উত্তরবঙ্গের সীমান্তঘেঁষা দিনাজপুরে দাঁড়িয়ে আছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (হাবিপ্রবি)। জ্ঞান, গবেষণা ও প্রযুক্তি শিক্ষায় এটি উত্তরাঞ্চলের এক অনন্য বিদ্যাপীঠ। দিনাজপুর শহর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে, ৮৫ একরজুড়ে ছায়াঘেরা ও শান্ত পরিবেশে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়।

১৯৭৯ সালে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগে কৃষি সম্প্রসারণ প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (এইটিআই) হিসেবে এর যাত্রা শুরু হয়। পরে ১৯৮৮ সালের ১১ নভেম্বর উত্তরবঙ্গের কৃষকনেতা হাজী মোহাম্মদ দানেশের নামানুসারে এটি কৃষি কলেজে রূপান্তরিত হয়। দীর্ঘ পথচলার পর ২০০২ সালের ৮ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়টিকে প্রথম উপাচার্য ছিলেন মৃত্তিকাবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. মোশাররফ হোসেন মিঞা। বর্তমানে দায়িত্বে রয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের অষ্টম উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. এনামউল্যা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়কে আরও এগিয়ে নিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রথমে কৃষি অনুষদ দিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ৯টি অনুষদের অধীনে ৪৫টি বিভাগ রয়েছে। প্রায় ১১ হাজার শিক্ষার্থীর এই বিদ্যাপীঠে কর্মরত রয়েছেন ৩৮৮ জন শিক্ষক। বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যাও ১৩০।

হাবিপ্রবির গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হয় ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (আইআরটি) থেকে। এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা প্রায় ৬ হাজার। এগুলোর মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৫০০টি আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে। এসব গবেষণা ৪০ থেকে ৫০ হাজারবার উদ্ধৃত (সাইটেড) করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বছরে দুবার প্রকাশিত হচ্ছে জার্নাল অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি।

চলতি অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন থেকে গবেষণার জন্য আইআরটিকে ৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে। এর মধ্যে শিক্ষকদের গবেষণায় ২ কোটি ৮০ লাখ টাকা, স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীদের থিসিস অনুদানে ৪০ লাখ টাকা এবং পিএইচডি শিক্ষার্থীদের ফেলোশিপ হিসেবে ৮০ লাখ টাকা ব্যয় করা হচ্ছে।

গবেষণায় হাবিপ্রবি বেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। এগুলোর মধ্যে নতুন জাতের ফসল উদ্ভাবন, ধান, চাল, ভুট্টাসহ বিভিন্ন শস্য দ্রুত শুকানোর আধুনিক ড্রায়ার তৈরি, রাসায়নিক এবং কীটনাশকমুক্ত ধান উৎপাদনে অগ্রগতি, খাদ্যবাহিত ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া ব্যাসিলাস সেরিয়াস শনাক্তকরণের মতো গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়টিকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়টি অ্যাডভান্সড কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের (এসিআই) সঙ্গে যৌথভাবে উন্নত কৃষি জাত; যেমন এসিআই গম-১, এসিআই গম-২ এবং এইচএসটিইউ-১ ও এইচএসটিইউ-২ নামে করলার জাত উদ্ভাবন করেছে। পাশাপাশি প্রোবায়োটিক ব্যাকটেরিয়াল এনক্যাপসুলেশন, মাল্টি-ক্রপ ড্রায়ার, মোবাইল গ্রেইন অ্যান্ড সিড ড্রায়ার এবং ব্ল্যাকবেরি পাল্প এক্সট্র্যাক্টরের মতো উদ্ভাবনের পেটেন্ট অর্জন করেছে। এসব বাণিজ্যিকীকরণের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

এ ছাড়া গরুর ডিম্বাশয়ের অবস্থা ও গর্ভধারণ শনাক্তে BaCl2-ভিত্তিক মূত্র প্রোটিন পরীক্ষার একটি নতুন পদ্ধতিও উদ্ভাবন করেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা। তবে এর সফল যাচাইকরণ, সম্প্রসারণ এবং মাঠপর্যায়ে এর সফল প্রয়োগের জন্য প্রয়োজন প্রশিক্ষিত জনবল ও কারিগরি সহায়তা।

আইআরটির পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. আলমগীর হোসেন বলেন, দেশের এক প্রান্তে অবস্থিত হলেও জ্ঞানচর্চা ও গবেষণায় হাবিপ্রবির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন। অপর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি, গবেষণাগারের সীমাবদ্ধতা এবং অর্থায়নের সংকট থাকা সত্ত্বেও তাঁরা গবেষণার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হননি।

এর ফলে নানা ক্ষেত্রে তাঁরা উল্লেখযোগ্য সাফল্যও অর্জন করেছেন। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে হাবিপ্রবির গবেষণা ও সক্ষমতাকে তুলে ধরতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং (আইআরটি) নিরলস কাজ করে যাচ্ছে।

গবেষণায় শিক্ষার্থীদের আগ্রহও বাড়ছে। এর একটি উদাহরণ এ টি এম হামীম আশরাফ। হাবিপ্রবির সাবেক এই শিক্ষার্থী বর্তমানে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা। কর্মজীবনে মাঠপর্যায়ে কাজ করতে গিয়ে গবেষণার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন তিনি। পরে নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি গবেষণায় যুক্ত হন। তাঁর গবেষণার বিষয় হলো দিনাজপুরে পরিবেশবান্ধব উপায়ে লিচুর ফলছিদ্রকারী পোকা ও মাইট দমন। গবেষণার কাজ শেষ করে তিনি এরই মধ্যে জমা দিয়েছেন গবেষণাপত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ের রিজেন্ট বোর্ডের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. এনামউল্যা জানান, বর্তমান যুগ হলো জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির যুগ, যেখানে অগ্রগতি নির্ভর করে গবেষণার গভীরতা এবং নতুন নতুন উদ্ভাবনের ওপর। হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় দেশের প্রথম সারির বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একটি। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণ হলো শিক্ষা ও গবেষণা। এ লক্ষ্যেই উচ্চশিক্ষা

ও গবেষণায় শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত করতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘পিএইচডি ফেলোশিপ’ চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করতে ক্যাম্পাসে একাধিক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সের আয়োজন করা হয়েছে।

উপাচার্য আরও বলেন, কাজের অনুকূল পরিবেশ থাকায় বর্তমানে এখানে দেশের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে অনেক বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। একই সঙ্গে চারজন গবেষক পিএইচডি স্কলারশিপ নিয়ে গবেষণায় নিয়োজিত রয়েছেন। পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে গবেষণার ক্ষেত্রে হাবিপ্রবি দেশকে নেতৃত্ব দেবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।