‘৭১–এর মার্চের টেলিভিশন’ শিরোনামে মুস্তাফা মনোয়ারের এ স্মৃতিগদ্যটি প্রকাশিত হয় ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রথম আলোর আনন্দ পাতায়। এত দিন শুধু ছাপা পত্রিকার পাতাজুড়ে থাকা গদ্যটি আজ অনলাইন পাঠকের জন্য তুলে ধরা হলো
টেলিভিশনের ইতিহাসে কতগুলো দিক আমরা শুরু করেছিলাম একেবারে গোড়া থেকে। অনেকেরই প্রায় প্রথম চাকরি ছিল টেলিভিশন। এর মধ্যে ছিলেন জামিল চৌধুরী, কলিম শরাফী, মনিরুল আলম, জামান আলী খান এবং আমিসহ আরো অনেকে। এদের প্রচেষ্টাতেই বাংলা ভাষা বা সংস্কৃতির ওপরে শ্রদ্ধা তো ছিলই এবং আরেকটু উপলব্ধি ছিল এই ঐতিহ্যকে বাধা দেওয়ার বা ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে। আমি ’৬০ সালে আর্ট কলেজে চাকরিতে ঢুকি এবং ’৬৪ সালে ঢুকি টেলিভিশনে। তখনকার প্রত্যেকেই সংস্কৃতি অঙ্গন থেকে এসেছিল। তখন টেলিভিশন থেকে যে সুরটি প্রচারিত হয়েছিল, তা হচ্ছে ‘ধন ধান্যে পুষ্প ভরা’ গানটি, যা পাকিস্তান আমলে প্রচারিত হতো না। সে সময় স্টেশন ম্যানেজার প্রথম থেকেই বাংলায় চেক ইস্যু করতেন, যা বাংলায় প্রথম। আমাদের সংস্কৃতির ওপর বাধা আসবে তা আমরা বুঝতে পারলাম ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর। তখন থেকে শুরু হলো নতুন করে অনুষ্ঠান করা। ২৬ মার্চের আগের এক মাস আমরা নতুন সাজে সেজেছিলাম। তখন কয়েকটি সাড়া জাগানো অনুষ্ঠান করা হয়েছিল। এর মধ্যে আমি করেছিলাম গানের একটি অনুষ্ঠান। দেশের গান নামে এই অনুষ্ঠানের একজন গাইলেও স্পেশাল এফেক্টের মাধ্যমে দেখানো হতো হাজার মানুষ গান করছে। গানটি ছিল ‘সংগ্রাম সংগ্রাম চলবে’। এ ছাড়া ‘একতারা তুই দেশের কথা বলরে এবার বল’—এ রকম বেশকিছু গান স্পেশাল এফেক্টের মাধ্যমে করেছিলাম। এ ছাড়া আরো অনেক অনুষ্ঠান হতো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুকান্ত ভট্টাচার্যের কবিতা নিয়ে অনুষ্ঠান তৈরি করা হয়েছিল। সুকান্তর রানার অবলম্বনে একটা অনুষ্ঠান তৈরি করেছিলাম। তাতে দেখানো হতো একটা ছেলে বিভিন্ন জায়গায় মুক্তির খবর দিয়ে বেড়াচ্ছে। কিন্তু মাঝে মাঝে তাকে কে যেন গুলি করত। গুলি খেয়ে সে আবার ছুটে চলছে।
এ ছাড়া ১০-১২ জন প্রযোজক যেমন বেলাল বেগ, আবদুল্লাহ আল মামুন, মোমিনুল হক, আরো কয়েকজন মিলে বেশকিছু জাগরণী অনুষ্ঠান তৈরি করেছিলেন। বাংলা সংস্কৃতির চিরন্তন রূপটি প্রকাশের চেষ্টা ছিল অনুষ্ঠান বদলের মধ্য দিয়ে। সবচেয়ে বড় কাজ সে সময় যেটা হয়েছিল, সেটা হলো ২৩ মার্চ পাকিস্তান দিবস। সকাল ১১টায় টেলিভিশনে যাওয়ার পথে আমি দেখলাম, পাকিস্তানি পতাকা বেশকিছু সরকারি ভবনে উড়ছে। আর কোথাও নয়। সে সময় আন্দোলন চলছিল বলে সাড়ে ৯টায় অনুষ্ঠান শেষ হয়ে যেত। তখন মাসখানেক ধরে একজন মেজরের আন্ডারে ৫০-৬০ জন মিলিটারি থাকতেন। তাদের চোখের সামনে অনুষ্ঠান করেছি। আমাদের অনুষ্ঠান শেষ হলেই পাকিস্তানের পতাকা উড়ত। এ সময় হঠাৎ মাথায় বুদ্ধি এল। আমরা সব স্টাফদের বাড়ি চলে যেতে বললাম এবং আমাদের গাড়ি ডিআইটি ভবনের বাইরে রাখা হলো। আমরা কয়েকজন ট্রান্সমিশন রুমে রয়ে গেলাম। সে সময় অনুষ্ঠান ঘোষিকা ছিলেন মাসুমা খাতুন। আমরা কয়েকজন মিলে একটার পর একটা পুরনো সব অনুষ্ঠান চালাতে থাকলাম। যখন ১০টা বাজে তখন মেজর এসে জিজ্ঞেস করল, কাম খতম নেই হোতা। তখন আমরা বললাম, পাকিস্তান দিবস উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে। এমনিভাবে অনুষ্ঠান প্রায় ১১টা পর্যন্ত চালালাম। হঠাৎ করে মেজর কয়েকজন আর্মি নিয়ে আবার এল। কিছুটা ধমকের সুরে অনুষ্ঠান শেষ হচ্ছে না কেন জানতে চাইল। আমি বললাম, একটু পরেই অনুষ্ঠান শেষ হবে। তারপর রাত ১২টা ২ মিনিটে অনুষ্ঠান শেষ হলো। তখন মাসুমা ঘোষণা করল, আজ ২৪ মার্চ। আমাদের অনুষ্ঠান শেষ হলো। তারপর পাকিস্তানের পতাকা ওড়ানো হলো। যেহেতু রাত ১২টা পার হয়ে গিয়েছিল তাই আমরা ২৪ তারিখ বলে পতাকা ওড়ালাম। এরপর পেছনের দরজা দিয়ে অন্য জায়গায় চলে এলাম। এত মিলিটারি পাহারা থাকা সত্ত্বেও তাদের মধ্যে থেকে এটা করতে পেরে আমরা গর্বিত। রাত ১২টা পার করে ২৪ তারিখ বলব এটা ওরা ভাবতে পারেনি। আমার মনে হয় এটা টেলিভিশনসহ সবার জন্য গর্বের কথা। সে সময় ওই সাহস কোথা থেকে পেয়েছিলাম এখন ভাবলে আতঙ্কিত হই। সেই সাহসটা নিশ্চয়ই এসেছিল বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ থাকে।






