অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ২০০৮ সালে ক্ষমতায় এসেছিল আওয়ামী লীগ। নির্বাচনের পূর্বে দলটি ‘দিনবদলের সনদ’ শীর্ষক এক নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করে, যা এ বিজয়ের পিছনে বিরাট ভূমিকা রেখেছিল। ওই ইশতেহারে আওয়ামী লীগ দেশে বিরাজমান চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দলবাজি ইত্যাদি এবং দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের মূল উৎপাটনসহ শাসনব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটানোর অঙ্গীকার করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ সরকার এসকল অঙ্গীকার পূরণে চরমভাবে ব্যর্থ হয়। বিশেষ করে উচ্চ আদালতের রায়ের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এবং আদালতের রায় অমান্য করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে, যে ব্যবস্থাটি ছিল সব দলের ঐকমত্যের ফল।
মূলত, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের পরই কারচুপির নির্বাচনের পুরানো সংস্কৃতিই বাংলাদেশে ফিরে আসে। ফলে নির্বাচনি ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। সরকার ও ক্ষমতাসীন দলকে ভোটারদের দ্বারস্থ হতে হয়নি। ফলে সমাজে বিরাজমান দায়বদ্ধতার কাঠামো ভেঙে পড়ে। আর এই ‘সমান্তরাল’ দায়বদ্ধতার কাঠামো ভেঙে পড়ায় বাংলাদেশ দুর্নীতি-দুর্বৃত্তায়নের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়। দেখা যায়, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত শাসনামলে দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন ২ হাজার ৬৯৯ জন (বণিক বার্তা, ৫ অক্টোবর ২০২৪)।
প্রত্যেকটি কর্তৃত্বপরায়ণ সরকার তার ক্ষমতা সুসংহত করতে রাষ্ট্রের ‘ফোর্থ এস্টেট’ গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। আওয়ামী লীগ সরকারের বিগত ১৫ বছরের শাসনামলেও তার ব্যতিক্রম ছিল না। গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনগণের কণ্ঠরোধ করার জন্য তৈরি করা হয়েছিল কুখ্যাত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন।
ক্ষমতায় টিকে থাকতে দেশের সরকারি বেসরকারি ক্ষেত্রে সরকার এক অবিশ্বাস্য মাত্রার দলীয়করণ করেছিল, যা ছিল ‘দিনবদলের সনদে’ করা অঙ্গীকারের নগ্ন বরখেলাপ। রাষ্ট্রের পুলিশ, প্রশাসন শুধু দলীয়ভাবে অনুগতদের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। কারো বিষয়ে আনুগত্য নিয়ে ন্যূনতম সন্দেহ থাকলে তাকে সরিয়ে নেওয়া হতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে। নিয়োগ এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রেও ছিল একচ্ছত্র দলীয়করণ। দলীয়করণের থাবা থেকে মুক্ত ছিল না রাষ্ট্রের বিচার বিভাগও।
দলীয়করণের ব্যাপকতা সবচেয়ে তীব্র হয়েছিল অর্থনীতিতে। বিগত সরকারের সময়ে লুটপাটের জন্য দেশের অর্থনৈতিক খাত তুলে দেওয়া হয়েছিল সরকারের একেবারে অনুগত কিছু অলিগার্কের হাতে। বৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণ, ব্যাংক, বিদ্যুৎ খাত এবং অত্যাবশ্যকীয় ভোগ্যপণ্যের মতো খাত থেকে লুট করা হয়েছে অকল্পনীয় পরিমাণ অর্থ।
সাধারণ মানুষ যখন ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং বিচারহীনতা যখন নিয়মে পরিণত হয়, তখন জনগণের মাঝে জমতে থাকে ক্ষোভ এবং তৈরি হয় প্রতিরোধের শক্তি। ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদী শাসনের জাঁতাকলে পিষ্ট বাংলাদেশের ছাত্র-জনতার অংশগ্রহণে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের সূচনা হয়। ২০১৮ সালের সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফলে বিলুপ্ত হওয়া কোটা প্রথা ২০২৪ সালে হাইকোর্টের এক রায়ের মাধ্যমে পুনর্বহাল হলে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে নতুন করে কোটা সংস্কার আন্দোলন শুরু হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়ার পরিবর্তে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। ফলে আন্দোলনটি এক স্বতঃস্ফূর্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। এক পর্যায়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ফ্যাসিবাদের পতনকে প্রধান লক্ষ্য করে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। অবশেষে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান এবং তার দীর্ঘকালীন দমনমূলক ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনাই করেনি— এটি ছিল রাষ্ট্র মেরামতের লক্ষ্যে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব জাগরণ, তারুণ্যের আকাঙ্ক্ষার এক তীব্র বিস্ফোরণ। এ সময়টি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে জনগণ আর নীরব দর্শক থাকতে রাজি নয়। বিশেষত, তরুণ প্রজন্ম শহর থেকে গ্রামের লাখো দেয়ালে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—তারা আর অবিচার, বৈষম্য ও জবাবদিহিহীনতার উত্তরাধিকার বহন করতে চায় না। তারা চায় অংশগ্রহণ, মর্যাদা ও একটি ন্যায়ভিত্তিক গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ। তাই বাংলাদেশের জন্য আজ একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই যথেষ্ট নয়, দরকার গণতান্ত্রিক উত্তরণ। যার জন্য দরকার কতগুলো আইনি, প্রাতিষ্ঠানিক ও কাঠামোগত সংস্কার এবং রাজনৈতিক নীতি ও মূল্যবোধের পরিবর্তন।
সংস্কারের ব্যাপারে জনআকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করার জন্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্বে আসার পর প্রাথমিকভাবে ছয়টি এবং পরবর্তীতে আরও পাঁচটি সংস্কার কমিশন গঠন করে। কমিশনগুলো যথাসময়ে তাদের প্রতিবেদন দাখিল করে, যার মধ্যে প্রথম ছয়টি ছয়টি সংস্কার কমিশন সুপারিশের ব্যাপারে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গঠিত হয় ‘জাতীয় ঐকমত্য কমিশন’। জাতীয় ঐকমত্য কমিশন রাজনৈতিক দল ও জোটের সঙ্গে দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর চূড়ান্ত করে ‘জুলাই জাতীয় সনদ-২০২৫’।
এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি তারিখে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদে উল্লেখিত সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত ৪৮টি বিষয়ে জনগণের মতামত নেওয়ার জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। আশার কথা হলো, একটি শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ সূচক ভোট জয়ী হওয়ায় আইনত সংস্কারের পথ উন্মুক্ত হয়েছে।
ইতোমধ্যে চলতি বছরের ১৭ই ফেরুয়ারি তারিখে যাত্রা শুরু করা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের মেয়াদ চার মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। কোনো নবনির্বাচিত সরকারের প্রথম ৪ কিংবা ৫ মাস তার পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট সময় নয়। কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা একটি দীর্ঘমেয়াদি, বহুমাত্রিক, এবং জটিল প্রক্রিয়া। এর জন্য নীতি প্রণয়ন, প্রশাসনিক পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিচার ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার— এসবের ফলাফল বাস্তবে রূপায়নের জন্য সময়ের প্রয়োজন হয়। তবে প্রথম চারমাস একদম গুরুত্বহীন নয়। বরং এই সময়েই একটি সরকার তার রাষ্ট্র পরিচালনা দর্শন, রাজনৈতিক চরিত্র, নীতিগত অগ্রাধিকার, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, সংস্কারের প্রতি আন্তরিকতা এবং রাষ্ট্রকে কোন পথে নিতে চায় তার প্রাথমিক দিক-নির্দেশনা দিয়ে থাকে। বিশেষ করে জুলাইয়ের পর নতুন বাংলাদেশ ও নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মাণ, বিশেষ করে জুলাইয়ের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা বৈষম্যহীন বাংলাদেশ বিনির্মাণে সরকার কতটা আন্তরিক তা জনগণ জানতে আগ্রহী।
দীর্ঘ ১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী কাঠামোর অন্তর্গত গণতান্ত্রিক অবক্ষয়, দুর্নীতি, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব, বাক-স্বাধীনতা হরণের প্রবণতা, বিনিয়োগ-স্থবিরতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনআস্থার সংকটের প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা স্বাভাবিকভাবেই অনেক বেশি। বিশেষ করে ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের আপামর জনসাধারণের মাঝে যে রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ, দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, আইনের শাসন এবং ক্ষমতার ভারসাম্য। তাই সরকারের কাছে আমাদের প্রশ্ন, সরকার কি কেবল ক্ষমতা গ্রহণ করেছে, নাকি একাত্তর, নব্বই ও জুলাইয়ের চেতনায় রাষ্ট্র সংস্কারের ঐতিহাসিক দায়িত্বও গ্রহণ করেছে? সরকার কি জনপ্রত্যাশা পূরণে আন্তরিক?
বিগত চারমাসে দ্রুত কিছু জনকল্যাণমূলক ও গ্রামীণ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, কিছু ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন, পাচার হওয়া সম্পদ ফিরিয়ে আনা ও প্রশাসনিক শৃঙ্খলা নিশ্চিতে সরকারের ইতিবাচক পদক্ষেপ দেখা গেছে। একই সময়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত না করা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ও আস্থা ফিরে না আসা, দলীয়করণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির মতো বিষয়গুলো পরিলক্ষিত হয়েছে।
এটি সর্বজনবিদিত যে, বর্তমান সরকার দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হলেও ২০২৪ এর জুলাই-আগস্টের ৩৬ দিনের রক্তক্ষয়ী আন্দোলন ও ৫ই আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের ফসল আজকের সরকারি দল, বিরোধীদল নির্বিশেষে আমরা সবাই। ৫ই আগস্ট সফল না হলে আমাদের কেউই আজকের অবস্থানে বুকভরে নিঃশ্বাস নিতে পারতাম কি না, রাজনৈতিক দল, পেশাজীবী ও নাগরিক সংগঠনগুলো স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারতো কিনা সন্দেহ। তাই, আমাদের মনে রাখতে হবে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে প্রণীত ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ একক কোনো দলের দলিল নয়; বরং গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, তরুণ প্রজন্ম এবং রাষ্ট্র সংস্কারপন্থী শক্তির সম্মিলিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন, যা গণভোটের মাধ্যমে জনগণের সম্মতি পেয়েছে। নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব ছিল এই সনদকে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান করা এবং তার প্রধান অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের একটি নির্দিষ্ট রোডম্যাপ দেওয়া।
সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জুলাইয়ের চেতনার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করলেও জুলাইয়ের চেতনা বাস্তবায়নে সরকারের জড়তা, সংশয়, এবং ক্ষেত্রবিশেষে অবজ্ঞা দৃষ্টিগোচর হয়। যেমন, প্রথমত, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশে ১৮০ কর্মদিবসের মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও এই আদেশ মেনে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে বিএনপি দলীয় সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেননি, বরং এ ব্যত্যয়ের পক্ষে দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের কাউকে কাউকে যুক্তি উত্থাপন করতে দেখা গেছে। জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিন বিএনপি থেকে নির্বাচিত সদস্যগণের শপথ গ্রহণে অস্বীকৃতি রাজনীতি পর্যবেক্ষকদের অনেকের কাছে রীতিমত অবিশ্বাস্য ছিল। তাদের এ পদক্ষেপ আইনের আওতায় বৈধ বিবেচিত হলেও নৈতিক বিবেচনায় কতটুকু গ্রহণযোগ্য ছিল— এ প্রশ্ন উত্থাপন অযৌক্তিক নয়।
দ্বিতীয়ত, সব দল পরিপূর্ণভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করলেও বিএনপি সংশ্লিষ্ট আইনজীবীগণ বিষয়টিকে আদালতে নিয়ে গেছেন। তৃতীয়ত, জাতীয় সংসদে সরকারের মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়সহ কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের বিভিন্ন উক্তি ও বক্তব্য জুলাই সনদ, গণভোট, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন ও এ পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণে অস্বীকার এবং এ ব্যাপারে উদাসীনতা জুলাইয়ের চেতনায় উদ্বুদ্ধ শিক্ষার্থী সম্প্রদায়কে বিশেষ করে এবং ব্যাপক জনগণকে সাধারণভাবে হতাশ করেছে।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কোনো পদক্ষেপ নিতে এখনও সরকারকে দেখা যায়নি, যেমন, সংখ্যানুপাতের (পিআর) ভিত্তিতে জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন বা জাতীয় সংবিধান পরিষদ (এনসিসি) গঠন, ইত্যাদি বিষয়ে সরকার বেদনাদায়কভাবে নীরব। সরকারের এ অবস্থান গণঅভ্যুত্থানের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের ইতিবাচক লক্ষণ বলা যায় না। কারণ, সরকারের দিক থেকে জুলাই সনদ বা গণভোটের রায় বাস্তবায়ন কেবল আনুষ্ঠানিক ভাষণ বা রাজনৈতিক সৌজন্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। তাই এটি উদ্বেগের কারণ। কারণ গণঅভ্যুত্থানের মূল শক্তি ছিল শুধু সরকার পরিবর্তনের দাবি নয়; বরং রাষ্ট্র পরিচালনার সংস্কৃতি পরিবর্তনের দাবি।
এছাড়া জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা তথা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধবিরোধী বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে দেখা গেছে সরকারকে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করতে গিয়ে ক্ষমতাসীন দল বিএনপি তাদের প্রণীত ‘৩১ দফা’ ও নির্বাচনী ইশতেহার লঙ্ঘন করেছে। যেমন, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. এইচ আহসান মনসুরকে অসম্মানজনকভাবে অপসারণ করে ব্যাকিং খাতে অভিজ্ঞতাশূন্য একজনকে স্থলাভিষিক্ত করেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগ প্রদান করেছে এবং বিসিবির এডহক কমিটিতে দলীয় নিয়োগ দিয়েছে। অথচ বিএনপির ৩১ দফার ৯ দফায় বলা হয়েছে, ‘সংকীর্ণ রাজনৈতিক দলীয়করণের উর্ধ্বে উঠিয়া সকল রাষ্ট্রীয়, সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার করিবার লক্ষ্যে এই সকল প্রতিষ্ঠানে ... নিয়োগ প্রদান করা হইবে।’
সরকার স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় প্রশাসক নিয়োগ দিয়েছে এবং উপজেলা পরিষদে এমপিদের জন্য পরিদর্শন কক্ষ স্থাপন করেছে, যা সুস্পষ্টভাবে সংবিধান, আদালতের রায়, ‘৩১ দফা’ ও নির্বাচনী ইশতেহারের লঙ্ঘন। ‘৩১ দফা’র ২০নং দফায় বলা হয়েছে: ‘... স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারী মুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হইবে। মৃত্যুজনিত কারণ কিংবা আদালতের আদেশে পদশূন্য না হইলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে সরকারি প্রশাসক নিয়োগ করা হবে না।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয় সম্পর্কিতগুলোকে সংসদে অনুমোদনের মাধ্যমে আইনে পরিণত করার ব্যাপারেও অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বহু পরিশ্রম করে ‘সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫’, ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’, এবং ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করেছিল এবং এগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল। সুপ্রিম কোর্ট বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর অধীনে হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগ প্রদান করে। এর পাশাপাশি মাননীয় প্রধান বিচারপতি রেফাত আহমদ ১১ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে সুপ্রিম কোর্টের জন্য একটি পৃথক সচিবালয় উদ্বোধন করেন। আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের এসব সুস্পষ্ট পদক্ষেপ সত্ত্বেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ এসব অধ্যাদেশ অনুমোদন করতে ব্যর্থ হয়। সরকার এরই মধ্যে সৃষ্ট বিচার বিভাগের স্বাধীন সচিবালয় ৯ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে আইন মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা আদালত অবমাননার সমতুল্য। এসব উদ্যোগ জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা সংস্কারের বিপরীত কাজ।
এছাড়া দুর্নীতি দমন কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে শক্তিশালী করা এবং তথ্য কমিশন গঠন করার বিষয়ের সরকারের আগ্রহ কম লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরকার সম্প্রতি সংসদ সদস্যদের জন্য ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ ঘোষণা দিয়েছে। এই সিদ্ধান্ত আমাদের সংবিধানের ওপর হস্তক্ষেপ। সংবিধানের ৫৬(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সংসদ’ নামে বাংলাদেশের একটি সংসদ থাকিবে এবং এই সংবিধানের বিধানাবলী-সাপেক্ষে প্রজাতন্ত্রের আইনপ্রণয়ন-ক্ষমতা সংসদের উপর ন্যস্ত হইবে’। অর্থাৎ ‘হাউজ অব দ্য পিপল’ বা জাতীয় সংসদ সদস্যদের দায়িত্ব হলো মোটাদাগে আইন তৈরি-সংশোধন-বাতিল করা, সংসদীয় স্থায়ী কমিটির মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা, বাজেট অনুমোদন করা এবং নীতি-নির্ধারণী বিষয়ে ভূমিকা রাখা। তাই তাদের কর্মস্থল হলো জাতীয় সংসদ ভবন।
ফলে এ সিদ্ধান্ত সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন, যে অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘আইনানুযায়ী নির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত প্রতিষ্ঠানসমূহের উপর প্রজতন্ত্রের প্রত্যেক প্রশাসনিক একাংশের স্থানীয় শাসনের ভার প্রদান করা হইবে।’ অর্থাৎ স্থানীয় সরকারও কেন্দ্রীয় সরকারের সমান্তরাল একটি স্বায়ত্বশাসিত সরকার। ফলে জেলাতে নির্বাচিত জেলা পরিষদ, উপজেলাতে নির্বাচিত উপজেলা পরিষদ এবং ইউনিয়নে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ শাসনকার্য পরিচালনা করবে। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে, ‘স্থানীয় সরকারের সকল প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহির আওতায় আনা হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও অন্য কোনো জনপ্রতিনিধির খবরদারিমুক্ত স্বাধীন স্থানীয় সরকার নিশ্চিত করা হবে।’
আমরা মনে করি, ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার প্রথম চার মাসে নির্বাচনী ইশতেহারের কয়েকটি অগ্রাধিকার দ্রুততম সময়ের বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করলেও এই সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের রাজনৈতিক ও দার্শনিক সারবত্তা অনুধাবনে কার্পণ্য। জুলাই সনদ বিষয়ক গণভোটের রায় বাস্তবায়নে গড়িমসি বা ব্যর্থতা বর্তমান সরকারের অনেক সাফল্য ম্লান করে দিতে পারে। এছাড়া বিদ্যমান আর্থিক বাস্তবতায় সরকার লাখ লাখ বেকার তরুণের কর্মসংস্থানসহ মোটামুটি মানসম্মত জীবন ধারণের স্বপ্ন বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই তরুণ সমাজের সমর্থন ও আনুগত্য ধরে রাখতে হলে সরকারকে অবশ্যই গণঅভ্যুত্থানের মূল বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হতে হবে বলে মনে করি। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিকতা, সংস্কার কমিশনসমূহের সুপারিশের প্রতি স্পষ্ট অঙ্গীকার, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, ব্যাংকিং খাতে কঠোর পুনর্গঠন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ, সংযমী অর্থনীতি, ব্যবসাবান্ধব রাজস্বনীতি, নারী ক্ষমতায়ন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতার ক্ষেত্রে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারলে সরকার জুলাইয়ের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে সঠিক পথে রয়েছে বলে আমরা ধরে নেব।
বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে যেখানে কেবল সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয়, একইসঙ্গে প্রয়োজন শাসনব্যবস্থার বৈশিষ্ট্য ও চরিত্র পরিবর্তন। সরকার যদি অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দলের ক্ষমতায় আরোহণের সিঁড়ি ছিল না, বরং রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ার ঐতিহাসিক ডাক ছিল, তাহলে প্রথম ৪ মাস ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর যদি সেই ডাক উপেক্ষিত হয়, তবে জনগণের প্রত্যাশা দ্রুত হতাশায় পরিণত হবে, যা কোনো নবনির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।
আমরা আশাকরি, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবে রূপ দিতে সরকার ‘জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫’ পরিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নসহ অন্যান্য সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও জনকল্যাণমুখী চেতনার আলোকে রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ, নাগরিক নিরাপত্তা ও সেবা বৃদ্ধি ও সহজীকরণের ক্ষেত্রে যথাযথ ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সহযোগী সমন্বয়কারী, সুজন—সুশাসনের জন্য নাগরিক







