ডালাসের এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। টেক্সাসের রোদ আজ তাই গ্যালারির ৭০ হাজার দর্শককে পোড়াবে না, কারও গায়ে লাগবে না জুলাইয়ের বাতাসের তপ্ত হলকা। কিন্তু তারপরও মাঠে উত্তাপ থাকবে। যে উত্তাপের নাম ফ্রান্স বনাম স্পেন।
এই বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল, কিন্তু ফুটবল-মহিমায় এর ওজন যেন শিরোপা লড়াইয়েরই সমান। বাংলাদেশ সময় রাত ১টার ম্যাচটাকে অনেকেই তাই বলছেন, ‘ফাইনালের আগেই ফাইনাল’।
এক পাশে নীল, অন্য পাশে লাল। একদিকে আগুন, অন্যদিকে জল। একদল বিশ্বাস করে বিস্ফোরণে, আরেক দল প্রবাহে।
ফ্রান্স এই বিশ্বকাপে এসেছে এক অদ্ভুত নিশ্চিন্ত আত্মবিশ্বাস নিয়ে। যেন তারা জানে, ঠিক সময়ে আঘাতটা কোথায় করতে হয়। আট আসরের মধ্যে পঞ্চমবার ফাইনালে ওঠার হাতছানি সামনে। জিতলে টানা তৃতীয়বার। জার্মানি (১৯৮২-১৯৯০) ও ব্রাজিল (১৯৯৪-২০০২) ছাড়া এই কীর্তি আর কারও নেই। জার্মানি ও ব্রাজিলের পর টানা তিন বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠা তৃতীয় দলও তারা। ইতিহাস তাই ফ্রান্সের হাতের মুঠোয়, শুধু হাত বাড়িয়ে নেওয়ার অপেক্ষা।
কিলিয়ান এমবাপ্পে এই দলের মুখ, এই দলের আগুন। তাঁর দৌড় যেন বজ্রপাতের মতো দেখায়, তারপর আর ধরা যায় না। এরই মধ্যে ৮টি গোল হয়ে গেছে তাঁর, সঙ্গে উসমান দেম্বেলের ৫ মিলিয়ে সংখ্যাটা ১৩! এই দুজনের পাশে মাইকেল অলিসে, ব্র্যাডলি বারকোলা, দেজিরে দুয়ে—একেকজন যেন আলাদা আলাদা অস্ত্র, একসঙ্গে হলে তাঁরা হয়ে ওঠেন এক অপ্রতিরোধ্য ঝড়।
দিদিয়ের দেশমের দলটা কখনো দ্রুত আক্রমণে যায়, কখনো বল থামিয়ে খেলার গতি কমায়, আবার প্রয়োজনে নিজেদের অর্ধে গুটিয়েও থাকতে পারে দীর্ঘ সময়। মরক্কোর বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে যেমনটা দেখা গেছে। তারা চাপ সহ্য করেছে, সুযোগের অপেক্ষা করেছে, তারপর আঘাত করেছে। যেন একদল শিকারি—যারা জানে, কখন দৌড়াতে হয়, আর কখন নিঃশব্দে অপেক্ষা করতে হয়।
অন্যদিকে স্পেন, যাদের খেলা শান্ত নদীর মতো। দেখতে বিপজ্জনক লাগে না, কিন্তু ধীরে ধীরে সব গ্রাস করে ফেলে। লুইস দে লা ফুয়েন্তের দল বল দখলকে শুধু আক্রমণের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে না, তারা এটাকে ঢালও বানায়। রদ্রি, পেদ্রি, ফাবিয়ান রুইজদের পায়ে বল ঘোরে এমন মসৃণতায়, যেন সময়ও থমকে দাঁড়ায় দেখার জন্য। তাদের পাসের জাল এমনভাবে ছড়িয়ে থাকে, তাতে প্রতিপক্ষ হাঁটতে হাঁটতেই আটকে যায়। সেই প্রবাহের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকেন লামিনে ইয়ামাল—গতকালই যিনি ১৯ বছরে পা দিয়েছেন। কিন্তু তাঁর পায়ে যেন বয়সের কোনো হিসাব নেই। ইউরো ২০২৪-এর সেমিফাইনাল, নেশনস লিগ—ফ্রান্সকে হারানোর স্মৃতি তাঁর কাছে নতুন নয়। সেই আত্মবিশ্বাস নিয়েই বেলজিয়াম–জয়ের পর বলেছিলেন, ‘আমরা দুটো সেরা দল। দেখা যাক কী হয়, কিন্তু আমাদের কোনো ভয় নেই। হয় ওরা টানা তিনবার ফাইনালে উঠবে, নয়তো আমরা টানা তিনবার ওদের হারাব। আমাদের কোনো ভয় নেই।’
‘ভয় নেই’, এই কথাটাই হয়তো স্পেনের সবচেয়ে বড় শক্তি। এই বিশ্বকাপে তাদের রক্ষণ ভাঙা গেছে মাত্র একবার। প্রতিপক্ষ যতই চেষ্টা করুক, স্পেনের পাসের চক্র ভেদ করে পরিষ্কার সুযোগ তৈরি করা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
তবে এই ফ্রান্স আগের চেয়ে আলাদা। ইউরো ২০২৪-এ যে দলটা নাকভাঙা এমবাপ্পে আর ছন্দহীন আঁতোয়ান গ্রিজমানকে নিয়ে ধুঁকছিল, আজকের ফ্রান্স তার চেয়ে অনেক গভীর, অনেক ধারালো। তাদের অস্ত্রাগারে গোলাবারুদ বেশি, তাদের আত্মবিশ্বাস এখন এভারেস্টছোঁয়া। অতীত ইতিহাসের কোনো ভূত এখন আর এই নতুন ফ্রান্সকে তাড়া করে বেড়ায় না।
এমবাপ্পের গতি স্পেনের ডিফেন্স লাইনকে একটু নিচে নামতে বাধ্য করবে। দেম্বেলের উইং থেকে আক্রমণ স্পেনের মাঝমাঠের চেনা ভারসাম্য নষ্ট করতে পারে। অলিসে মাঝখানে জায়গা তৈরি করতে পারেন। বেলজিয়াম দেখিয়েছে, চাপ এড়িয়ে মাঝমাঠের নিচের ফাঁকা জায়গায় আঘাত হানতে পারলে স্পেনকেও নড়বড়ে করা যায়। ফ্রান্সের হাতে সেই অস্ত্র আছে।
উল্টো প্রশ্নও আছে। রদ্রি-পেদ্রিদের নিয়ন্ত্রণ কি ফরাসি আক্রমণের অক্সিজেন বন্ধ করে দেবে? আর ইয়ামাল যদি ডান প্রান্তে জ্বলে ওঠেন, ফরাসি রক্ষণ কি সেই আগুন সামলাতে পারবে, যেমনটা মিউনিখে ইউরোর সেমিফাইনালে পারেনি!
টানা চারটি বিশ্বকাপে কোচিং করিয়ে ইতিমধ্যে ইতিহাসে নাম তুলেছেন দিদিয়ের দেশম। এবার জিতলে খেলোয়াড় হিসেবে একবার ও কোচ হিসেবে দুবার বিশ্বকাপ জেতার অনন্য কীর্তি গড়া হয়ে যাবে তাঁর। ব্রাজিলের মারিও জাগালো আর জার্মানির ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ারও যা পারেননি। কিন্তু সেই কীর্তি গড়ার জন্য আগে আজ স্পেনকে ছিটকে দিতে হবে বিশ্বকাপ থেকে।
ফুটবল তাহলে আজ কার পক্ষ নেবে? ফ্রান্সের বারুদের নাকি স্পেনের শান্ত নদীর? যেটাই হোক, ডালাসে শেষ বাঁশির পর একদল যখন ইতিহাসের নতুন পাতায় পা রাখবে, অন্য দল তখন ড্রেসিংরুমের অন্ধকারে খুঁজবে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নটাকে।
ইতিহাসের সবচেয়ে দামি ৩০০ কোটির এক ম্যাচ







