আসুন, আপনাদের সঙ্গে কয়েকজন বীরপুঙ্গবের পরিচয় করিয়ে দিই। এরা বরিশাল নগরীর জগদীশ সারস্বত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করত। এই উত্ত্যক্তকারীদের চারজনকে পুলিশ আটক করেছে। স্কুলের সামনে এসে ছাত্রীদের অশ্লীল ভাষায় উত্ত্যক্ত করার সময় এরা কী ধরনের আনন্দ পেত, জানতে পারলে সামাজিক গবেষণার জন্য সেটি কাজে লাগত।
নারীদের উত্ত্যক্ত করার ঘটনা অবশ্য আমাদের সমাজে নতুন নয়। নারীদের সঙ্গে পুরুষের ব্যবহার কী ধরনের হবে, সেই শিক্ষা আমাদের সমাজে দেওয়া হয় না। সমাজে নারী-পুরুষের মধ্যে এখনো সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যে কুশিক্ষা, কুরুচি নারীকে হেয় করার জন্য ব্যবহার করা হয়, তা প্রতিহত করার মতো শিক্ষার অভাব রয়েছে। কোনোভাবেই নারীকে তার উপযুক্ত সম্মান দিতে পারছে না সমাজ। ফলে নারীকে নিয়ে যথেচ্ছ অন্যায় করে চলেছে একশ্রেণির মানুষ।
প্রায়ই নারীর অধিকারের কথা বলা হয়ে থাকে। কিন্তু উপযুক্ত শিক্ষার অভাবে আমাদের দেশে নারীর অধিকার খর্ব করা হচ্ছে প্রতিনিয়তই। বরিশালের এই চার ছেলে যে ছাত্রীদের উত্ত্যক্ত করে ব্যতিক্রমী ঘটনার জন্ম দিয়েছে, তা নয়। বরং দেশের প্রায় প্রতিটি এলাকায় এ ধরনের উত্ত্যক্তকারীদের দেখা মিলবে। মেয়েরা ভয়ে কিংবা আতঙ্কে সব সময় এই ধরনের অপমানের কথা বলে না। আরও বলে না এই কারণে যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে আরও কত ধরনের সমস্যা এবং হুমকিতে পড়তে হবে, তার কোনো হিসাব নেই। তাই এগুলোর প্রতিবাদও সেভাবে হয় না।
আমরা এ ধরনের অশ্লীল মানসিকতার কারণ বিশ্লেষণ করতে গেলে দেখতে পাব, পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক মানসিকতার একটা বড় দায় রয়েছে এ ব্যাপারে। পুরুষকে নারীর ওপর কর্তৃত্বশীল হিসেবে দেখার মানসিকতা এই গন্ডগোলের মূলে রয়েছে। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে। নারী ও পুরুষের সম-অধিকার তো অনেক দূরের ব্যাপার, নারীকে মানুষ হিসেবে না দেখে বস্তু হিসেবে দেখার প্রবণতাও এই সমাজে প্রকটভাবে রয়েছে। নারীকে পণ্য হিসেবে যাঁরা উপস্থাপন করেন, তাঁরাও যে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা থেকেই করেন, সে কথাও বলা দরকার। নারীকে উত্ত্যক্ত করলে শাস্তির ভয় নেই—এ রকম একটা নির্ভরতা পেয়েও অনেকে এই অপরাধ করে থাকে। বন্ধুমহলের সঙ্গে বাজি ধরে নারীদের সামনে নিজেদের ‘মাচো’ বা সাহসী প্রতিপন্ন করার জন্যও কেউ কেউ এই অন্যায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে। তবে সবচেয়ে জরুরি যে বিষয়টি আমাদের মনে রাখতে হবে, সেটি হলো পরিবার এবং শিক্ষালয়ে নারী ও পুরুষের মর্যাদা নিয়ে শিশুদের সঠিক শিক্ষা দেওয়া। বাড়িই তো ভদ্র এবং নম্র আচরণ শেখার সেরা পীঠস্থান। সেখানে যদি একে অপরকে সম্মান না করে, একে অন্যের প্রতি সহমর্মী না হয়, তাহলে যে রকম সমাজ গড়ে ওঠার, সে রকম সমাজই তো গড়ে উঠবে। আর সেটাই হয়েছে আমাদের দেশেও।
তাই এই চারটি ছেলেকে নিয়ে কথা না বলে মানসিকতার পরিবর্তনের কথাই সবার আগে ভাবা দরকার। আর সেটিই এই অশ্লীলতা থেকে বাঁচাতে পারে দেশকে।








