অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সংস্কার করা ঢাকার ফুটপাতগুলো জায়গায় জায়গায় ভাঙতে শুরু করেছে। কোথাও টাইলস উঠে গেছে, কোথাও মাটি দেবে গর্ত হয়ে গেছে। জায়গায় জায়গায় ম্যানহোলের ঢাকনা উধাও।
নগর প্রায় আড়াই বছরের বেশি সময় ধরে মেয়র-কাউন্সিলরশূন্য। পালিয়ে যাওয়া মেয়রদের জায়গায় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকারও এসে নতুন প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু কোনোরকমে কাজ চালানোর মতো করে চলা নাগরিক সেবায় খুব একটা বদল আসেনি। আধা ঘণ্টা, এক ঘণ্টার বৃষ্টিতে অনেক রাস্তায় পানি জমছে। সেই পানি সরতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগে যাচ্ছে।
আষাঢ়ের শুরুতেই নাগরিক দুর্ভোগ বলে দিচ্ছে এবার বর্ষা মৌসুমের আগে ড্রেন, খালগুলো পরিষ্কার করা হয়নি। ফুটপাতগুলোর ওপরেও কারও নজর দেখা যাচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ঢাকার অনেক রাস্তার পাশে ফুটপাতগুলো হাঁটার উপযোগী করা হয়েছিল। ফুটপাতের ভাঙা জায়গাগুলো সারাই করা গেলে মানুষের পা মচকানোর ভয়টা কমে আসত। ম্যানহোলগুলোর ঢাকনা দেওয়া হলে মায়ের হাত থেকে ছিটকে ম্যানহোলে তলিয়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও থামানো যেত। আমাদের বেশির ভাগ প্রকল্পে মেরামত, সারাই বলে কিছু নেই। প্রকল্প হবে কিন্তু তার নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ হবে না। নাগরিক দুর্ভোগ এখানে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত।
বাঙালি তর্কপ্রিয়, আরও পরিষ্কার করে বলতে বিতণ্ডাপ্রিয় জনগোষ্ঠী। তর্ক বাধলে নিজের কৃতকর্মের পক্ষে সাফাইয়ের ক্ষেত্রে একটি মোক্ষম যুক্তি হলো, ভাই রে…এটা বাংলাদেশ!
এই লেখায় এমন গৌরচন্দ্রিকার উদ্দেশ্য একটু ভিন্ন। গত সপ্তাহে মগবাজারে এ রকম একটা ভাঙাচোরা ফুটপাত ধরে কসরত করে হাঁটতে হাঁটতে বাংলামোটরের দিকে আসছিলাম। একটি গলি যেটা মূল সড়কে গিয়ে মিশেছে, এমন একটি জায়গায় গলিপথ পার হতে গিয়ে দেখি একটা পিকআপ ভ্যান আসছে। থেমে দাঁড়িয়ে সেটা পার হয়ে যাবে সেই অপেক্ষা করছি। হুট করে রং সাইড দিয়ে একটি মোটরসাইকেল চালক, আরোহীসহ দ্রুতগতিতে ঢুকে পড়ল। সেকেন্ডের ব্যবধানে দুবার উচ্চ শব্দে হর্ন বাজাল। খুব স্বাভাবিকভাবেই মুখে কিছুটা বিরক্তিসূচক অভিব্যক্তি বেরিয়ে গেল।
কিছু দূর সামনে গিয়ে মোটরসাইকেলচালক হার্ড ব্রেক কষলেন। দেখি রাগত চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছেন। শান্তভাবেই তাঁদের দিকে এগিয়ে গেলাম। ২০-২২ বছরের দুজন তরুণ। কাছে গিয়ে বিনীতভাবেই বললাম, হর্ন না বাজিয়েও মোটরসাইকেল চালানো যায়। বিশ্বের অনেক দেশেই হর্ন না বাজিয়ে গাড়ি চালানো হয়। মোটরসাইকেলচালক বেশ উত্তেজিত ছিলেন। তিনি একনাগাড়ে উচ্চ স্বরে কথা বলে যাচ্ছিলেন। একপর্যায়ে বলে বসলেন, এটা বাংলাদেশ, এখানে অন্য দেশের তুলনা চলে না।
বাঙালি তর্কপ্রিয়, আরও পরিষ্কার করে বলতে বিতণ্ডাপ্রিয় জনগোষ্ঠী। তর্ক বাধলে নিজের কৃতকর্মের পক্ষে সাফাইয়ের ক্ষেত্রে একটি মোক্ষম যুক্তি হলো,
ভাই রে…এটা বাংলাদেশ!
আইন অমান্যের ক্ষেত্রে বিশ্বে আমাদের জুড়ি মেলা ভার। উচ্চমাত্রায় হর্ন আমাদের কী ক্ষতি করছে, এর জন্য ব্যক্তিজীবন, সাংসারিক জীবনে আমাদের কী কী সমস্যা হচ্ছে, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, তা যে কেউই গড়গড় করে বলে দিতে পারে। এখানে সমস্যাটা সচেতনতার নয়, বরং মানসিকতার।
উচ্চমাত্রায় হর্ন বাজানো বন্ধেও আমাদের একাধিক আইন ও বিধিমালা আছে। শব্দদূষণ বন্ধে ২০০৬ সালে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা করেছিল। এই বিধিমালায় সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল এক মাসের জেল বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ড।
ইট পড়েও এই ‘জাদুর শহরে’ মানুষ মারা যায়!এরপর ২০১৮ সালে পাস হওয়া সড়ক পরিবহন আইনের ৮৮ ধারা অনুযায়ী, উচ্চমাত্রায় হর্ন বাজালে অনধিক তিন মাসের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা জরিমানা করতে পারবে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এই আইনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ছিল, আইন প্রয়োগের কর্তৃপক্ষ পুলিশ ছিল না, ছিল পরিবেশ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ। ফলে পাসের পর আইনটি প্রয়োগ করা হয়নি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৫ সালে পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিধিমালাটি সংশোধন করে সর্বোচ্চ দুই বছরের জেল বা দুই লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধি চালু করা হয়েছে। এখানে পুলিশকেও জরিমানা করার কর্তৃপক্ষ করা হয়েছে। আইন অনুযায়ী, উচ্চ স্বরে হর্ন বাজালে পুলিশ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা করতে পারবে।
সমস্যাটা এখানে নতুন কর্তৃপক্ষ যুক্ত করা কিংবা শাস্তি কঠোর করা নয়, আইন প্রয়োগে সবচেয়ে বড় বাধা রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
একদিকে রাস্তাগুলোয় ২০-২৫ বছর নতুন বাস নামানো হয়নি, অন্যদিকে মোটরসাইকেল, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে গণপরিবহনের মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। শ্লথের চেয়ে ধীরগতির শহরে মোটরসাইকেলচালকেরা চিপাচাপা, ফাঁকফোকর গলে, ফুটপাতের ওপর দিয়ে তারস্বরে হর্ন বাজাতে বাজাতে এগোতে পারেন। ফলে অনেকেরই পছন্দের ও প্রয়োজনের গণপরিবহন মোটরসাইকেল। আর ব্যাটারিচালিত রিকশার চালকদের অনেকে তো ভুভুজেলার মতো হর্ন ফিট করে নিয়েছেন। উৎসবের মেজাজে সেটা বাজাতে বাজাতে ছুটতে থাকেন পথচারীদের কানের মাথা খেয়ে।
মনোজ দে প্রথম আলোর সম্পাদকীয় সহকারী








