নিজস্ব প্রতিবেদক, গাজীপুর:  জন্মনিবন্ধন, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, ট্রেড লাইসেন্স কিংবা কর সংক্রান্ত নথি-একজন নাগরিকের পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য এখন প্রশ্নের মুখে। গাজীপুরের হাজার হাজার মানুষের এসব ব্যক্তিগত তথ্য একটি সাইবার হামলার মাধ্যমে বেহাত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অথচ ঘটনার দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি জেলা প্রশাসনকে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার রাজাবাড়ি ইউনিয়নের ‘সেবা অটোমেশন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালিত সনদ ডটকম ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গাজীপুর জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভার নাগরিক সনদ সংরক্ষণ করা হতো। ২০১৮ সালে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে চুক্তির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি এসব তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নেয়।

তবে ২০২৪ সালের শেষ দিকে সনদ ডটকম ওয়েবসাইটটি সাইবার হামলার শিকার হয়। অভিযোগ রয়েছে, ওয়েবসাইট পুনরুদ্ধার করা গেলেও এর আগেই নাগরিকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চলে যায় হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণে।

গাজীপুরের প্রহল্লাদপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা খোকন সাহা ২০২৪ সালে জমির নামজারি করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একটি মৃত্যু সনদ ও ওয়ারিশ সনদ সংগ্রহ করেন। কিন্তু সেই কাগজপত্র দিয়ে চারবার আবেদন করেও তিনি নামজারি সম্পন্ন করতে পারেননি।

পরে জানতে পারেন, ইউনিয়ন পরিষদ থেকে দেওয়া নথির সঙ্গে অনলাইন সার্ভারে থাকা তথ্যের মিল না থাকায় তৈরি হয়েছে জটিলতা।

খোকন সাহা বলেন, “এই সমস্যার কারণে আমাকে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হয়েছে। সাইবার হামলার বিষয়টি যদি আগে জানানো হতো, তাহলে হয়তো ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা কমানো সম্ভব হতো।”

খোকনের মতো এমন সমস্যায় পড়েছেন আরও অনেক সেবা প্রত্যাশী। অনলাইনে সংরক্ষিত নাগরিকদের জন্মসনদ, মৃত্যু সনদ, ওয়ারিশ সনদ, ট্রেড লাইসেন্সসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য এখন নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে।

সাইবার হামলার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সেবা অটোমেশনের তথ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিস্তারিত জানায়নি। শুধু থানায় সাধারণ অভিযোগ ও একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দায় সেরেছে তারা।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

Pic-4

শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাহিদ ভূঞা বলেন, “বিষয়টি আমি প্রথমবার জানতে পারলাম। তবে আমাদের কাছে নাগরিক নথির হার্ড কপি সংরক্ষিত আছে। আপাতত সেখান থেকেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।”

বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর গাজীপুর জেলা প্রশাসন তদন্ত শুরু করেছে। ওয়েবসাইটের নিরাপত্তা দুর্বলতা, তথ্য পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা এবং ক্ষতির পরিমাণ যাচাই করা হচ্ছে।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক নূরুল করিম ভূইয়া বলেন, “সেবা অটোমেশনের কাছ থেকে আমরা এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিবেদন পাইনি। বিষয়টি জানার পর তাদের জবাবদিহিতার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে ওয়েবসাইটে নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকি ছিল। বিষয়টি পর্যালোচনা করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

তিনি আরও জানান, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বর্তমান চুক্তি বহাল রাখা হবে কি না, সেটিও বিবেচনা করা হচ্ছে।

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ফাঁস হলে তা শুধু গোপনীয়তার লঙ্ঘন নয়, বরং বড় ধরনের পরিচয় জালিয়াতির ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ফাঁস হওয়া তথ্য ব্যবহার করে প্রতারকরা ভুয়া ব্যাংক হিসাব খোলা, ঋণ জালিয়াতি, সম্পত্তি সংক্রান্ত প্রতারণাসহ নানা অপরাধ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

গাজীপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. জাকিরুল ইসলাম বলেন,
“এটি একটি গুরুতর বিষয়। নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় দায়িত্বে অবহেলা হয়ে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।”

ডিজিটাল সেবার বিস্তারের সঙ্গে নাগরিক তথ্য নিরাপত্তার বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গাজীপুরের এই ঘটনা দেখিয়ে দিয়েছে, শুধু তথ্য অনলাইনে সংরক্ষণ করলেই হবে না, এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।

এখন প্রশ্ন-হাজারো মানুষের ব্যক্তিগত তথ্য আসলে কতটা নিরাপদ, আর এই তথ্য ফাঁসের দায় নেবে কে?

The post গাজীপুরের নাগরিক তথ্য হ্যাকারদের হাতে, দেড় বছরেও জানেনি প্রশাসন! appeared first on ZoomBangla.