স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের লক্ষ্য নিয়ে যখন বাংলাদেশে কাজ চলছে, ঠিক সেসময় শেষ তিন বছরে দেশ পরিচালনা করেছে তিন সরকার। এর মধ্যে কোনো পক্ষ এলডিসি উত্তরণের বিষয়ে ইতিবাচক ছিল, কেউ আবার নেতিবাচক। সর্বশেষ বিএনপি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসার পরপরই এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এখন যা চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে।
এলডিসি উত্তরণ পিছিয়ে নেওয়ার কারণ হিসেবে বর্তমান সরকার মনে করছে- উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের উত্তরণকালীন অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি উত্তরণ পরবর্তী সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো টেকসইভাবে মোকাবিলা করতে চায়, যেন শুল্ক বঞ্চিত হয়ে দেশের কোনো খাত মুখ থুবড়ে না পড়ে। এক্ষেত্রে তিন বছর পিছিয়ে গেলে এরমধ্যে একটি মসৃণ উত্তরণের পথঞ তৈরি করবে সরকার।
আরও পড়ুন
বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের সময় ৩ বছর বাড়ানোর আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর
যে কারণে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর দেশের সক্ষমতা বাড়াতে পাঁচ বছর মেয়াদি বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিকল্পনাও করেছে বিএনপি সরকার। ‘স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি’ নামের ওই পরিকল্পনায় ২০৩১ সালের মধ্যে দেশে বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, গতিশীল রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জন, জনসংখ্যার মাথাপিছু আয় বাড়ানোসহ নেওয়া হয়েছে নানান উদ্যোগ।
বাংলাদেশের এলডিসি থেকে উত্তরণ কার্যকর হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর। তবে বিএনপি সরকার গত ১৮ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসি (সিডিপি)-এর কাছে এলডিসি থেকে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল তিন বছর বাড়িয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত করার অনুরোধ জানায়। পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে জাতিসংঘ মহাসচিবের কাছেও এক চিঠিতে সহযোগিতা কামনা করা হয়।
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের উদ্দেশ্য উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়; বরং ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার সুসংহত করা, সুশাসন জোরদার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আর্থিক খাত শক্তিশালীকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করা।— বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির
পাশাপাশি এ বিষয়ে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করতে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের নেতৃত্বে এক প্রতিনিধিদল সম্প্রতি একাধিক বৈঠক করেন।জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদের (ইকোসক) সভাপতি ও নেপালের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত লোক বাহাদুর থাপা এবং ইকোসকের সহ-সভাপতি ও আলজেরিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন তারা। এরপর গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ও নেপালকে এলডিসি তালিকা থেকে উত্তরণের আগে প্রস্তুতির সময় তিন বছর বাড়ানোর অনুরোধ বিবেচনার জন্য সুপারিশ করেছে ইকোসক। এর মাধ্যমে বিষয়টি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সাধারণ পরিষদের কাছে পাঠানো হয়েছে।
আরও পড়ুন
এলডিসি উত্তরণে পাঁচ বছর মেয়াদি নতুন কর্মপরিকল্পনা
কেন এলডিসি পেছানোর পদক্ষেপ
বর্তমান সরকার মনে করে দেশের চলমান অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, জ্বালানি সংকট, সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন, জলবায়ু পরিবর্তনের বহুমাত্রিক প্রভাব এবং অন্যান্য বহিঃপ্রতিকূলতার কারণে বাংলাদেশ পূর্বনির্ধারিত প্রস্তুতিকালের পূর্ণ সুফল গ্রহণ করতে পারেনি।
এছাড়াও চলমান ইরান যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্রের অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঝুঁকিসহ বহুমুখী সংকটের মধ্যেই ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণ ঘটলে দেশের অর্থনীতি আরও বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়বে। পরিস্থিতিকে যা আরও বেশি জটিল করে তুলতে পারে।

ইকোসক সভাপতি ও সহ-সভাপতির সঙ্গে বৈঠক করেন বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির
এ বিষয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বৃদ্ধি করাই যথাযথ। তবে আমরা এলডিসি থেকে উত্তরণে দৃঢ়ভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর অনুরোধের উদ্দেশ্য উত্তরণ বিলম্বিত করা নয়; বরং ব্যাপক কাঠামোগত সংস্কার সুসংহত করা, সুশাসন জোরদার, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, আর্থিক খাত শক্তিশালীকরণ, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং একটি শক্তিশালী ও টেকসই মসৃণ উত্তরণ কৌশল বাস্তবায়নের মাধ্যমে উত্তরণকে মসৃণ, টেকসই ও স্থিতিশীল করা।
৫ বছর মেয়াদি স্মুথ ট্রানজিশন স্ট্র্যাটেজি
এলডিসি থেকে উত্তরণের পর অর্থনীতিকে টেকসই করতে এবং রপ্তানির প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এ পরিকল্পনায় ২০৩১ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় প্রায় ৭৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ হাজার ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। উত্তরণের প্রাক্কালে বাংলাদেশের বাণিজ্য সক্ষমতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচক এবং বিভিন্ন সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য উন্নতির লক্ষ্যও রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন
রাবাব ফাতিমা / বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণ পেছাতে সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে জাতিসংঘ
জানা গেছে, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) আওতাধীন এনহ্যানসড ইন্টিগ্রেটেড ফ্রেমওয়ার্ক (ইআইএফ)-এর তৃতীয় পর্যায়ের জন্য প্রস্তুত করা কান্ট্রি প্রোগ্রাম ডকুমেন্ট বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব লক্ষ্য অর্জনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ইপিএ রয়েছে। এছাড়াও ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েক দেশের সঙ্গে এফটিএ ও ইপিএ নিয়ে আলোচনা চলছে। এগুলো দ্রুত ব্যস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গত রোবরার এক কর্মশালায় বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, এ কর্ম পরিকল্পনায় ১২টি কার্যক্রম রাখা হয়েছে, যার প্রতিটিই বাংলাদেশের বাণিজ্য সক্ষমতা উন্নয়ন ও প্রয়োজনীয় সংস্কারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বাণিজ্য সহজীকরণ, উদারীকরণ, সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে বাংলাদেশের ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (ডব্লিউটিও) খাদিজা নাজনীন বলেন, ডব্লিউটিওর এনহ্যানসড ইন্টিগ্রেটেড ফ্রেমওয়ার্ক কর্মসূচির মাধ্যমে এলডিসি দেশগুলোকে বাণিজ্য সক্ষমতা বাড়াতে সহায়তা দেওয়া হয়। এই কর্মসূচি চলতি বছর থেকেই শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাথমিকভাবে প্রায় ৫২টি প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে উন্নয়ন সহযোগীদের সম্ভাব্য সহায়তা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিবেচনা করে সেগুলোকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ১২টি কার্যক্রমে সীমিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ডিটিআইএস, রপ্তানি নীতি, শিল্পনীতি, বাণিজ্য নীতি, ট্রেড ফ্যাসিলিটেশন অ্যাগ্রিমেন্ট এবং বিনিয়োগ সুবিধা বিষয়ক উদ্যোগ থেকে প্রাধান্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিতে অর্থনীতি-রাজনীতির সমন্বয়ে জোর তথ্যমন্ত্রীর
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা গেছে, আগামী পাঁচ বছরে নয় দেশের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) অথবা অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সইয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের একটি ইপিএ রয়েছে। এছাড়াও ভারত, চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েক দেশের সঙ্গে এফটিএ ও ইপিএ নিয়ে আলোচনা চলছে। এগুলো দ্রুত ব্যস্তবায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
অন্যদিকে তৈরি পোশাকের বাইরে অন্যান্য পণ্য রপ্তানির সম্প্রসারণ, পর্যটন অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং সেবা খাতে কৌশলগত বিদেশি বিনিয়োগের অভাব দীর্ঘমেয়াদি সেবা বাণিজ্য উন্নয়ন রোডম্যাপ প্রণয়নকে গুরুত্বপূর্ণ দেওয়া হচ্ছে।
এনএইচ/কেএসআর








