠি নাড়ছেন কেউ কেউ। আবার ভালো হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করে কেউ কেউ দেশে আসতে চাচ্ছেন। তারা যোগাযোগ করছেন রাজনৈতিক অঙ্গনসহ আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ে। তাদের আশঙ্কা, দেশে এলে তারা হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারেন। রাজনৈতিক এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিশ্চয়তা পেলে তারা দেশে আসতে চান। তাদেরই একজন আব্বাস আলী। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘আমি রাজনৈতিক অক্রোশের শিকার। কোনো সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে আমি জড়িত নই। জড়িত হতেও চাই না। নিজেকে ক্ষতির হাত থেকে বাঁচাতেই বিদেশে অবস্থান করছি। আমার কোনো ক্ষতি না হওয়ার আশ্বাস পেলে দেশে আসতে কোনো আপত্তি নেই।’
১২ জুন দুপুরে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন ভবনের উলটোপাশে নিজের বাসার সামনে গুলিবিদ্ধ হন শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে পলাশ। অপরাধজগতে তিনি ‘কাইল্যা পলাশ’ নামে পরিচিত। গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় এভারকেয়ার হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। ১৯ জুন রাতে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনার পর পলাশের স্ত্রী মাহমুদা খানম হাতিরঝিল থানায় একটি হত্যাচেষ্টার মামলা করেন। মামলায় শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
সূত্রমতে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে জিসানের সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল। জিসানের অনুসারীরাই তাকে হত্যা করেছে। এর আগে ২০২৫ সালের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকায় আদালতের কাছে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুনকে। ২০২৩ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর রাতে তেজগাঁওয়ে বিজি প্রেসের সামনে মামুনকে হত্যার চেষ্টা করে সন্ত্রাসীরা। তবে ওই সময় সন্ত্রাসীদের ছোড়া গুলিতে নিহত হন সেখান দিয়ে মোটরসাইকেলে যাওয়া আইনজীবী ভুবন চন্দ্র শীল। ওই আইনজীবী ও মামুন হত্যার সঙ্গে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের অনুসারীদের সংশ্লিষ্টতার কথা জানিয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, ইমনের নির্দেশেই মামুনকে হত্যা করা হয়।
২৮ এপ্রিল রাজধানীর নিউমার্কেটে অপরাধজগতের আধিপত্য ও বসিলা পশুর হাট দখল নিয়ে বিরোধের জেরে শীর্ষ সন্ত্রাসীদের অন্যতম খন্দকার নাঈম আহমেদ টিটন খুন হন। টিটন হত্যার নেপথ্যে ছিল বসিলার কুরবানির পশুর হাটের ইজারা এবং এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিরোধ। নিহত টিটনের ভাই খন্দকার সাইদ আক্তার রিপন নিউমার্কেট থানায় করা হত্যা মামলার এজাহারেও ওই হাটের ইজারা নিয়ে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাজাহান, রনি ওরফে ভাঙারি রনির সঙ্গে টিটনের ঝামেলার কথা উল্লেখ করেছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পাওয়া পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মধ্যে আছেন ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, সানজিদুল ইসলাম ইমন, মিরপুরের আব্বাস আলী, হাজারীবাগের খন্দকার নাঈম আহমেদ ওরফে টিটন, খোরশেদ আলম ওরফে ফ্রিডম রাসু, তারিক সাঈদ মামুন প্রমুখ। তাদের মধ্যে ফ্রিডম রাসু ফের গ্রেফতার হয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে গ্রেফতার হয়েছেন মগবাজারের শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন ও মোল্লা মাসুদ। তারা এখন কারাগারে আছেন।
সাম্প্রতিক কয়েকটি হত্যাকাণ্ডে হামলার ধরনে মিল খুঁজে পেয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্টরা। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই হামলাকারীরা মোটরসাইকেল ব্যবহার করেছেন। খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে তারা দ্রুত পালিয়ে গেছেন। অনেক ঘটনায় পেশাদার শুটার ব্যবহারের আলামতও পাওয়া গেছে। তদন্ত কর্মকর্তাদের ধারণা, আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভাড়াটে খুনিদের একটি নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকতে পারে, যারা অথের্র বিনিময়ে নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে টার্গেট করছে।
জানতে চাইলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ বলেন, তালিকাভুক্ত বেশকিছু শীর্ষ সন্ত্রাসী অর্ন্তবর্তী সরকারের আমলে জামিনে মুক্তি পেয়েছে। তাদের কেউ কেউ ভালো হওয়ার চেষ্টা করছে, আবার কেউ কেউ নতুন করে অপরাধে জড়াচ্ছে। যারা ভালো হতে চায়, তারা সুযোগ পাবে। আর যারা অপকমর্মে জড়াচ্ছে, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সবকটিরই রহস্য উদ্ঘাটন করা হয়েছে বলে তিনি জানান।








