জামালপুরে প্রমত্তা ঝিনাই নদীর শুয়াকৈর সেতুটি সরিষাবাড়ী ও মাদারগঞ্জে লাখো মানুষের দুর্ভোগের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভয়াবহ বন্যায় সেতুর মাঝখানের একটি পিলার ও স্প্যান ধসে পড়ে ২০২০ সালের ২১ জুলাই। এরপর পেরিয়ে গেলো ছয় বছর। কিন্তু ভাঙা অংশটি স্থায়ীভাবে সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ বাস্তবায়ন হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার প্রবল স্রোতের পাশাপাশি সেতুর একেবারে গা ঘেঁষে অবৈধভাবে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের কারণেও সেতুটি ধসে পড়ে। ফলে দীর্ঘ ছয় বছর ধরে জামালপুর উপজেলার প্রায় ২০ গ্রামের মানুষের যাতায়াত বর্ষাকালে ঝুঁকিপূর্ণ নৌকা আর শুষ্ক মৌসুমে অস্থায়ী বাঁশের সাঁকোর ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে।

উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা যায়, ২০০৩-২০০৪ অর্থ বছরে শুয়াকৈর-হুদুর মোড় এলাকায় ঝিনাই নদীর ওপর প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যের এ সেতুটি নির্মাণ করা হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এম এইচ এন্টারপ্রাইজ ২০০৬ সালে সেতুর কাজ শেষ করলে তা চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। কিন্তু নির্মাণের মাত্র ১৪ বছরের মাথায় ২০২০ সালের ২১ জুলাই বন্যার পানির স্রোতে দুটি পিলার ও দুইটি গার্ডারসহ সেতুর মাঝখানের প্রায় ৬০ মিটার অংশ ধসে নদীতে পড়ে যায়। এরপর থেকেই ওই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সেতুর দু পাশে রাস্তা থাকলেও কোনো যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। সেতুর দুই পাশের মাঝখানের বিশাল অংশটি ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ায় যাতায়াতের একমাত্র ভরসা হয়ে উঠেছে নৌকা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সেতু ভালো থাকতে ওই পথে গন্তব্যে পৌঁছাতে মাত্র ২০ মিনিট সময় লাগত, এখন অন্য রাস্তা ঘুরে যেতে এক থেকে দুই ঘণ্টাও লেগে যাচ্ছে। ভাড়াও বেশি লাগছে। বিশেষ করে নৌকার জন্য ঘাটে এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে গিয়ে দীর্ঘ সময় অপচয় হচ্ছে। তবে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে এই অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা।

একটি ভাঙা সেতুতে থমকে আছে ২০ গ্রামের জীবন

শিক্ষার্থী সৌরভ হাসান বলেন, 'সেতুটা ভালো থাকতে আমরা বাড়ি থেকে বের হয়ে মাত্র ১৫-২০ মিনিটে কলেজে চলে যেতে পারতাম। এখন অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যেতে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লাগে। আবার বর্ষাকালে নৌকায় গাদাগাদি করে উঠতে হয়, জামাকাপড় ভিজে যায়। অনেক সময় ঘাটে নৌকা না পেয়ে প্রথম দুইটা ক্লাস ধরাই সম্ভব হয় না। এতে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে।'

স্থানীয় বাসিন্দা মনু মিয়া বলেন, 'নেতারা ভোট আইলে সেতু কইরা দেওয়ার বড় বড় কথা কয়, ভোট গেলে আর খোঁজ থাকে না। আমাগো কষ্ট দেখার কেউ নাই। সবাই শুধু আমাদের আশা দিয়ে যায়, কিন্তু দুর্ভোগ দূর করতে কেউ বাস্তবে এগিয়ে আসে না।'

শুয়াকৈর এলাকার কৃষক সৈকত বলেন, 'সেতুটি ভেঙে যাওয়ায় আমরা উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। এখান থেকে শহরে মালামাল নেওয়া যায় না। আবার শহরের কেউ এখান থেকে মালামাল কিনতেও আসে না। শহরের আমাদের উৎপাদিত কৃষিপণ্য নিতে গেলে বাড়তি ভাড়া গুনতে হয়। ফলে সবদিক থেকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি। এই সেতুটি নির্মাণ করে দিলে আমরা খুব উপকৃত হবো।'

দীর্ঘ ৬ বছর ধরে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে সরিষাবাড়ী উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) গোলাম কিবরিয়া তমাল বলেন, 'সেতুটি নতুন করে নির্মাণের লক্ষ্যে ইতোমধ্যেই আমরা মন্ত্রণালয়ে চূড়ান্ত প্রস্তাবনা পাঠিয়েছি। শুয়াকৈর সেতুটি দ্রুত সংস্কারের জন্য দাপ্তরিক সকল প্রস্তুতি আমাদের পক্ষ থেকে চলমান রয়েছে।'

হৃদয় আহম্মেদ/এফএ/জেআইএম