গাজায় যুদ্ধের এক হাজার দিন পূর্ণ হওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্রিটেনের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে—সরকার বদলালে কি মধ্যপ্রাচ্য নীতিতেও পরিবর্তন আসবে? সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী এন্ডি বার্নাহামের নেতৃত্বে নতুন সরকার দায়িত্ব নিলে ইসরায়েলের প্রতি ব্রিটেনের সামরিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক অবস্থানে কোনো মৌলিক পরিবর্তন ঘটবে কি না, সেটিই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

এক হাজার দিনের এই যুদ্ধকে ঘিরে ব্রিটেনের যুদ্ধবিরোধী সংগঠনগুলো নতুন প্রধানমন্ত্রীর প্রতি তাদের প্রত্যাশা স্পষ্ট করেছে। তাদের দাবি, গাজায় চলমান মানবিক বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের অস্ত্র বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে এবং এমন কোনো রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক সহায়তা দেওয়া যাবে না, যা যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে। তাদের মতে, একটি নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় নৈতিক পরীক্ষা হবে মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে তারা কথার চেয়ে কাজে কতটা দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে।

প্যালেস্টাইন সলিডারিটি ক্যাম্পেইনের উপপরিচালক পিটার লিয়ারি এক হাজার দিনকে ‘ভয়াবহ এক মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেছেন, নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার এই সময়টিকে ব্রিটিশ সরকারের জন্য একটি নীতিগত মোড় পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে দেখা উচিত। তাঁর ভাষায়, ব্রিটেনের উচিত ইসরায়েলের সঙ্গে সব ধরনের অস্ত্র বাণিজ্যের অবসান ঘটানো এবং যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমর্থন ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে শক্তি জোগাচ্ছে বলে সমালোচকেরা মনে করেন, তা পুনর্বিবেচনা করা। তাঁর দাবি, এই দীর্ঘ সময়ে হাজারো ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং হাসপাতাল, বিদ্যালয় ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে। এমনকি ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পরও সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো যুদ্ধই স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না। অস্ত্রের শক্তি সাময়িক বিজয় দিতে পারে, কিন্তু টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়বিচার, পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সমান শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। গাজার এক হাজার দিন সেই সত্যকেই আবারও নির্মমভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

ব্রিটিশ রাজনীতির প্রবীণ নেতা জেরেমি করবিনও একই সুরে বলেছেন, গত এক হাজার দিনে ব্রিটেন অস্ত্র ও রাজনৈতিক সমর্থনের মাধ্যমে এমন এক সংঘাতের অংশীদার হয়েছে, যা ইতিহাসের কঠিন বিচার থেকে রেহাই পাবে না। তাঁর মতে, সরকার পরিবর্তন হলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নে ব্রিটেনের অতীত ভূমিকার জবাবদিহি এড়ানোর সুযোগ নেই। এই ইস্যু রাজনৈতিক এজেন্ডা থেকে হারিয়ে যাবে না; বরং সময়ের সঙ্গে আরও তীব্র হবে।

‘স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশন’-এর নেতা ক্রিস নাইনহাম স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন, গাজার এই সংকট এক হাজার দিনের হলেও ফিলিস্তিন প্রশ্নের ইতিহাস কয়েক দশকের। তাঁর মতে, সামরিক দখল, বৈষম্য ও সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাসকে উপেক্ষা করে কেবল বর্তমান যুদ্ধের সমাধান খোঁজা সম্ভব নয়। তাই তিনি নতুন সরকারের কাছে যুদ্ধবিরতি, নিষেধাজ্ঞা এবং ন্যায়ভিত্তিক শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আরও সক্রিয় কূটনৈতিক ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিডিএস (The Boycott, Divestment and Sanctions) আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহমুদ নাওয়াজা আরও কঠোর ভাষায় বলেছেন, এই এক হাজার দিন মানবজাতির বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার মতো একটি সময়। তাঁর অভিযোগ, পশ্চিমা বিশ্বের বিভিন্ন রাষ্ট্র, করপোরেশন ও প্রতিষ্ঠানের সহায়তা ছাড়া এই যুদ্ধ এত দীর্ঘ হতো না। যদিও এই বক্তব্য বিতর্কিত এবং সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রগুলো তা প্রত্যাখ্যান করে এসেছে, তবু এটি ব্রিটেনের অভ্যন্তরে ক্রমবর্ধমান জনমতের একটি অংশের প্রতিফলন হিসেবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

শুধু পররাষ্ট্রনীতি নয়, ব্রিটেনে সামরিক ব্যয় বৃদ্ধিও নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সমালোচকদের মতে, প্রতিরক্ষা খাতে বিপুল অর্থ ব্যয় করে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক সেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো উপেক্ষা করা হচ্ছে। তাদের প্রশ্ন, মানুষের নিরাপত্তা কি কেবল আরও বেশি অস্ত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে, নাকি ক্ষুধা, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও জলবায়ু সংকট মোকাবিলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ?

গাজার এক হাজার দিনের এই রক্তাক্ত ইতিহাস বিশ্ব সম্প্রদায়ের জন্য এক কঠিন আত্মসমালোচনার উপলক্ষ। মানবাধিকারের প্রশ্নে নির্বাচিত নীরবতা, আন্তর্জাতিক আইনের অসম প্রয়োগ এবং ভূরাজনৈতিক স্বার্থের প্রাধান্য শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক ন্যায়বিচারের ধারণাকেই দুর্বল করে। যুদ্ধের প্রতিটি অতিরিক্ত দিন নতুন করে অনাথ, বাস্তুচ্যুত ও ক্ষুধার্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ায়; শান্তির সম্ভাবনাকে আরও ক্ষীণ করে।

অবশ্য এ বিতর্কের অন্য দিকও রয়েছে। ইসরায়েল বারবার বলেছে, হামাসের হামলার পর নিজেদের নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তাদের রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব এবং সেই অধিকার আন্তর্জাতিক আইন স্বীকৃত। একই সঙ্গে যুক্তরাজ্য সরকারও অতীতে বলেছে, তাদের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি জাতীয় নিরাপত্তা, কৌশলগত স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। ফলে নতুন সরকারের জন্য মানবিক চাপ এবং নিরাপত্তা-রাজনীতির বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা সহজ হবে না।

তবু সরকার পরিবর্তনের মুহূর্তে জনমতের প্রত্যাশা সব সময়ই নতুন করে মূল্যায়িত হয়। এন্ডি বার্নাহামের সম্ভাব্য নেতৃত্বের সামনে গাজার এক হাজার দিন তাই কেবল একটি পররাষ্ট্রনীতির ইস্যু নয়; এটি ব্রিটেনের নৈতিক অবস্থান, আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অঙ্গীকার এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে তার বৈশ্বিক নেতৃত্বেরও পরীক্ষা। নতুন সরকার কি পূর্বসূরিদের নীতি বহাল রাখবে, নাকি একটি ভিন্ন পথ বেছে নেবে—তার উত্তর হয়তো শুধু মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ নয়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রিটেনের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রভাবিত করবে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, কোনো যুদ্ধই স্থায়ী সমাধান এনে দেয় না। অস্ত্রের শক্তি সাময়িক বিজয় দিতে পারে, কিন্তু টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায়বিচার, পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি সমান শ্রদ্ধার ভিত্তিতে। গাজার এক হাজার দিন সেই সত্যকেই আবারও নির্মমভাবে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।

লেখক : ব্রিটেনপ্রবাসী কলামিস্ট।

এইচআর/এমএফএ/এএসএম